ঢাকা শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২০, ১৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৭

এক বিরল সম্মাননা, কোমায় থেকেই পেলেন পদোন্নতি


গো নিউজ২৪ | নিজস্ব প্রতিনিধি প্রকাশিত: অক্টোবর ১৭, ২০২০, ০৮:৪৬ এএম আপডেট: অক্টোবর ১৭, ২০২০, ১০:০১ এএম
এক বিরল সম্মাননা, কোমায় থেকেই পেলেন পদোন্নতি

পদোন্নতি পাওয়ার মাসখানেক আগে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন সেনাবাহিনীর 'কিং অব দ্য ব্যাটল' বা সাঁজোয়া কোরের লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা। দেশ-বিদেশে চিকিৎসা চলার এক পর্যায়ে তিনি চলে যান গভীর কোমায়। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) টানা সাত বছর ধরে এ অবস্থায় রয়েছেন চৌকস কর্মকর্তা রাজা। চাকরি জীবনের শেষ দিন গত ১২ অক্টোবর তিনি পেলেন এক বিরল সম্মাননা, কোমায় থেকেই পেলেন পদোন্নতি।
হাসপাতালে কোমায় থাকা অবস্থায় ওই দিন সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাছাওয়ার রাজাকে কর্নেল পদে পদোন্নতি দিয়ে র‌্যাঙ্ক ব্যাজ পরানো হয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পদোন্নতির এক বিরল মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। যে কোনো দেশের সেনাবাহিনীর ইতিহাসেই বাহিনীর একজন কর্মকর্তার জন্য এমন পদোন্নতি অনন্য উদাহরণ।

তাছাওয়ার রাজা মরমী শিল্পী হাছন রাজার বংশধর। তিনি ১৯৮৯ সালের ২৩ জুন সাঁজোয়া কোরে কমিশন পাওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তিনটি সাঁজোয়া রেজিমেন্টে বিভিন্ন পদে চাকরিসহ ঘাটাইল সেনানিবাসে একটি রেজিমেন্টের অধিনায়কও ছিলেন তিনি। তার অধীন ইউনিটটি ২০০৮ সালে ডিভিশনে সেরা ইউনিট হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এছাড়া আর্মার্ড স্কুল ও পদাতিক স্কুলের রণকৌশল প্রশিক্ষকের দায়িত্বও পালন করেন সেনাবাহিনীর এই চৌকস কর্মকর্তা। বাহিনীতে প্রশিক্ষক হিসেবেও খ্যাতনামা এই সেনা কর্মকর্তা ইরাক ও কুয়েত শান্তিরক্ষা মিশনে বিশেষ অবদানের জন্য 'পিস মেডেলে' ভূষিত হন। তিনি চীন ও আমেরিকা থেকে সাঁজোয়াযানের ওপর নেন উচ্চতর প্রশিক্ষণ। ছিলেন মিরপুর স্টাফ কলেজের প্রশিক্ষকও।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী এই কর্মকর্তা ২০১৩ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল থেকে কর্নেল পদোন্নতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেনাসদরে কর্মরত অবস্থায় ওই বছরের ১১ মার্চ হার্ট অ্যাটাক হয় তার। এর পর থেকেই তিনি কোমায় চলে যান। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তার এই অসুস্থতাকে 'হাইপোস্কিক স্মিমিক ইনজুরি টু ব্রেইন এফেক্টস' বলা হয়। তাকে সুস্থ করে তুলতে বাহিনীর পক্ষ থেকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় থাইল্যান্ডে। আশাহত হয়ে ফিরতে হয় সেখান থেকে। কিন্তু হাল ছাড়েননি সিএমএইচের চিকিৎসক, সহকর্মী আর স্বজনেরা। সিএমএইচের ৩১৪ নম্বর কেবিনে কোমায় থেকে চলতে থাকে তার চিকিৎসা। দীর্ঘ সাত বছরের বেশি সময় ধরে কোমায় থাকা সেই কেবিনেই গত ১২ অক্টোবর সেনা পোশাক পরা অবস্থায় তাকে পরিয়ে দেওয়া হয় কর্নেল মর্যাদার র‌্যাঙ্ক ব্যাজ। ওই সময়ে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সদ্য পদোন্নতি পাওয়া কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজার স্ত্রী আর তিন সন্তানও উপস্থিত ছিলেন। বিরল মানবিক এই দৃষ্টান্তে তখন সেখানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এই পদোন্নতির মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৩১ বছর তিন মাসের চাকরি জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল সেনা কর্মকর্তা তাছাওয়ার রাজার।

সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে স্বামীকে এমন বিরল সম্মানে ভূষিত করায় কৃতজ্ঞতায় আনন্দাশ্রু দেখা দেয় কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজার স্ত্রী মোসলেহা মুনিরা রাজার চোখে। যিনি দীর্ঘ সাত বছর ধরে স্বামীর পাশে থেকে আশায় বুক বেঁধে আছেন কোমা থেকে একদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন তাছাওয়ার রাজা।

মোসলেহা মুনিরা রাজা বলছিলেন, তিনি চিন্তাও করেননি সেনাবাহিনী থেকে তার স্বামীকে এভাবে সম্মানিত করা হবে। প্রমোশনের ঠিক এক মাস আগে তার স্বামী অসুস্থ হয়ে গেলে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন। এখন তিনি খুশি। এভাবে তার স্বামীকে সম্মানিত করে তাদের পুরো পরিবারকে সেনাবাহিনী আরও বেশি কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ করল বলে জানান তিনি।

সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, সিএমএইচের চিকিৎসক দল আর স্বামীর সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মোসলেহা মুনিরা বলেন, তাছাওয়ার রাজাকে তার কর্মের যোগ্য প্রতিদান দিয়েছে সেনাবাহিনী। এই পদোন্নতির সিদ্ধান্ত সেনাপ্রধানের এক মহানুভবতার পরিচয়। পদোন্নতির এমন উপহারের অনভূতি অসাধারণ। সেনাবাহিনীর সব সহায়তা পাওয়ায় সাত বছর ধরে তিনি লড়াই করতে পেরেছেন। দুই ছেলে, এক মেয়েকে মানুষ করতে পেরেছেন। সেনাবাহিনী পাশে না থাকলে এসব সম্ভব হতো না।

সিএমএইচের আইসিইউ প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাসুদ মজুমদার জানান, কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজার এ অসুস্থতাকে চিকিৎসার ভাষায় বলা হয় 'হাইপোস্কিক স্মিমিক ইনজুরি টু ব্রেইন এফেক্টস'। তার হার্ট ফিরে এসেছে, ব্রেইন ফিরে আসেনি। তার মস্তিস্কের নিচের অংশ ভালো আছে, কিন্তু মস্তিস্কের যে অংশ মানুষের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে জড়িত, ওই অংশের কোষগুলো পুনরুজ্জীবিত হয়নি।

কর্নেল তাছাওয়ার রাজার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থার বিষয়ে এই চিকিৎসক বলেন, 'আমরা সব সময়েই আশাবাদী থাকি।'
সেনা কর্মকর্তা তাছাওয়ার রাজার সহকর্মী আর স্বজনরা জানিয়েছেন, তিনি একজন সাহিত্যমনা কর্মকর্তা। কর্মজীবনে 'হাছন রাজাসমগ্র', 'ও জেনারেল, মাই জেনারেল', 'বাংলাদেশ আর্মার্ড কোর', 'বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ইতিহাস'সহ বিভিন্ন বই লিখেছেন তিনি।

এক্সক্লুসিভ বিভাগের আরো খবর
দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা রূপকথার রাজার অজানা গল্প

দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা রূপকথার রাজার অজানা গল্প

ভয় দেখাচ্ছে করোনার আরও একটি নতুন উপসর্গ

ভয় দেখাচ্ছে করোনার আরও একটি নতুন উপসর্গ

সঞ্চয়পত্র যেভাবে কিনবেন এবং যা যা লাগে

সঞ্চয়পত্র যেভাবে কিনবেন এবং যা যা লাগে

পাখির বাসা ভাড়া দিয়ে ১৫ লাখ টাকা আয়

পাখির বাসা ভাড়া দিয়ে ১৫ লাখ টাকা আয়

টিন সার্টিফিকেট যেভাবে বাতিল করবেন

টিন সার্টিফিকেট যেভাবে বাতিল করবেন

সরকারি চাকরিজীবীরা গৃহঋণ পাবেন যেভাবে

সরকারি চাকরিজীবীরা গৃহঋণ পাবেন যেভাবে