ঢাকা শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৬ আশ্বিন ১৪২৬

ভারত ভ্রমণের একরাশ সুখময় স্মৃতি


গো নিউজ২৪ | মোহাম্মদ জাফর ইকবাল (পারভেজ) প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯, ০৪:৩২ পিএম আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯, ১০:৩২ এএম
ভারত ভ্রমণের একরাশ সুখময় স্মৃতি

বন্ধুর দাওয়াতে মুলতঃ দৃষ্টিটাকে একটু দেশের বাইরে দিলাম। সুযোগ হয় সময় হয় না, সময় হয় আবার সুযোগ হয় না, এ দোলাচলে ইন্ডিয়া যাওয়ার ভিসা করে ফেললাম। কিন্তু একবছর মেয়াদের ঠিক শেষ সময়ে এসে আল্লাহর অপার সৃষ্টি দেখার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম (০৫-১০/১০/২০১৮ ইং তারিখে) দার্জিলিংয়ের উদ্দেশ্যে। 

ঢাকা থেকে রওয়ানা দিয়ে রংপুরে বন্ধুর বাসায় পৌঁছালাম রাত ১০ টায়। পরেরদিন বন্ধু শুভসহ ইন্ডিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও যেহেতু ভাবি হরেকরকম স্বাদের রান্না-বান্না করে খাওয়ালেন এবং রংপুরের সুন্দর জায়গা সবাই মিলে ঘুরতে গেলাম তাই ওই দিন আর যাওয়া হলো না। পরেরদিন সকালের ট্রেনে করে বন্ধুর গ্রামের বাড়ি পাটগ্রামে দুপুর ১২ টার দিকে পৌঁছালাম। বিকেল ৩টায়  বুড়িমারি সীমান্তে পৌঁছালাম। ইমিগ্রেশন কাউন্টার পার হয়ে ইন্ডিয়ার মাটিতে পা রেখে মনে হল বিএসএফ আর বিজিবি কত কাছাকাছি থাকে অথচ প্রতিনিয়তই বাংলাদেশের নিরীহ মানুষ সীমান্তে গুলি খেয়ে মরছে, কাটা তারের বেড়ায় দুই বাংলার মানুষের আত্মীয়তার বন্ধন কেমন নিবিড়। নতুন দেশে নতুন প্রাকৃতিক পরিবেশে অন্য ভাষা (যদিও বাংলা সবাই বুঝে) সব কিছু মিলিয়ে রোমান্স অনুভুত হল। 

প্রথমে আমরা কুচবিহারে নেমে আরেক গাড়িতে উঠে ময়নাগুড়িতে গিয়ে নামলাম। সন্ধা ৭:০০ টার দিকে ওর চাচাদের বাড়ি দক্ষিণ ধুপজোড়ায় পৌঁছালাম। বন্ধুর আট চাচাসহ অনেক মুসলিম আত্মীয়-স্বজন ঐ এলাকায় থাকেন। আমাদের দেখে ওনাদের, বিশেষ করে চাচাত ভাই বোনদের যেন খুশির সীমা নাই। হালকা শীতের মধ্যে রাতে খাওয়া-দাওয়া করে লায়েক, মাসুম, রাসেল, শাহবাজ, শুভসহ গাড়ি নিয়ে পাহাড়ি মুর্তী নদী থেকে ঘুরে এলাম। রাতের আবছা আলোর সৌন্দর্য দিনে দেখার আগ্রহকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল। যেহেতু সপ্তাহ খানেক থাকার চিন্তা করে বের হয়েছি, তাই প্রতিটি সময়কেই ভ্রমণের আনন্দে থাকার চেষ্টা করেছে ওরা। পরের দিন ৬/১০/১৮ সকালে বের হয়ে হেঁটে হেঁটে আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা করাল, আমরা বাংলাদেশি শুনে খুব আদর যত্ন করল এবং আস্ত একটা গরু জবাই করে আমাদের দাওয়াত দিল। যদিও গরু জবাই নিষিদ্ধ তবুও মুসলিমরা ওই এলাকায় একতাবদ্ধ এবং শক্তিশালী। 

ভারত ভ্রমণের একরাশ সুখময় স্মৃতি

ঘুরতে ঘুরতে চিন্তা হল আশেপাশের রিসোর্টগুলো দেখে আসব, যেই কথা সেই কাজ। লায়েক বল্লো দাদা, তোমরা শুধু তেল খরচ দিবা আর সব আমার। সকাল দশটায় রওয়ানা দিলাম ভুটান সীমান্তের কাছাকাছি বিশাল বিশাল পাহাড় বেষ্টিত ঝালং, বিন্দুর মায়াবী রূপ দেখতে। এটাই আমার প্রথম পাহাড়ি ভ্রমণ, আঁকা-বাঁকা রাস্তা অনেক উঁচু উঁচু পাহাড়, ড্রাইভার হিন্দি গানের মিউজিকের তালে মাঝামাঝে দুই হাত ছেড়ে গাড়ি চালাচ্ছে! ভাবলে এখনো ভয়ে রোমাঞ্চিত হই। পাহাড়ের অনেক উঁচুতে চা বাগান, মেঘের হাতছানি, ঘন কুয়াশার মত একটু পর পর গা ভিজিয়ে দেওয়া, সুন্দর সুন্দর গোছালো ঘর বাড়ি, সারি সারি দেবদারু গাছ, নিচে ছল ছল শব্দে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি ঝর্ণা সত্যি অপরূপ! পাহাড়ের উপরে আল্লাহর এ বৈচিত্রময় সৃষ্টি তাঁর প্রতি ভালোবাসাকে অনেকগুণ বৃদ্ধি করে দেয়। ছন্দময় আঁকাবাঁকা রাস্তার তালে তালে আমরা সন্ধ্যা সাতটায় বাসায় পৌঁছলাম।

পরেরদিন দার্জিলিং যাব! পরিকল্পনা করতে করতে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেলাম। কোথাও যাওয়ার প্রোগ্রাম করলে আমার ঘুম তাড়াতাড়ি ভেঙ্গে যায়। খুব ভোরে কম্বল ছেড়ে উঠতে কষ্ট হলেও উঠে গেলাম। চাচী তাড়াতাড়ি গরম গরম ভাত রান্না করে আমাদেরকে খাওয়ালেন। আমরাও পেট পুরে খেয়ে ৮টার ট্রেন ধরলাম চালসা স্টেশন থেকে। প্রায় দুইঘণ্টা জার্নির পরে দার্জিলিং যাওয়ার মাইক্রোতে উঠলাম, শুরু হল রোমাঞ্চকর আঁকা বাঁকা , খাড়া পাহাড়ি রাস্তায় মেঘের আনাগোনায় ঝিরিঝিরি হাওয়া।

ভারত ভ্রমণের একরাশ সুখময় স্মৃতি

বেলা ৩ টার দিকে দার্জিলিংয়ের পাহাড়ে শহরে উঠলাম। অবাক হয়ে গেলাম পাহাড়ের এত সুন্দর রাজসীক সুউচ্চ বিল্ডিং গুলো দেখে! কত কষ্ট করে এত সুন্দর সুন্দর ঘর বাড়ি হোটেল, মোটেল, স্কুল, কলেজ, হাট-বাজার কী নেই! প্রায় সাড়ে ৬ হাজার ফিট উপরে মানুষ তার প্রয়োজনীয় সব কিছু করে রেখেছে। নিত্য প্রয়োজনীয় কোন কিছুর কোন অভাব দেখিনি কোথাও। বরঞ্চ ভ্রমণপিয়াসী মানুষ ওখান থেকে অনেক টেকসই এবং সস্তায় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্র কিনে নেয়। হোটেলে আগে বুকিং না দিলেও সস্তায় ভালো এবং মানসম্মত রুম পেতে সমস্যা হয়নি। রুমে ফ্রেশ হয়ে বের হতেই দেখি দার্জিলিংয়ের চায়ের সুঘ্রাণসহ বিস্কুট নিয়ে ওয়েটার হাজির। হালকা নাস্তা খেয়ে বের হলাম শহরটা দেখতে। এত মানুষ আসে এখানে, মার্কেটে না গেলে বিশ্বাসই হয়না! শীতের জামা কাপড়সহ টুকটাক অনেক কিছুই কিনলাম। দেশী-বিদেশী অনেক মানুষই দেখলাম। ইউরোপ ইউরোপ মনে হল। হোটেলের রুমে ঢুকে রাতের মজাদার খাবার শেষ করে পরবর্তী ভোরের সময়সূচী শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লাম।

ভোর সাড়ে ৩টায় ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়েই গাড়িতে উঠলাম টাইগার হিলের উদ্দেশ্যে। কনকনে ঠান্ডার মধ্যে প্রায় দেড়ঘণ্টা পাহাড়ি রাস্তা ধরে চলতে চলতে সাড়ে ৫ টায় টাইগার হিলে পৌঁছালাম, যেখান থেকে হিমালয়ের পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফে আবৃত পাহাড় গুলো দেখা যায়। এত ভোরে এত মানুষ দেখে অবাক হলাম! গাড়ি যেখানে থামল, সেখান থেকে আরও ১০০ ফুট উঁচুতে পায়ে হেটে উঠতে হলো। সূর্য তখন ও উঠেনি, দূর দিগন্তে সবাই তাকিয়ে আছে, কী স্বর্গীয় আভা! ক্যামেরা দিয়ে মুহু্র্মুহু ছবি তুলছে প্রায় ৮ হাজার ফিট উপরে। কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফের চাদর মোড়ানো মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে আকাশের পানে। সূর্যের আভা পাহাড়ের উপর পড়া মাত্রই কী দারুন সুন্দর প্রাকৃতিক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখতে পেলাম! তা স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবেনা। এরপর গেলাম দার্জিলিং চা বাগানে। বিশাল পাহাড় পুরোটাই চা বাগানে ঘেরা, দুর থেকে মনে হয় সবুজ কার্পেট বিছানো। চমৎকার একটা জায়গা, মনে হচ্ছিল যেন ইউরোপের কোনো দেশে আসলাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করে আমরা ২ টার দিকে হোটেলে ঢুকলাম। ফ্রেশ হয়ে সাড়ে ৩টার দিকে দার্জিলিং থেকে বের হয়ে গেলাম। পাহাড় থেকে উঠার চেয়ে নামাটা ঝুঁকি হলে ও আরামদায়ক ছিল। অবশেষে রাত ৮ টায় আমরা মাসুমদের বাসায় পৌঁছালাম। রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে একটা ফ্রেশ ঘুম দিলাম।

পরেরদিন সকালে মাসুমদের রাজহাঁসের ডাকে ঘুম ভাঙ্গল। নামাজ পড়ে সকালে হাঁটতে বের হলাম, শিশির ভেজা নরম ঘাসে গায়ের পাথুরে মেঠো পথে সূর্যের সোনালী আলোতে। যেহেতু ঘুরতে এসেছি, তাই লায়েক, রাসেল, মাসুম বললো, চল আরো কয়েকটা স্পট ঘুরে আসি। যেই কথা সেই কাজ। সাথে সাথে লায়েক গাড়ি বের করল । উদ্দেশ্য কালিম্পং, লাভা লোলেগা, বাকপুল ঘুরে আসা। সাঁই সাঁই করে চলছে গাড়ি মিউজিকের তালে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায়। মনে মনে ভাবলাম দার্জিলিং থেকে আর কোনো পাহাড় কি সুন্দর লাগবে? কিন্তু না, এ স্পট গুলো একেবারেই ন্যাচারাল মনে হলো। দুর থেকে মনে হলো আমরা আরেক মেঘের রাজ্যে আসলাম। সারি সারি দেবদারু গাছ, কমলা গাছ এবং সুন্দর সুন্দর বাড়িগুলো সৌন্দর্য্যকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সাথে আছে প্যারাসুটের রাইডিং। যদিও উঠার সাহস দেখাইনি। এরপরে দেখলাম গজলডোবায় পাহাডড়ি নদী, বাঁধ দিয়ে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে। দুই পাহাড়কে সংযোগ করার জন্য বৃটিশ আমলে একটা পুল করা হয়েছিল যেটা বাকপুল নামে পরিচিত। খুবই সুন্দর দেখতে স্ফটিক মার্বেল পাথরের তৈরি। ফটোসেশন করে আমরা বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। 

ভারত ভ্রমণের একরাশ সুখময় স্মৃতি

পরেরদিন বাংলাদেশে চলে যাব, এজন্য সবার মন খারাপ। রাতে অনেক্ষণ আড্ডা দিলাম সবাই মিলে। সকালে উঠে মালবাজারে গিয়ে টুকটাক কেনাকাটা করলাম। বেলা বারটার দিকে মুর্তি নদীতে (পাথুরে স্রোত স্বীনি নদী) গোসল করতে গেলাম। চমৎকার আবহাওয়ায় দুপুরে গোসলটা সেরে নিলাম। পাহাড় থেকে বয়ে চলা ঝর্ণা ধারার স্বচ্ছ জলে শরীরটা ইচ্ছেমত ভিজিয়ে নিলাম। ওই দিন আর যাওয়া হল না। বিকালে লাটাগুরি ফরেস্ট দেখতে গেলাম। বিশাল অরণ্যে বন্য হাতির পাল কিভাবে গাড়ি এ্যাটাক করে তা স্বচক্ষে দেখলাম। ভয়ে বনের গহীণে আর গেলাম না, জার্নিটা খুব উপভোগ্য ছিল। সন্ধ্যার পরে নদীর পাড়ে বসে মজার মজার খাবার খেলাম।

শুভ’র ৮ চাচা। একেক দিন একেক চাচার বাসায় হরেক রকম মজার খাবার খেয়ে স্বাস্থ্য মোবারক একটু বেড়েই গেল। পরেরদিন বিদায় নেওয়ার পালা। সবাই কেমন যেন হয়ে গেল বিদায় নেওয়াটা আসলেই কঠিন। চাচা প্রায় ১০ কেজি চা পাতা কিনে নিয়ে আসলেন আমাদের জন্য। দার্জিলিংয়ের চা অনেক বিখ্যাত তাই বোঝা মনে হল না, দূরের জার্নি যদিও। সবার কাছে বিদায় নিয়ে চাচাতো ভাই ৬/৭ জন সহ লায়েকের গাড়ি নিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। পথে পূজার চাঁদার জন্য গাড়ি আটকালে আমাদের লায়েক সাহেবের ঝাড়ি খেয়ে উল্টো আমাদের চাঁদা দিতে বাধ্য হল। সবাই ঐ টাকা দিয়ে সীমান্তে নেমে মজা করে চা-নাস্তা খেলাম। পরবর্তী আগমনের আশ্বাসে চ্যাংরাবান্দা-বুড়িমারি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করলাম।

রেখে আসলাম ভালো লাগা ও আনন্দঘন একরাশ সুখময় স্মৃতি। 

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল (পারভেজ)
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

গো নিউজ২৪/আই
 

পর্যটন বিভাগের আরো খবর
বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম ‘পানতুমাই’!

বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম ‘পানতুমাই’!

ঘুরে এলাম ইলিশের বাড়ি

ঘুরে এলাম ইলিশের বাড়ি

সেক্স ট্যুরিজমে রমরমা ১০ দেশ

সেক্স ট্যুরিজমে রমরমা ১০ দেশ

ভারত ভ্রমণের একরাশ সুখময় স্মৃতি

ভারত ভ্রমণের একরাশ সুখময় স্মৃতি

সেক্স ট্যুরিজমের তালিকায় শীর্ষ ২৬ দেশ

সেক্স ট্যুরিজমের তালিকায় শীর্ষ ২৬ দেশ

ঘুরে এলাম কাশ ফুলদের বাড়ি

ঘুরে এলাম কাশ ফুলদের বাড়ি