ঢাকা শনিবার, ১৫ মে, ২০২১, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

যাত্রাপালার ইতিহাস


গো নিউজ২৪ | মিলন কান্তি দে প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২১, ১১:২৯ এএম
যাত্রাপালার ইতিহাস

শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসাবে যাত্রার স্বীকৃতি আছে। নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ি (১৮৮৯-১৯৫৯) বলে গেছেন, ‘আমাদের জাতীয় নাট্য বলিয়া যদি কিছু থাকে তাহাই যাত্রা।’ নাট্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জিয়া হায়দার (১৯৩৬-২০০৮) বলেন ‘যাত্রাই হতে পারে আমাদের জাতীয় নাট্য।’ তবে দুঃখজনক যে, এ সম্ভাবনা আদৌ আমাদের দৃষ্টিগোচর হলো না।

রাষ্ট্র বরাবরই এ মাধ্যমটাকে ভয় পেয়েছে। তাই তো বিধিনিষেধ কিংবা কালাকানুন জারি করে সরকারিভাবে যাত্রার যাত্রাপথ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। অথচ চিরায়ত সত্য এটাই যে, যাত্রা বা যাত্রাগান যুগে যুগে মানুষকে আনন্দ দিয়েছে। যাত্রার আসরে শোনা যেত বীর পুরুষদের কাহিনি, রাজা-বাদশাহর যুদ্ধের গল্প। লেখাপড়া না-জানা মানুষ যাত্রাগান শুনে অনেক কিছু শিখত। বুঝতে পারত। দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত হতো হাজার হাজার মানুষ।

যাত্রার যাত্রা

যাত্রাপালার জন্মকথা বড়ই চমকপ্রদ। গবেষকদের মধ্যেই মতভেদ দেখা যায়। যেমন বৈদিক যুগে বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের দেব-দেবীর উৎসব হতো। ভক্তরা ঢাকঢোল নিয়ে মিছিলসহকারে নাচতে নাচতে-গাইতে গাইতে উৎসবে যোগ দিত। এক জায়গায় এক দেবতার বন্দনা ও লীলাকীর্তন শেষ করে আরেক জায়গায় আরেক দেবতার উৎসবে গান-বাজনার মিছিল নিয়ে যাত্রা শুরু করত। সূর্যদেবকে উপলক্ষ করে সৌরোৎসব, শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীতে কৃষ্ণযাত্রা, জগন্নাথ দেবের উদ্দেশে রথযাত্রা, দোল পূর্ণিমায় দোল যাত্রা এবং মনসামঙ্গলে ভাষান যাত্রা।’ এই যে, দেবদেবীদের উৎসবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া- এ ‘যাওয়া’ থেকেই ‘যাত্রা’ কথাটির উৎপত্তি বলে একদল গবেষক মনে করেন। ড. আশরাফ সিদ্দিকীর মতে শব্দটি দ্রাবিড় থেকে এসেছে। কারণ দ্রাবিড়দের মধ্যে এখনো এমন অনেক উৎসব আছে যাকে বলা হয় ‘যাত্রা’ বা ‘যাত্র।’ অন্যদল মনে করেন মধ্যযুগে এ দেশে যে পাঁচালী গান প্রচলিত ছিল, তা থেকে যাত্রার উদ্ভব। ১৮৮২ সালে যাত্রা বিষয়ে গবেষণা করে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন আমাদের বিক্রমপুরের সন্তান নিশীকান্ত চট্টোপাধ্যায় (১৮৫২-১৯১০)। তিনি গবেষণায় আবিষ্কার করেছেন খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকেই কৃষ্ণ যাত্রার অভিনয় হতো। গবেষক গৌরাঙ্গ প্রসাদ ঘোষের মতে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে সম্রাট অশোক তার অষ্টম শিলালিপিতে উৎসব অর্থে যাত্রা ব্যবহার করেছেন। বহু শতাব্দীব্যাপী উৎসবের ঘেরাটোপে বন্দি থাকার পর অভিনয় অর্থে যাত্রার প্রথম নিদর্শন দেখি মহাপ্রভূ শ্রীচৈতন্য দেবের আমলে ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দশকে। ১৫০৯ সালে অভিনীত পালাটির নাম ‘রুক্ষ্মিণী-হরণ।’ মহাপ্রভূ স্বয়ং এই পালায় অভিনয় করেন। এটি ছিল শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য একটি উদ্দেশ্যমূলক ধর্মীয় প্রয়াস। তবে যাত্রাভিনয়ের ধারাবাহিক ইতিহাসের জন্য আমাদের আরও প্রায় আড়াইশ বছর অপেক্ষায় থাকতে হয়।

নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের সাড়ে তিন দশক পর ইংরেজশাসিত বঙ্গদেশে বাংলা নাট্যাভিনয়ের সূচনা করেন রুশ নাগরিক হেরাসিম লেবেডেফ। সে সময়ে গ্রামে-গঞ্জে রাত-ভোর করে দেওয়া যাত্রাগানের আসর বসত। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বীরভূম জেলার কেঁদুলী গ্রামের শিশুরাম অধিকারী যাত্রাগানে শোনালেন এক নতুন বার্তা। ভক্তি রসাত্মক ভাবধারার মধ্যে তিনি নিয়ে এলেন নতুন জাগরণ। যাত্রাগানের ইতিহাসে তিনি ‘নবযাত্রার পথিকৃৎ’ হিসাবে খ্যাত। শিশুরামের পর পরমানন্দ অধিকারী ও গোবিন্দ অধিকারী (১৭৯৮-১৮৭০) বিভিন্ন আঙ্গিকে, বিন্যাসে ও রূপকল্পে যাত্রাকে আরও সময়োপযোগী করে তোলেন। ভাব-বিন্যাসে এবং হৃদয়ের গভীরতায় কৃষ্ণযাত্রার নতুন রূপায়ণ দেখতে পাই উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে এবং এ ধারার কৃতিত্বের অধিকারী নবদ্বীপের কৃষ্ণকমল গোস্বামী (১৮১০-১৮৮৮)। সে সময়ে ঢাকায় তার ৩টি পালা- স্বপ্নবিলাস, দিব্যোন্মাদ ও বিচিত্র বিলাস খুব সুনামের সঙ্গে মঞ্চায়ন হয়। এগুলো প্রকাশিত হয় ১৮৭২, ’৭৩ ও ’৭৪ সালে। উল্লেখ করা যায়, কৃষ্ণকমলের আগে আর কারও পালা মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত হয়নি এবং এ ৩টি যাত্রাপালা নিয়েই সুইজারল্যান্ড থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছিলেন নিশীকান্ত চ্যাটার্জি। বিশেষভাবে আরও উল্লেখ করতে হয় যাত্রা বিষয়ে গবেষণা করে বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে তিনিই প্রথম ডক্টরেট হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ যেমন ঢাকার প্রথম নাটক তেমনি ঢাকা শহরের প্রথম যাত্রাপালা কৃষ্ণকমল গোস্বামীর স্বপ্নবিলাস (১৮৬১)। সুরুচিসম্পন্ন উন্নতমানের পালার পাশাপাশি উনিশ শতকের ৫০ ও ৬০-এর দশকে এক শ্রেণির সস্তা ও বিকৃতির প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল যাত্রাপালায়। সেই অশ্লীলতা ও ভাঁড়ামি থেকে যাত্রাকে মুক্ত করে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুললেন আরেক বিশিষ্ট পালাকার মতিলাল রায় (১৮৩২-১৯০৮)। বিভিন্ন পালায় তিনি কথকতা, সংলাপ, অভিনয় ও সংগীতের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন। গানের ছন্দ ও অনুপ্রাস ব্যবহারের কৌশল তিনি নিয়েছেন দাশরথির পাঁচালী থেকে। নট ও নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষের (১৮৪৪-১৯১২) হাতে পৌরাণিক যাত্রাপালা নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে স্বতন্ত্র মাত্রা পায়। যাত্রা ও নাটকে তার ভাষারীতি যেমন নতুনত্বের দাবি রাখে, তেমনি এক সুললিত ছন্দ আবিষ্কার করে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। এটাই ‘গৈরিশী ছন্দ’ নামে পরিচিত। মিত্র, অমিত্রাক্ষরের সঙ্গে গৈরিশী ছন্দের ব্যবহারও যাত্রায় অনেকদিন ছিল।

১৮৭২ সালে প্রথম কলকাতায় জাতীয় রঙ্গমঞ্চের প্রতিষ্ঠা। এর দু’বছর পর ১৮৭৪ সালে আত্মপ্রকাশ ঘটে বরিশালের মাচরঙ্গের নট্ট কোম্পানি যাত্রা পার্টির। এটিই অবিভক্ত বাংলাদেশে প্রথম পেশাদার যাত্রাদল। স্বত্বাধিকারী ছিলেন দু’জন-শশীচরণ নট্ট ও বৈকুণ্ঠ নট্ট। ১৯৪০ সালের পর নট্ট কোম্পানি ভারতে চলে যায় এবং তাদের স্থায়ী ঠিকানা হয় ১৭, হরচন্দ্র মল্লিক স্ট্রিট, কলকাতা। ১৪৭ বছরের প্রাচীনতম এ দলটি প্রযোজনায়, পালা মঞ্চায়নে, নিত্য নতুন কলাকৌশলে এখনো বাংলাদেশের গৌরব বহন করছে। নট্ট কোম্পানির মা-মাটি-মানুষ, নটি বিনোদিনী, দেবী সুলতানা, অচল পয়সা- এ পালাগুলোর লং প্লেয়িং রেকর্ড বাংলাদেশেও বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। বরিশালের বিল্বগ্রাম থেকে কালীচরণ নট্টের মালিকানায় আরেকটি নট্ট কোম্পানির জন্মকথা জানা যায়। সেটা ১৮৭৫ সাল।

সৃষ্টির অফুরন্ত সম্ভাবনা নিয়ে বিশ শতকে এগিয়ে চলল যাত্রার রথ। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে ‘স্বদেশী যাত্রা’ নিয়ে এলেন মুকুন্দ দাশ (১৮৭৮-১৯৩৪)। জন্ম বিক্রমপুরে, প্রতিষ্ঠা বরিশালে। বক্তৃতা ও দেশের গান স্বদেশী যাত্রার বৈশিষ্ট্য। ইংরেজের বিরুদ্ধে মুকুন্দ গাইলেন- ‘ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে/ মাতঙ্গী মেতেছে সমররঙ্গে/ সাজরে সন্তান, হিন্দু মুসলমান/ থাকে থাকিবে প্রাণ/ না হয় যাইবে র্প্রাণ।’ এমন উদ্দীপনামূলক ভাষা ও শব্দ চয়নের মাধুর্যের আগে কোন যাত্রাপালায় দেখা যায়নি। মাতৃপূজা, কর্মক্ষেত্র পথ, পল্লিসেবা, সমাজ- মুকুন্দ’র এ পালাগুলো ইংরেজ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল।

স্বদেশী যাত্রা থেকে ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জয়দুর্গা অপেরা। মাঝে আছে চাঁদপুরের উমানাথ ঘোষালের দল (১৯১৯), ঢাকার অক্ষয় বাবুর দল (১৯১০), ফরিদপুরের শংকর অপেরা পার্টি (১৯২৫), শরীয়তপুরের ভোলানাথ অপেরা (১৯৩০), চট্টগ্রামের শ্মামাচরণের দল (১৯৪০), বরিশালের মুসলিম যাত্রাপার্টি (১৯৩০), মানিকগঞ্জের বাসুদেব অপেরা (১৯৩৩) ও অন্নপূর্ণা অপেরা (১৯৪৪)। যাত্রার ঐতিহ্য সমুন্নত রাখার পাশাপাশি এসব দলে ঐতিহাসিক পালার রাজা-বাদশার কাহিনির জমজমাট অভিনয় হতো। মুসলিম যাত্রা পার্টির মালিক মোজাহের আলি শিকদার ‘বিষাদ সিন্ধুর’ বিভিন্ন পর্ব নিয়ে পালা লিখতেন। যেমন- এজিদ বধ, জয়নাল উদ্ধার, কাসেম-সখিনা প্রভৃতি। লোকের মুখে মুখে এগুলো ‘ইমাম যাত্রা’ হিসাবে পরিচিতি পায়। বরিশালের ইমাম যাত্রা থেকেই এ দেশে ইসলামী চেতনা ও মুসলিম আখ্যানভিত্তিক কাহিনির পালা মঞ্চায়ন শুরু।

’৪৭ পূর্বকালের খুব নামকরা দুটি দল ছিল মানিকগঞ্জের অন্নপূর্ণা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জয়দুর্গা অপেরা। মানিকগঞ্জের তরা গ্রামের কার্তিকচন্দ্র সাহা মাত্র দশ আনা পুঁজি নিয়ে অন্নপূর্ণা গঠন করেন। কলকাতার বহু শিল্পী এখানে অভিনয় করেছেন। উল্লেখযোগ্য পালা ছিল ধরার দেবতা, দাতা হরিশ্চন্দ্র, রাজনন্দিনী ও স্বামীর ঘর। জয়দুর্গা অপেরার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। এ দেশের বেশিরভাগ বিখ্যাত যাত্রাশিল্পী এই দলে অভিনয় করেছেন। বিশিষ্টদের মধ্যে রয়েছেন মন্মথ দত্ত, নয়ন মিয়া, চিত্ত পাল, বিমল বালা, দিগম্বর মালাকার, কালীপদ দাশ ও বনশ্রী মুখার্জি। পুরুষদের মধ্যে নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন এমন কয়েকজন হলেন- নগেন নন্দী, ভাসান নন্দী, ব্রজেন নন্দী, লক্ষ্মী নন্দী। তারা সবাই ‘রানি’ হিসাবে খ্যাত ছিলেন। দলের পালা ছিল প্রতিশোধ, বর্গী এল দেশে, সাধক রামপ্রসাদ, সোনাইদীঘি ও প্রায়শ্চিত্ত। ১৯৭৬ সালে চিত্রপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমানের পরিচালনায় এ দলের শিল্পী সমন্বয়ে ‘বর্গী এল দেশে’ পালাটি চলচ্চিত্রায়িত হয়। জয়দুর্গা অপেরার প্রতিষ্ঠাতা ও অধিকারি ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় যতীন চক্রবর্তী। অনেকে সম্বোধন করতেন ‘কর্তা’ বলে। উল্লিখিত দলগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। ঐতিহ্য ধরে রাখার উত্তরাধিকারীও এখন আর নেই।

যাত্রা : স্বাধীনতার আগে- তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৪৭ থেকে ’৭১ এই ২৪ বছরে যাত্রাদলের সংখ্যা ছিল ২৬। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নাম: সিরাজগঞ্জের বাসন্তী মুক্ত মঞ্চ নাট্য প্রতিষ্ঠান (১৯৫৪), ঝালকাঠির নাথ কোম্পানি যাত্রাপার্টি (১৯৫৫), চট্টগ্রামের বাবুল অপেরা (১৯৫৮), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভোলানাথ অপেরা (১৯৬০) ও ভাগ্যলক্ষ্মী অপেরা (১৯৬০), চট্টগ্রামের গীতশ্রী মুক্তমঞ্চ নাট্য প্রতিষ্ঠান (১৯৬৭),

সাতক্ষীরার আর্য অপেরা (১৯৬৪), ময়মনসিংহের নবরঞ্জন অপেরা (১৯৬৬), ফরিদপুরের নিউ বাসন্তী অপেরা (১৯৯৬৮), গোপালগঞ্জের আদি দিপালী অপেরা (১৯৬৯), মানিকগঞ্জের অম্বিকা অপেরা (১৯৬৯) এবং জগন্নাথ অপেরা (১৯৭০)।

যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠিত উত্তর জনপদের বিশাল ব্যয়বহুল দল বাসন্তীর মালিক ছিলেন সিরাজগঞ্জের শাহ্জাদপুর নিবাসী নারায়ণ দত্ত, যিনি ‘ভগবান দত্ত’ নামে সবার কাছে শ্রদ্ধেয় ছিলেন। বাসন্তী নাট্য প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শাহজাদপুরে এক বিশাল শিল্পী সম্প্রদায় গড়ে ওঠে। অমলেন্দু বিশ্বাসের সহধর্মিণী জ্যোৎস্না বিশ্বাসহ এ তালিকায় রয়েছেন পরিমল সাহা, বারীণ নন্দী, ফণী শীল, সন্ধ্যা সাহা, বিনয় চক্রবর্তী, অমিয় সরকার প্রমুখ। স্বনামধন্য যাত্রানট অমলেন্দু বিশ্বাসের যাত্রাজীবন শুরু হয় এই দল থেকেই ১৯৬১ সালে। কয়েকটি অভিনয় সমৃদ্ধ পালার নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন- সোহ্রাব-রুস্তম, গৃহলক্ষ্মী, জালিয়াত, রাজসন্ন্যাসী, চণ্ডীমঙ্গল ও দোষী কে। যাত্রাজগতে প্রথম সামাজিক পালা দোষী কে বা নিষিদ্ধ ফল। রচয়িতা ব্রজেন্দ্র কুমার দে।

নাথ কোম্পানি যাত্রাপার্টি ছিল ঝালকাঠির ব্যবসায়ী গোপাল নাথের। দলে নামকরা দুটি পালা ছিল আভিজাত্য ও সম্রাট নাদিরশাহ। প্রধান অভিনেতা নিতাই দাশের জাদুকরি অভিনয়ের স্মৃতি এখনো প্রবীণ দর্শকের মনে পড়ে। চট্টগ্রামের বাবুল থিয়েটারের প্রতিষ্ঠা ১৯৫৪-তে। চার বছর পর অপেরা বা যাত্রাদল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। বাবুল অপেরার মালিক ছিলেন ঘাটফরহাদবেগ এলাকার ২০, ফতেহ আলী মাতবর লেনের আমিন শরীফ চৌধুরী। এ দেশে যাত্রাশিল্প আন্দোলনে বাবুল অপেরার কৃতিত্বই সর্বাধিক। যাত্রায় মহিলা শিল্পী নিয়ে আসার অসাধারণ কাজটি করেছে এ দল। যাত্রায় প্রথম নায়িকা মঞ্জুশ্রী মুখার্জি (১৯৩৭-১৯৮৮) এ দলের আবিষ্কার। অমলেন্দু বিশ্বাসের খ্যাতি, প্রতিপত্তি, নাম, যশ এখান থেকেই। কয়েকটি বিখ্যাত যাত্রাপালা রাহুগ্রাস, নাচমহল, চাঁদ-সুলতানা, পার্থসারথি, সত্যের জয়, রাজসন্ন্যাসী।

’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় বাবুল অপেরার ‘একটি পয়সা’ যাত্রাপালা সারা দেশে বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল। দলের আরও যেসব প্রতিভাধর নট-নটিকাদের অভিনয়ের কথা জানি, তারা হলেন : এমএ হামিদ, জাহানারা, হরেন বিশ্বাস, প্রতাপাদিত্য দত্ত, তুষার দাশ গুপ্ত, নজির আহমদ, মরু ঘোষাল, শ্যামল মজুমদার, মোকসেদ আলী (রানি) এবং জ্যোৎস্না বিশ্বাস। বাবুল অপেরার অধিকাংশ যাত্রাপালায় অমলেন্দু বিশ্বাসের পাশে নায়িকা ছিলেন মঞ্জুশ্রী। বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের মতো যাত্রামঞ্চেও ‘রোমান্টিক জুটি’ কথাটির উৎপত্তি এ দু’জনের যুগল অভিনয়ের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের যাত্রাদল এবং যাত্রাভিনয়ের ঐতিহ্যিক ধারায় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে আছেন একজন প্রাতঃস্মরণীয় মহৎ ব্যক্তি, টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরের দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা। যিনি আরপি সাহা নামে সমধিক পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশীয় রাজাকারের সহায়তায় পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে পুত্র রবি সাহাসহ তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন ও অপহরণ ঘটনায় যাত্রাশিল্পীদেরও অশ্রুসজল করে তোলে। বিগত শতাব্দীর ’৬০-এর দশকে প্রতি বছর দুর্গাপূজার সময় মহাসমারোহে যাত্রাগান হতো আরপি সাহার পূজা বাড়িতে, আশানন্দ হলে। এখানে বায়না করা হতো শুধু প্রথম সারির জয়দুর্গা অপেরা, বাবুল অপেরা, বাসন্তী অপেরা ও ভোলানাথ অপেরার মতো জনপ্রিয় দলগুলোকে। নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ প্রথম জীবনে আরপি সাহার পূজাবাড়িতে একাধিক দলের যাত্রাগান শুনেছেন।

১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম যাত্রাপার্টির ১৯৬৬ সালে নতুন নামকরণ হয় বাবুল যাত্রাপার্টি। ইমাম যাত্রার সঙ্গে অন্যান্য পালাও তখন মঞ্চস্থ হতে শুরু করেছে। দল মালিক মোজাহের আলী শিকদারের বড় ছেলে সিকান্দার শিকদার নতুন পালা লিখলেন ‘বেদ কন্যা।’ ৫৫ বছর আগে রচিত এ পালাটি এখনো একাধিক দলে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে মঞ্চায়িত হতে দেখা যায় (বর্তমান লেখকের যাত্রা জীবনের সূচনা ১৯৬৬ সালে এই দল থেকে)। ১৯৭০-৭১ যাত্রা মৌসুমে অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ভোলানাথ অপেরার নৃত্যশিল্পী ছিলেন অঞ্জু ঘোষ, পরবর্তীকালে ঢাকার সিনেমার যৌনাবেদনময়ী নায়িকা হিসাবে যার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। যাত্রাদলে অঞ্জু ও মঞ্জু দুই বোন ডুয়েট গাইতেন কিশোর কুমারের সেই হিট গানটি- ‘এক পলকের একটু দেখা, আর একটু বেশি হলে ক্ষতি কি!’ ময়মনসিংহের গণেশ অপেরা, বুলবুল অপেরা এবং নবরঞ্জন অপেরায় অভিনয় করতেন যাত্রাজগতের প্রথম দু’জন মুসলিম যাত্রাশিল্পী নেত্রকোনা জেলার হোগলা গ্রামের আশরাফ আলী এবং একই জেলার পূর্বধলা গ্রামের নয়ন মিয়া। ’৭১-এর মার্চে সেই উত্তাল দিনগুলোতে নয়ন মিয়া ছিলেন বুলবুল অপেরায়। অমলেন্দু বিশ্বাস বাসন্তী অপেরায়। বর্তমান ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈলে অভিনয়ের পাট চুকিয়ে পশ্চিম দিনাজপুরের রায়গঞ্জে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। উদ্দেশ্য, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যাত্রাভিনয়ের আয়োজন করা। এদিকে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঢাকায় যখন বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়, ঠিক ওই সময় নেত্রকোনা জেলার হাইস্কুল মাঠে যাত্রানুষ্ঠান চলছিল বাবুল অপেরার। দক্ষিণ ভারতের আহমদনগরের সুলতানা চাঁদবিবির বীরত্বগাথা নিয়ে রচিত হয় ওই পালাটি। ‘চাঁদবিবি’ ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে মঞ্চস্থ শেষ যাত্রাপালা। এক প্রতিবাদী নারী চরিত্রের সংলাপ ছিল এরকম : ‘জাহাঁপনা, কেন আপনার সৈন্যদলকে অতর্কিতে লেলিয়ে দিয়েছেন আমাদের ওপর? কত ঘরবাড়ি পুড়েছে, কত মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে, কত মন্দির-মসজিদ ধ্বংস হয়েছে খবর রাখেন কিছু?’ অবাক, বিস্মিত শিহরিত যাত্রাশিল্পীরা। ঘটনার কী সমান্তরাল যোগাযোগ। পরদিন ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার বার্তাটি বিভিন্ন এলাকার মতো পূর্বধলায়ও এসে পৌঁছে। যাত্রানুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। ‘সব প্রস্তুত, যুদ্ধের দূত হানা দেয় পূব দরজায়।’ যাত্রাশিল্পীরাও ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তি সংগ্রামে।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে- মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে শুরু হলো গ্রুপ থিয়েটার নাট্যচর্চা। ১৯৭২-এ ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ৬টি নাট্যদল- নাট্যচক্র, আরণ্যক, থিয়েটার, বহুবচন, প্রতিদ্বন্দ্বী, স্বরলিপি, আবাহনী এবং স্বদেশ সংস্কৃতি সংসদ। বিজয়ের আনন্দ উচ্ছ্বাসে একই বছরে আত্মপ্রকাশ করে কয়েকটি নতুন যাত্রাদল। পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলী থেকে নিউ গণেশ অপেরা, যশোরের ফাল্গ–নি অপেরা, খুলনার ডুমুরিয়া থেকে শিরিন যাত্রা ইউনিট, ভদ্রা অপেরা, রংপুর থেকে নর্থবেঙ্গল অপেরা এবং নওগাঁর ভাটকৈ গ্রাম থেকে রূপশ্রী অপেরা। তবে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে প্রথম একটি যাত্রাদলের জন্মের খবর পাওয়া যায়। ময়মনসিংহের শ্যামগঞ্জ থেকে গড়ে ওঠা দলটির নাম সবুজ অপেরা। প্রতিষ্ঠাতা একজন প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন বাচ্চু। বাচ্চু মিয়া এখন প্রয়াত। তার স্বপ্ন সাধের সবুজ অপেরাও এখন আর নেই। ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রামে থিয়েটার-৭৩-এর প্রতিষ্ঠা। এ বছরের ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামেরই যাত্রাদল বাবুল অপেরা যশোরের সাগরদাঁড়ীর মধুমেলায় পরিবেশন করে বিধায়ক ভট্টাচার্য রচিত যাত্রাপালা ‘বিদ্রোহী মাইকেল মধুসূদন।’ এ মঞ্চায়নের নেপথ্যে যার বিশেষ ভূমিকা ছিল, তিনি যশোরের তদানীন্তন জেলা প্রশাসক আবদুস সামাদ। মধুসূদন চরিত্রে অভিনয় করে নটসম্রাট অমরেন্দু বিশ্বাস (১৯২৫-১৯৮৭) সদ্য স্বাধীন হওয়া এক নতুন দেশে নতুন সাংস্কৃতিক জাগরণ নিয়ে এলেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে আমরা দেখি চট্টগ্রামের গীতশ্রী যাত্রা ইউনিটের লেনিন (১৯৭৪), মানিকগঞ্জের চারণিক নাট্যগোষ্ঠীর হিটলার (১৯৭৫), সিরাজগঞ্জের বাণীশ্রী অপেরার জানোয়ার (১৯৭৬), চট্টগ্রামের নবারুণ নাট্য সংস্থার নটি বিনোদিনী (১৯৭৬), সিরাজগঞ্জের বাসন্তী অপেরার মা-মাটি-মানুষ (১৯৭৯), মানিকগঞ্জের নিউ গণেশ অপেরার বিদ্রোহী নজরুল (১৯৭৯), খুলনার শিরিন যাত্রা ইউনিটের ক্লিওপেট্রা ও দস্যুরানী ফুলন দেবী (১৯৮৪) এবং ময়মনসিংহের নবরঞ্জন অপেরার চিড়িয়াখানা (১৯৮১) প্রভৃতি উন্নতমানের পালা। স্বাধীনতার প্রথম দশ বছরে ঐতিহ্যবাহী যাত্রাভিনয়ের যে গুণগত মান আমরা দেখলাম, এর ধারাবাহিকতা পরে আর রক্ষা করা যায়নি। ১৯৭৮-৭৯ সালে লাকী খান ও প্রিন্সেস কত্মা নামের নর্তকিরা যাত্রার আসরগুলোতে অশ্লীলতার যে জোয়ার বইয়ে দিয়েছিল, সেই কলংক থেকে আজও এ শিল্পটি পুরোপুরি মুক্তি পায়নি। তখন থেকে বিকৃত রুচির প্রদর্শকরা যাত্রাকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যায়। এ অবস্থা থেকে শিল্প শোভনরূপে যাত্রাকে প্রতিষ্ঠিত করার কোনো জাতীয় উদ্যোগ দেখা যায়নি ৫০ বছরেও। যাত্রা একটি পেশাদারি শিল্প। কিন্তু এ পেশাদারিত্ব বারবার ব্যাহত হয়েছে। প্রশাসনিক টালবাহানার কারণে যাত্রা প্রদর্শনীর সহজ অনুমতি ছিল না। এখনো নেই। কখনো কখনো নিষেধাজ্ঞা জারি করে গোটা শিল্পেরই কণ্ঠ রোধ করা হয়েছিল। বিগত ৫০ বছরের মধ্যে একমাত্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাড়ে তিন বছরের শাসনামল ছাড়া আর কখনো কোনো সরকারের আমলেই এ দেশে সুষ্ঠু পরিবেশে যাত্রা প্রদর্শনী হয়নি।

স্বাধীনতা-উত্তর যাত্রাশিল্পে একটি বড় অর্জন আমরা দেখতে পাই, এ সময়ে নাগরিক শিক্ষিত সমাজ ও যাত্রাশিল্পীদের মধ্যে একটা যোগসূত্র গড়ে উঠেছে। সংবাদপত্রেও যাত্রা জায়গা করে নিয়েছে, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে যা ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার। উনিশ শতকের নব্য ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালি বাবু সমাজ যাত্রাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। আর বাংলাদেশের প্রগতিশীল সম্প্রদায় বিশেষ করে সংস্কৃতিজনরা এ ঐতিহ্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। তাই তো ১৯৯১ সালের নভেম্বরে শাসকগোষ্ঠী যাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী সোচ্চার কণ্ঠে বলেন ‘যাত্রাকে ধ্বংস করা চলবে না।’ রাজপথে যাত্রাশিল্পীদের মিছিলে শরিক হয়েছেন কামাল লোহানী, রামেন্দু মজুমদার ও মামুনুর রশীদের মতো ব্যক্তিত্বরা।

তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে গড়ে ওঠা বাবুল অপেরা, ভাগ্যলক্ষ্মী অপেরা, দিপালী অপেরা, নবরঞ্জন অপেরা এবং নিউ বাসন্তী অপেরার পালা মঞ্চায়ন অব্যাহত ছিল ১৯৮৫ পর্যন্ত। ৯০ দশকের শেষাবধি নিবু নিবু অবস্থায় হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় সিরাজগঞ্জের বাসন্তী নাট্য প্রতিষ্ঠান। ’৪৭-এর আগের দল জয়দুর্গা অপেরা ও অন্নপূর্ণা অপেরার কার্যক্রম স্বাধীনতা পরবর্তী কয়েক বছর পর্যন্ত চালু ছিল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে প্রথম ব্যয়বহুল দল চট্টগ্রামের নবারুণ নাট্য সংস্থা, প্রতিষ্ঠা ১৯৭৪ সালে। সর্বাধিক দল গঠনের একক কৃতিত্ব গোপালগঞ্জের ধীরেন বাগচীর। ১৯৭৫ সালে তিনি একাধারে ৫টি দলের মালিক হন। দলগুলো হচ্ছে দিপালী, ১নং দিপালী আদি দিপালী, নব দিপালী ও দীপ দিপালী অপেরা। ১৯৮০ থেকে ২০০০- এ বিশ বছরে বিভিন্ন দলে মঞ্চায়িত উল্লেখযোগ্য পালা হচ্ছে- বাবুল অপেরার নবাব সরফরাজ খাঁ, নিউ গণেশ অপেরার আঁধারের মুসাফির, দেবী সুলতানা, বলাকা অপেরার সুলতানা রাজিয়া, নবপ্রভাত অপেরার মা হলো বন্দি, সত্যনারায়ণ অপেরার শ্রীমতি বেগম, শিরিন যাত্রা ইউনিটের এ পৃথিবী টাকার গোলাম, অগ্রগামী নাট্য সংস্থার যৌতুক ও দেবদাস, চণ্ডী অপেরার শার্দুল জারাক খান, বিশে ডাকাত, প্রতিমা অপেরার জালিম সিংহের মাঠ, রাজমহল অপেরার কে ঠাকুর ডাকাত, নবরঞ্জন অপেরার মুঘল-এ আজম, তুষার অপেরার মানবী দেবী, বিরাজ বউ, চারণিক নাট্যগোষ্ঠীর রক্তস্নাত ৭১, সবুজ অপেরার হকার ও গঙ্গা থেকে বুড়িগঙ্গা, আদি দিপালী অপেরার সংসার কেন ভাঙে ও মেঘে ঢাকা তারা, ভাগ্যলক্ষ্মী অপেরার ফরিয়াদ ও ফাঁসির মঞ্চে। একুশে শতকের দুই দশকে উল্লেখযোগ্য দল ও পালার তালিকায় রয়েছে- আনন্দ অপেরার ডাইনি বধূ, চৈতালী অপেরার জীবন এক জংশন, নিউ রঙমহল অপেরার দু’টুকরো বউমা, চ্যালেঞ্জার যাত্রা ইউনিটের জন্ম থেকে খুঁজছি মাগো, সিজার্স যাত্রা ইউনিটের চরিত্রহীন, দেশ অপেরার বাংলার মহানায়ক ও বিদ্রোহী বুড়িগঙ্গা, চারণিক নাট্যগোষ্ঠীর মহীয়সী কৈকেয়ী, লোকনাট্য গোষ্ঠীর বর্গী এল দেশে, ব্রহ্মপুত্র যাত্রা ইউনিটের বঙ্গবন্ধুর ডাকে, তিতাস অপেরার রক্তে রাঙানো বর্ণমালা, ডায়মন্ড যাত্রা ইউনিটের মায়ের চোখে জল ও জয়যাত্রার বীরকন্যা প্রীতিলতা। বিষয়বস্তুর দিক থেকে প্রতি বছরই দুই ধরনের যাত্রাপালা মঞ্চায়িত হয়ে আসছে। একটি নাটকীয় গুণসম্পন্ন সংলাপ প্রধান মূল যাত্রা। যেমন- নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মা-মাটি-মানুষ, সোহ্রাব-রুস্তম, জানোয়ার, একটি পয়সা। আরেকটি হচ্ছে রূপকথা কিংবা লোককাহিনিভিত্তিক সংগীত বহুল পালা। যেমন- রহিম বাদশা ও রূপবান কন্যা, লাইলী মজনু, আলোমতি-প্রেমকুমার, কমলার বনবাস, গুনাইবিবি প্রভৃতি। এসব পালা পরিবেশনকারী দলগুলোকে গীতিনাট্য বা ঝুমুর দল বলা হয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে সংগঠিত এ শ্রেণির দলগুলো হচ্ছে ঢাকার বিশ্বেশ্বরী অপেরা, গাইবান্ধার সোনালী অপেরা, মুন্সীগঞ্জের শিল্পী অপেরা, নোয়াখালীর ভাগ্যলিপি অপেরা, লক্ষ্মীপুরের কেয়া যাত্রা ইউনিট এবং নারায়ণগঞ্জের আজাদ অপেরা। ’৪৭ থেকে ’৭১- এই ২৪ বছরে যাত্রাদল ছিল ২৬টি। স্বাধীনতার পরের বছর ৫০, ক্রমান্বয়ে ১০০, ১৫০- এভাবে হু হু করে ১৯৮৭-৮৮ মৌসুমে দলের সর্বোচ্চ সংখ্যা দাঁড়ায় ২১০-এ। অশ্লীলতার অজুহাতে তখন থেকে সরকারিভাবে বারবার নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। অনিশ্চয়তা আর মন্দা ব্যবসার কবলে দলের সংখ্যা কমতে থাকে। ২১০ থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দল সংগঠিত হচ্ছে প্রতি মৌসুমে ৩০-৪০টি করে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে প্রথম জাতীয় যাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। ঘোষণাপত্রে বলা হয়, যাত্রাকে অবক্ষয়ের কবল থেকে রক্ষা এবং যাত্রাভিনয়ের মানের মূল্যায়ন কল্পে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম এ উৎসবের আয়োজন। এর পর ১৯৯৫ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে আরও ৪টি জাতীয় যাত্রা উৎসব এবং ২০১০ সাল পর্যন্ত কয়েকটি লোকনাট্যোৎসব এবং সপ্তাহব্যাপী যাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম দুটি উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার অর্জন করেন অমলেন্দু বিশ্বাস এবং শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হন শবরী দাশগুপ্তা। এর পরের উৎসবগুলোয় শ্রেষ্ঠ অভিনেতা স্বপন কুমার, সুলতান সেলিম। শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী রিক্তা সুলতানা ও চন্দ্রা ব্যানার্জি। বিভিন্ন পর্যায়ে পুরস্কৃত হন অশোক ঘোষ, মেরী চিত্রা, প্রতিমা সরকার, এম. সিরাজ মহীতোষ, অমল দত্ত, সরল খাঁ, মুক্তি রানী প্রমুখ। বর্তমান লেখক ১৯৯৩ সালে চতুর্থ যাত্রা উৎসবে বিশেষ যাত্রাব্যক্তিত্বের সম্মান অর্জন করেন। এর বাইরেও যাত্রাজগতে এমন কয়েকজন শক্তিমান গুণী অভিনেতা অভিনেত্রী রয়েছেন, যাদের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এরা হলেন- মুকুন্দ ঘোষ, ননী চক্রবর্তী, ভিক্টর দানিয়েল, সাধন মুখার্জি, নরেশ ঘোষ, কল্পনা ঘোষ, পূর্ণিমা ব্যানার্জি, বিবেক গৌরাঙ্গ আদিত্য এবং হাবিব সারোয়ার। যাত্রাপালা বিষয়ে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম এখনো চলছে। এগুলো হচ্ছে ‘ঈশা খাঁ’কে প্রত্নযাত্রায় রূপান্তর (২০১২), মুনীর চৌধুরীর ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’কে যাত্রাপালাকারে উপস্থাপন (২০১৩), ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ’ শিরোনামের একটি অনুষ্ঠানে বিভিন্ন গুণীজনদের সঙ্গে প্রতি বছর অমলেন্দু বিশ্বাসকেও যুক্ত করা (২০১৬), দেশীয় পালা ও বিবেক নিয়ে যাত্রা উৎসবের আয়োজন এবং কয়েকজন শিল্পীকে সম্মাননা প্রদান (২০১৯)। বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার একটি যাত্রা নীতিমালা প্রণয়ন ও গেজেটভুক্ত করে ২০১২ সালের ৩০ আগস্ট। এরই আওতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি গঠন করে যাত্রাশিল্প উন্নয়ন কমিটি। আগে যাত্রাদলের লাইসেন্স দেওয়া হতো ডিসি অফিস থেকে। ২০১৩ থেকে দল নিবন্ধন করছে শিল্পকলা একাডেমির এ উন্নয়ন কমিটি। তবে নিবন্ধিত দলগুলো জেলা প্রশাসন থেকে মাঠপর্যায়ে যাত্রানুষ্ঠান করার অনুমতি পাচ্ছে না। ৫০ বছরের যাত্রা পর্যালোচনায় এটি একটি বেদনাদায়ক চিত্র।

যাত্রাপালার ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে আছেন এক মহান ব্যক্তি, নাম ব্রজেন্দ্র কুমার দে (১৯০৭-১৯৭৬)। তিনি সর্বমোট ১৮৯টি পালা লিখেছেন। শুধু তাই নয়, যাত্রার রচনা রীতিকে সংস্কার ও সমকালীন করেছেন। জন্ম বর্তমান শরীয়তপুর জেলার গংগানগর গ্রামে। বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে বিভিন্ন জাতীয় যাত্রা উৎসবে, মেলায় পার্বণে এবং বিভিন্ন যাত্রাদলে তার রচিত যাত্রাপালাই সবচেয়ে বেশি অভিনীত হয়েছে। ছোটখাটো একটি তালিকা দেওয়া যেতে পারে। যেমন- দোষী কে, চণ্ডীমঙ্গল, সোহ্রাব-রুস্তম, বাঙালি, রাজ সন্ন্যাাসী, চাঁদ সুলতানা, আঁধারের মুসাফির, বর্গী এল দেশে, চাষার ছেলে, রাজনন্দিনী, স্বামীর ঘর, ধর্মের হাট, লীলাবসান, বিদ্রোহী নজরুল, নটি বিনোদিনী, করুণাসিন্ধু বিদ্যাসাগর। প্রথম জাতীয় যাত্রা উৎসব স্মরণিকায় তার সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘চারণ কবি মুকুন্দ দাশের পর এমন মৃত্তিকাসংলগ্ন আধুনিক যাত্রাপালা নির্মাতা এ দেশে একাধিক জন্মগ্রহণ করেননি।’ তিনি ‘যাত্রাপালাসম্রাট’ ও লোকনাট্যগুরু’ উপাধি পেয়েছিলেন। পরিমার্জন ও পরিশীলিত যাত্রাপালার যে ধারা ব্রজেন দে তৈরি করে গেছেন, তার অনুসারী হয়ে সেই চেতনায় এগিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পালাকাররা। যাত্রার মানোন্নয়নে নিজের দায়বদ্ধতা থেকে পালা লিখছেন পশ্চিমবঙ্গের বিধায়ক ভট্টাচার্য, উৎপল দত্ত, অমর ঘোষ, মন্মথ রায় প্রমুখ যশস্বী নাট্যকাররা। আমাদের এখানে সেই মনমানসিকতা এখনো দেখা যাচ্ছে না। তবে কিছুটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন মামুনুর রশীদ। সবুজ অপেরার ব্যানারে ‘ওরা কদম আলী’ এবং চারণিক নাট্যগোষ্ঠীর ব্যানারে ‘এখানে নোঙর’ যাত্রামঞ্চে অভিনীত হয়। কিন্তু পুরোপুরিভাবে যাত্রার আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য না থাকায় নাটক দুটির পালা রূপান্তরে তেমন সফলতা আসেনি। এ বন্ধ্যাত্ব কাটিয়ে সময়ের দাবি মেটাতে গত শতাব্দীর ৮০’র দশক থেকে যাত্রার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই মৌলিক যাত্রাপালা লিখে যাচ্ছেন। এ তালিকায় রয়েছে- পরিতোষ ব্রহ্মচারীর ক্লিওপেট্রা, ফুলন দেবী, নদীর নাম মধুমতি, জালাল উদ্দীনের রাজ্যহারা, কিছু খেতে দাও, আরশাদ আলীর গৌরীমালা, সতী কলংকিনী, সাহেব আলীর জংলী মেয়ে, ননী চক্রবর্তীর যৌতুক, দস্যু রানি, কলিকালের মেয়ে, এমএ মজিদের কমলা সুন্দরী, ঘুণে ধরা সমাজ। সাধন মুখার্জির চণ্ডালের মেয়ে, পৃথিবীর আত্মহত্যা, মহসীন হোসাইনের অমর প্রেম, সম্রাট কবি বাহাদুর শাহ্, মীরজাফরের আর্তনাদ, অতুল প্রসাদ সরকারের কারবালার কান্না, হাসানের বিষপান, মতিউর রহমানের রাজ সিংহাসন, যৌতুক হলো অভিশাপ, রাখাল বিশ্বাসের মানস প্রতিমা, রক্তাক্ত সমাজ। সেকেন্দার আলী শিকদারের হোসেনের অন্তিম শয্যা, সফিকুল ইসলাম খানের দায়মুক্তি, সভ্যতার লজ্জা, আমিনুর রহমান সুলতানের বিদ্রোহী বুড়িগঙ্গা, বিউটি বেগমের রাজনর্তকি ও মিলন কান্তি দে’র দাতা হাতেম তাই, বিদ্রোহী নজরুল, রক্তে রাঙানো বর্ণমালা। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে রচিত পালাগুলো হচ্ছে শেখ সিদ্দিক আলীর সুন্দরবনের জোড়া বাঘ, জ্যোৎুা বিশ্বাসের রক্তস্নাত ৭১, আমিনুর রহমান সুলতানের জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু, সফিকুল ইসলাম খানের জাতির পিতার আত্মদান, হারুন উর রশীদের জয় বঙ্গবন্ধু, সাধন মুখার্জির শতাব্দীর মহানায়ক, জাহাঙ্গীর হোসেনের একাত্তরের মহানায়ক, এমএ মজিদের ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, সোনার বাংলা ও মিলন কান্তি দে’র বাংলার মহানায়ক ও বঙ্গবন্ধুর ডাকে।

এই একুশ শতকে বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালার প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে উত্তরণ ঘটে। ২০০৪ সালে ড. সেলিম আল দীনের তত্ত্বাবধানে প্রথম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রাবিষয়ক কর্মশালা শুরু হয়। ২০১৭ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কার্যক্রম আবার চলে ড. ইউসুফ হাসান অর্কের পরিচালনায়, ২০০৮ ও ২০১৩ সালে ড. ইসরাফিল শাহীনের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘদিন যাত্রার ক্লাস চলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে ড. কামাল উদ্দীন কবীরের তত্ত্বাবধানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ২০১৯ সালে রহমান রাজুর তত্ত্বাবধানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রার প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মশালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থীরা যাত্রাপালার অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেন, যা ৫০ বছরের ঘটনা পঞ্জিতে যুক্ত হওয়ার দাবি রাখে।

২০২১ সাল। অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা, সুখ-দুঃখের স্মৃতি, ঝড়-তুফানের মধ্য দিয়ে এখন ৫০ বছরের মুখোমুখি আমরা। মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রান্তে দাঁড়িয়ে স্বভাবতই আমাদের জিজ্ঞাসা- কী হবে যাত্রাশিল্পের? এ সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ কী? করোনার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত যাত্রাশিল্পীরা আবার নতুন করে বাঁচতে চায়। নির্মাণ করতে চায় নতুন যাত্রাপালা। যে পালায় থাকবে বঙ্গবন্ধুর কথা, স্বাধীনতার কথা। এর জন্য প্রয়োজন জাতীয় পৃষ্ঠপোষকতা। প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। ৫০ বছরের প্রাপ্তি- অপ্রাপ্তি, ব্যর্থতা হতাশা ধুয়ে মুছে নতুন অঙ্গীকারে শুরু হোক নতুন পথচলা। সম্মিলিত উচ্চারণ হোক যাত্রার জন্য চাই নতুন আলোকিত পথ। সামাজিক যাত্রাপথ।

লেখক : নাট্যকার

সাহিত্য ও সংষ্কৃতি বিভাগের আরো খবর
এবার একুশে পদক পাচ্ছেন যারা

এবার একুশে পদক পাচ্ছেন যারা

যাত্রাপালার ইতিহাস

যাত্রাপালার ইতিহাস

অমর বইমেলা ১৮ মার্চ শুরু

অমর বইমেলা ১৮ মার্চ শুরু

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেলেন যে ১০ জন

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেলেন যে ১০ জন

একুশে বইমেলা আপাতত স্থগিত, ফেব্রুয়ারিতে হচ্ছে না

একুশে বইমেলা আপাতত স্থগিত, ফেব্রুয়ারিতে হচ্ছে না

জাতীয় সংস্কৃতি নীতি সংশোধনের উদ্যোগ

জাতীয় সংস্কৃতি নীতি সংশোধনের উদ্যোগ