ঢাকা বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৮, ৫ পৌষ ১৪২৫

পররাষ্ট্রনীতি: পাকিস্তান নিঃসঙ্গ নাকি বৈচিত্র্যপূর্ণ?


গো নিউজ২৪ প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৮, ০৯:১৫ পিএম
পররাষ্ট্রনীতি: পাকিস্তান নিঃসঙ্গ নাকি বৈচিত্র্যপূর্ণ?

পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান রাহিল শরিফ বর্তমানে ৪০-জাতি ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্সের নেতৃত্বে থাকায়, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্পের মাধ্যমে চীন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করায় এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে চীনের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা পাকিস্তানের থাকায় ইসলামাবাদের পররাষ্ট্রনীতি দৃশ্যত সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই সফল।

আর এর আলোকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক এলিটরা ভারতের নিঃসঙ্গকরণ নীতি সফলভাবে প্রতিরোধ করতে পারার সামর্থ্য নিয়ে গর্ব করছে। কিন্তু তারপরও সরকারি ভাষ্যই বলছে পূর্ব ও পশ্চিমে থাকা তার দুই নিকট প্রতিবেশীর সাথে এবং তার দক্ষিণ প্রতিবেশী ইরানের সাথে তার যে সম্পর্ক তাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলা যায় না।

এগুলো বাদ দিলে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির সফলতা প্রশ্নবোধক। সাফল্য বলে যা কিছু প্রচার করা হয়, তা অতিরঞ্জিত। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক কোনো রাষ্ট্রনায়ক কিংবা নেতা কিংবা সরকারপ্রধান, এমনকি বন্ধু দেশেরও, পাকিস্তান সফর করেনি। এসব দেশের মধ্যে চীন আছে, সৌদি আরব আছে। এমন প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির সুস্পষ্ট ব্যর্থতার চিত্র না হলেও রাজনৈতিক এলিটরা জনগণকে যেটা বিশ্বাস করতে বলে বিষয়টি তেমন নয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চীনা সমর্থন না থাকলে ভারত জৈশ-ই-মোহাম্মদ এবং এর নেতা মাসুদ আজহারকে জাতিসংঘ সন্ত্রাসীদের কালো তালিকাভুক্ত করে ফেলত। ভারত এ কাজে সফল হলে তা হতো পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর বিষয়। আবারো বলা যায়, চীনের সমর্থন না থাকলে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসে অর্থদানকারী দেশ হিসেবে ‘ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স’ তালিকায় ফেলা হতো।

 চীনের সাথে পাকিস্তানের রয়েছে দারুণ সম্পর্ক। ছবি: অনলাইন

চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক শ্রেফ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমিত না থেকে রাজনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষেত্র পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। আফগানিস্তান এবং এখন বেলুচিস্তানের ক্ষেত্রে বিষয়টি ব্যাপকভাবে দেখা গেছে। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, চীনের ওপর খুব বেশি মাত্রায় নির্ভরশীলতা হয়তো দীর্ঘ মেয়াদে ফলপ্রসূ হবে না। কারণ এতে পররাষ্ট্রনীতির বৈচিত্র্যকরণের প্রবল অনুপস্থিতি থাকছে। অর্থাৎ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতে বৈচিত্র্য থাকতেই হবে। আর আঞ্চলিক প্রশ্নে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি অবশ্যই পাশ্চত্যমুখী নয়, প্রাচ্যমুখী হতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানির দেশগুলো যখন পাকিস্তানকে সন্ত্রাসে মদতদাতা দেশের তালিকায় ফেলতে যাচ্ছে, তখন পাকিস্তানের আশাবাদ নিহিত রয়েছে আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে তার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার ওপর। সন্ত্রাসে অর্থায়নবিষয়ক এফএটিএফ সম্মেলনে চীনের অবস্থানকে সমর্থন করেছে রাশিয়া। এতে এ ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে, দু-এক বছর ধরে পাকিস্তান-রাশিয়া সম্পর্ক উষ্ণ হতে শুরু করেছে।

বিভিন্ন কারণে ‍যুক্তরাষ্টের সাথে তাদের সর্ম্পক ভাল যাচ্ছে না। ছবি: অনলাইন

বিষয়টি সবচেয়ে ভালোভাবে সম্প্রতি ফুটে ওঠেছে এফএটিএফ-এ ভারতের দাবির প্রতি ভারতে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূতের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনে। তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘পাকিস্তানকে কোণঠাসা’ করা তাদের নীতি নয়। অথচ মাত্র কয়েক বছর আগেও এমন নীতি ছিল না। আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কাঠামোতে পাকিস্তান বেশ ভালোভাবেই ছিল। এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির জন্যই এই যুদ্ধে নেমেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

অবশ্য দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে সাবেক স্নায়ুযুদ্ধের মিত্রদের নতুন হিসাবের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আফগানিস্তান যুদ্ধ অব্যাহত থাকায়, আফগানিস্তানে দায়েশের উত্থান, তালেবানকে পরাজিত করতে মার্কিন অক্ষমতা ইত্যাদি কারণে রাশিয়াকে আর ‘শত্রু’ গণ্য না করে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে পাকিস্তান।

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ভূমিকার ব্যাপারে বিষয়টি প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্র অস্বীকৃতি জানালেও রাশিয়া কিন্তু পাকিস্তানের আত্মত্যাগকে স্বীকৃতি দেয়। সে তার নিজস্ব আঞ্চলিক অক্ষে পাকিস্তানকে টেনে নিতে চায়, এবং সে অনুযায়ী পাকিস্তানের সাথে ‘অ্যান্টি-টেরর মিলিটারি কমিশন’ গঠন করেছে।

এই কমিশন এমন এক সময় প্রতিষ্ঠিত হলো, যখন রুশ কর্মকর্তারা অভিযোগ করছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আফগানিস্তানে দায়েশের উপস্থিতিকে সমর্থন করছে। রাশিয়া ভয় পাচ্ছে, আফগানিস্তান থেকে দায়েশ (আইএস) মধ্য এশিয়া এবং সেখান থেকে রুশ মূল ভূখণ্ডেও প্রবেশ করতে পারে।

আফগানিস্তানে দায়েশের উপস্থিতি সম্পর্কে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যাভরভের মন্তব্য এবং গত ১৭ বছর ধরে আফগানিস্তানে মার্কিন ভূমিকা নিয়ে তার সমালোচনা করার সাথে সাথেই সম্প্রতি রাশিয়া সফররত পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ান প্রজাতন্ত্রগুলোর আশপাশে ক্রমবর্ধমান দায়েশ উপস্থিতি উভয় দেশের জন্য অভিন্ন উদ্বেগের বিষয়। এই প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানে দায়েশের অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতি রাশিয়ার জন্য উদ্বেগের বিষয়। আফগানিস্তানে বিদেশী শক্তিগুলোর উপস্থিতি গত ১৭ বছরে কোনো সফলতা বয়ে আনেনি।

রাশিয়ার এশিয়া কৌশলের সাথে পাকিস্তান চমৎকারভাবে খাপ খেয়ে যাওয়ার কারণেই মস্কো আফগানিস্তান-সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে সমন্বয় সাধনের ওপর জোর দিচ্ছে। অবশ্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কঠোরভাবে দ্বিপক্ষীয় নীতির ওপর নিবদ্ধ রাখাটা দীর্ঘ মেয়াদে খুব বেশি ফলপ্রসূ হবে না। পাকিস্তানকে কোনোভাবেই তার পররাষ্ট্রনীতি বৈচিত্র্যকরণে সংকীর্ণতা আনলে চলবে না। বরং রাশিয়ার মতো দেশের সাথে স্থায়ী, টেকসই সম্পর্ক গড়া যায় সেটাই মঙ্গলজনক।

এ কারণে আফগানিস্তানের সাথে সহযোগিতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনভাবে রাশিয়ার সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাও দরকার। তবে পাকিস্তানে রাশিয়ার অর্থনৈতিক উপস্থিতি তেমন না হওয়ায় টেকসই পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানকে অবশ্যই জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবধান ঘোচাতে হবে। কেবলমাত্র বৃহত্তর কৌশল পরিবর্তনই পাকিস্তানের স্বার্থ সিদ্ধি করবে। এই লেখাটি ‘এসএএম’ থেকে নেওয়া হয়েছে।  

গোনিউজ/এমএফ

মতামত বিভাগের আরো খবর
যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দোসরদের ভোট না দেয়ার আহ্বান

যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দোসরদের ভোট না দেয়ার আহ্বান

প্রশ্ন করেন কাকে? 

প্রশ্ন করেন কাকে? 

আ.লীগের সমর্থন ৬৬ শতাংশ, বিএনপির ১৯.৯

আ.লীগের সমর্থন ৬৬ শতাংশ, বিএনপির ১৯.৯

ব্যর্থতার দায়ভার কি শুধুই শিক্ষকের?

ব্যর্থতার দায়ভার কি শুধুই শিক্ষকের?

নাইকো দুর্নীতিতে খালেদা জিয়া ও তারেকের সংশ্লিষ্টতা পরিষ্কার

নাইকো দুর্নীতিতে খালেদা জিয়া ও তারেকের সংশ্লিষ্টতা পরিষ্কার

নির্বাচনে হিরো আলমের প্রার্থিতা ও আমাদের সাংবাদিকতা!

নির্বাচনে হিরো আলমের প্রার্থিতা ও আমাদের সাংবাদিকতা!