ঢাকা শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬

শরীরে ট্যাটু আঁকার বিষয়ে ইসলাম যা বলছে


গো নিউজ২৪ | মুফতি মুহাম্মদ মিনহাজ উদ্দিন প্রকাশিত: মার্চ ২, ২০২০, ১০:৩৭ এএম
শরীরে ট্যাটু আঁকার বিষয়ে ইসলাম যা বলছে

শরীরে উল্কি বা ট্যাটু আঁকা পশ্চিমাবিশ্বে সাধারণ ফ্যাশন। ইদানীং আমাদের দেশেও কিছু মানুষের কাছে এটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন চিত্রশিল্পী, গায়ক ও খেলোয়াড় থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নানা রঙের ও ধরনের উল্কি-ট্যাটু দেখা যায়।

জার্মানিতে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, ৩৫ বছরের নিচে যাদের বয়স তাদের পাঁচজনের মধ্যে একজনের গায়ে ট্যাটু আঁকা রয়েছে। আর এখন এসে দেখা যাচ্ছে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরবি ভাষায় বিভিন্ন প্রকারের উল্কি-ট্যাটু আঁকার প্রবণতা। কিছু লোক আবার কালিমাসহ কোরআন-হাদিসের বিভিন্ন বাণী ব্যবহার করে ট্যাটু করছেন।

উল্কি হলো ‘শরীরের চামড়ায় সুঁই বা এ জাতীয় কোনো কিছু দিয়ে ক্ষত করে তাতে বাহারি রং দিয়ে নকশা করা। এ ধরনের ট্যাটু বা উল্কি সাধারণত স্থায়ী হয়ে থাকে এবং সহজে ওঠানো যায় না।’

স্বাভাবিকভাবে এই উল্কি-ট্যাটু আঁকা হয় বিদ্যুৎচালিত একটি যন্ত্রের সাহায্যে। যেটা দেখতে অনেকটা ডেনটিস্টের ড্রিল মেশিনের মতো। মেশিনের মাথায় রয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম সুঁই। সুঁইয়ের মাথায় রং লাগানো থাকে। প্রতিবার সুঁইকে যখন চামড়ার ভেতরে প্রবেশ করানো হয়, সেই সঙ্গে রংও ভেতরে প্রবেশ করে। রঙের পরিমাণ এক মিলিলিটারেরও কম হয়। চামড়ার যে স্তরে রংটি লাগানো হয়, তার নাম ডের্মিস।

উল্কি আঁকার ব্যাপারে কোরআনের বক্তব্য : শরীরে ট্যাটু বা উল্কি আঁকা অধিকাংশ ফিকাহবিদদের মতে হারাম। (হাশিয়াতু ইবনে আবিদিন, খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা : ২৩৯) কারণ মানুষের স্বাভাবিক শারীরিক সৌন্দর্য নষ্ট করে কৃত্রিমভাবে সৌন্দর্য সৃষ্টি করা ইসলামে নিষিদ্ধ ও গর্হিত। পাশাপাশি আলাদা চুল লাগানো, ভ্রু কেটে ফেলা ইত্যাদি ইসলামে নিষিদ্ধ।

কেননা এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্ট অঙ্গে পরিবর্তন আনা হয়; যা তিনি অপছন্দ করেন। কিয়ামতের দিন এই লোকদের তিনি তার সামনে তার সৃষ্টিতে পরিবর্তন করতে বলবেন।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম কাঠামো দিয়ে।’ (সুরা তিন, আয়াত : ০৪) অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তারা আল্লাহর সৃষ্টির বিকৃতি করবেই।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১১৯)

আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘তারা আল্লাহকে পরিত্যাগ করে শুধু নারীর আরাধনা করে এবং শুধু অবাধ্য শয়তানের পূজা করে। যার প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। শয়তান বলল আমি অবশ্যই আপনার বান্দাদের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে অবলম্বন করবো। তাদের পথভ্রষ্ট করব, তাদের আশ্বাস দেব; তাদের পশুদের কর্ণ ছেদন করতে বলব এবং তাদের আল্লাহর সৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন করতে আদেশ দেব। যে কেউ আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, সে প্রকাশ্য ক্ষতিতে পতিত হয়।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১১৭-১১৯)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যখন আল্লাহ ও তার রাসুল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন, তখন কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই। আর যে কেউ আল্লাহ ও তার রাসুলের অবাধ্যতা করে সে সুস্পষ্ট ভ্রষ্টতায় লিপ্ত হয়।’ (সুরা-আহজাব, আয়াত : ৩৬)

উল্কি আঁকার ব্যাপারে হাদিস : আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, যেসব নারী নকল চুল ব্যবহার করে এবং যারা অন্য নারীকে নকল চুল এনে দেয়, যেসব নারী উল্কি অঙ্কন করে এবং যাদের জন্য করে, রাসুল (সা.) তাদের অভিশাপ দিয়েছেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৫৯৮, মুসলিম, হাদিস : ৫৬৯৩)

আবদুল্লা ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যেসব নারী সৌন্দর্যের জন্য উল্কি অঙ্কন করে এবং যাদের জন্য করে, যেসব মহিলা ভ্রু উৎপাটন করে এবং দাঁত ফাঁকা করে, আল্লাহতায়ালা তাদের অভিসম্পাত করেছেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৬০৪)

এমন আরও একটি হাদিস মুসলিম শরিফে এসেছে যেটা হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি যার সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৩১)

মোদ্দাকথা, শখের বসেই হোক কিংবা ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হিসেবে হোক আল্লাহর সৃষ্টিতে হস্তক্ষেপ ও পরিবর্তন করে উল্কি-ট্যাটু ইত্যাদি আঁকা হারাম। তবে যদি চিকিৎসার জন্য ট্যাটু আঁকার বাস্তবিক প্রয়োজন পড়লে তা তখন বৈধ হবে।

উল্কি বা ট্যাটু শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নিষিদ্ধ তা নয়; বরং বিভিন্ন ক্ষতিকর দিকের পাশাপাশি বেশ কিছু শারীরিক অসুবিধা ও সমস্যাও এতে তৈরি হয়।

উল্কির কারণে অজু-গোসলে অসুবিধা : উল্কির কারণে চামড়ায় পানি পৌঁছাতে যদি বাধার সৃষ্টি হয়, তাহলে অজু আদায় হবে না। আবার ফরজ গোসলও সম্পন্ন হবে না। ফলে সব সময় অপবিত্র শরীর বয়ে বেড়াতে হবে। তাই শরীরে উল্কি না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

উল্কি আঁকানোর অপকারিতা : শরীরে উল্কি আঁকানোর বৈজ্ঞানিক কোনো উপকারিতা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। উল্টো উল্কি ব্যবহারে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি রয়েছে। হেপাটাইটিস, টিউবারকিউলোসিস, টিটেনাসের মতো ইত্যাদি রোগের সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, উল্কির রংও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। কারণ উল্কি আঁকার রাসায়নিক পদার্থ চামড়ার ভেতরের স্তরে প্রবেশ করে। আর যেহেতু এই উল্কি সারা জীবন শরীরে থাকবে, তাই ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থও সারা জীবন দেহে থেকে যাবে। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের অসুখ এমনকি ক্যানসার হওয়া অসম্ভব কিছু না।

ভয়ংকর রাসায়নিক পদার্থ থেকে তৈরি করা হয় উল্কির রং।

এফা মারিয়া কাটস নামে একজন গবেষক একটি গবেষণাগারে কাজ করছেন। শরীরের অঙ্কিত উল্কির জন্য তৈরীকৃত রঙের রাসায়নিক পদার্থ কতটা ক্ষতিকারক, তা নিয়ে তিনি গবেষণা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী থেকে শুরু করে উল্কি আঁকার কালি নিয়ে গবেষণা করি। ২০১০ সালে আমরা বেশ কিছু ট্যাটু-পার্লার থেকে প্রায় ৩৮ ধরনের কালি আমরা সংগ্রহ করি।

অনেক রং বা কালি এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে তৈরি করা হয়, যা কোনো প্রাণীর জন্য ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এর মধ্যে একটি পদার্থের নাম এজো ডাই। রংটি এমনিতে কোনো ক্ষতি করে না, কিন্তু অন্য কোনো কিছুর সংস্পর্শে এলে তা অত্যন্ত ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে। এ ছাড়া আরও অনেক রাসায়নিক পদার্থ আছে, যা ব্যবহারে কোনো নিষেধ নেই। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তা মানবদেহে ব্যবহার করা সংগত নয়। এই পদার্থগুলো মানবদেহে ঢকে কী কী ক্ষতি করতে পারে, তা নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।’

বিভিন্ন হাদিসের বর্ণনায় দেখা গেছে, বর্তমানের মতো আগেকার যুগে নারীরাই বেশি উল্কি অঙ্কন করাত। বিভিন্ন সমীক্ষায় জানা যায়, বিশ্বের ৫৮ শতাংশ নারীর শরীরে অন্তত একটি ট্যাটু রয়েছে। সে তুলনায় পুরুষের রয়েছে ৪১ শতাংশ। ট্যাটুর পথ ধরে অশ্লীলতা চর্চার খবরও দেশ-বিদেশে প্রকাশ পেয়েছে। এসব কারণে তুরস্ক, ইরান ও আরব আমিরাতে উল্কি আঁকানো নিষিদ্ধ।

গোনিউজ২৪/এন

ইসলাম বিভাগের আরো খবর
শাবান মাসের ফজিলত 

শাবান মাসের ফজিলত 

মসজিদে মুসল্লি সীমিত রাখার অনুরোধ

মসজিদে মুসল্লি সীমিত রাখার অনুরোধ

পবিত্র শবে বরাত ৯ এপ্রিল

পবিত্র শবে বরাত ৯ এপ্রিল

করোনায় দেশের কোনো মসজিদ বন্ধ হচ্ছে না

করোনায় দেশের কোনো মসজিদ বন্ধ হচ্ছে না

পবিত্র শবে মেরাজের রজনী

পবিত্র শবে মেরাজের রজনী

আজ পবিত্র শবে মেরাজ

আজ পবিত্র শবে মেরাজ