ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

করোনা বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে যেভাবে


গো নিউজ২৪ | নিজস্ব প্রতিনিধি প্রকাশিত: মে ৯, ২০২০, ০১:০০ পিএম আপডেট: মে ৯, ২০২০, ০৭:০০ এএম
করোনা বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে যেভাবে

করোনাভাইরাস পৃথিবীকে অনেক নতুন কিছু দেবে, মানুষের জীবনাচরণে অনেক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু বাঁচার জন্য খাবারের আর খাবারের জন্য কাজ করার কোনই বিকল্প থাকবে না। তাই কাজ আমাদের করাই লাগবে, আমরা যেখানে, যে অবস্থাতেই থাকি না কেন।

অনুমান করা হচ্ছে সারা দুনিয়াতেই দারিদ্রের হার বেড়ে যাবে। উন্নত দেশে তো বটেই আমাদের মত দেশেও দারিদ্র খুব খারাপ রূপ নেবে, শ্রম বিক্রি হবে খুব সস্তায়।

তাই আমাদের চেয়ে আর্থিকভাবে যারা উন্নত তাঁরা আমাদের মত তুলনামূলক গরীব দেশে তাঁদের শ্রমঘন শিল্প অন্য দেশ থেকে নিয়ে এসে চালু করবে। এটার দুটো কারণ, কম খরচে পণ্য উৎপাদন করে বাজারে টিকে থাকা আর একক সরবরাহ ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করে লাভের অংকটা আগের মত ঠিক রাখা।

মাত্র কয়েক বছর আগেও চীন ছিল সস্তা শমের একটা দেশ। পৃথিবীর সব উন্নত দেশই তাঁদের শিল্প কারখানা এনে চীনে প্রতিষ্ঠা করেন সস্তা শ্রম আর নতুন নতুন প্রযুক্তির এ‍্যাডাপ্টেশনের ক্ষমতার কারণে। ইতোমধ্যে চীন নিজেই এমন হয়ে পড়েছে যে সারা দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই তাঁদের পণ্যের, বিশেষ করে দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য রপ্তানি শুরু করে নিজেদের বাজার হিসেবে দখল করে নিয়েছে। বলা হয় যে চীনের অর্থনীতির তিন ভাগের এক ভাগই আসে তাঁদের রপ্তানি বাণিজ্য থেকে। 

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ফলে চীনের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হবার ফলে গোটা দুনিয়াই পণ্য সরবরাহে ব্যাপক ঝামেলা হওয়ায় বিরাট অসুবিধার মধ্যে পড়েছে। তাই তাঁরা নতুন করে চিন্তা ভাবনা শুরু করেছে একটি বিকল্প সরবরাহ চেইন তৈরি করতে।  

কয়েক হাজার মার্কিন আর জাপানিজ কোম্পানিকে চীন থেকে সরয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে দেশের সরকার। খবর বেরিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও গত মাসে বলেছেন, চীন থেকে বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা( গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন) কিভাবে পুনর্বিন্যাস করা যায় তা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারত, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের সঙ্গে আলোচনা করছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপিয়ান দেশগুলো চীন থেকে বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভাঙ্গতে চায়, করোনা বাস্তবতায় এটা তাঁদের উপলব্ধি।
 
এমতাবস্থায় বাংলাদেশ, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাউস, ইত্যাদির মত দেশগুলো মুখিয়ে আছে এসব জাপানিজ, ইউরোপিয়ান বা আমেরিকান কোম্পানি নিজ নিজ দেশে আনতে।

চীন এই অবস্থায় যেতে পারে বা যাবে তা আগেই অনুমান করে বিশ্বব্যাংক আর জাইকা মিলে বাংলাদেশ সরকারকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, বেজা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। সারা দেশে ১০০টির ও বেশি জায়গা বিভিন্ন ধরণের শিল্পাঞ্চলের জন্য নির্ধারণ করা হয়।

এর মধ্য সব চেয়ে বিশাল এলাকা হচ্ছে মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল যাতে জাপান  বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর পাশাপাশি বেজার রূপগঞ্জের এলাকাটিও জাপান নিয়েছে। এপ্রিলে ভারত সরকার তাদের যুক্তরাষ্ট্র ও বৈদেশিক মিশনগুলোর মাধ্যমে ওইসব কোম্পানিকে চীন থেকে ব্যবসা সরিয়ে আনতে আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শীর্ষ ভারতীয় কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে। এ সব কোম্পানির মধ্যে রয়েছে বিশ্ব খ্যাত মেডিক্যাল ডিভাইস প্রস্তুতকারী মেডট্রনিক পিএলসি এ্যাবট ল্যারেটরীরস।
 
ইউরোপীয় ইউনিয়ন পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মহামারীর আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধের সময় শ্রমমূল্যের ব্যয় এবং অন্যান্য কারণে চীন ভিত্তিক অনেক ব্যবসা ও কারখানা ভিয়েতনামে সরিয়ে নিয়ে বিকল্প সাপ্লাই চেইন তৈরির চিন্তা করেছিল আমেরিকা আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
 
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় অভাবনীয় সাফল্যের কারণে এই চিন্তা আরও শক্ত অবস্থান নিয়েছে। ভিয়েতনাম ২৮৮ জন করোনা সংক্রমণের শিকার হলেও শূন্য মৃত্যুর খবর আছে। তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশটিকে অন্যদের তুলনায় খুব শীঘ্রই তার অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করার পথে উঠে যাবে বলে রয়টার্সের সাক্ষাতকার দেওয়া জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
 
ভিয়েতনাম বলছে, "জুলাইয়ের মধ্যে চীন থেকে সরিয়ে আনা সম্ভাব্য নতুন নতুন কারখানার জায়গা প্রস্তুত হয়ে যাবে”। বিদেশী সংস্থাগুলিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্থানান্তরিত করতে সহায়তাকারী পরামর্শদাতারা বলেছেন যে মহামারী মোকাবেলায় ভিয়েতনামের সাফল্য ইতিমধ্যে দেশে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়ে তুলেছে।

একটি সরকারী সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভিয়েতনামে জরিপে ১২৬৫৬৫ টি প্রতিষ্ঠানের ৮৫.৭% বলেছে যে তারা মহামারী দ্বারা নেতিবাচকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিমান, পর্যটন, খাদ্য ও শিক্ষা খাতে পরিচালিত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
 
অন্যদিকে নিজেদের পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার কৌশল হিসেবে এবং একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে বেশকিছু উৎপাদনশীল কারখানা চীন থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এরই মধ্যে কারখানা স্থানান্তরে সহায়তা করতে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন।
 
চীনে থাকা ওই সব কারখানার বড় অংশ নিজেদের দেশে ফিরিয়ে নিতে চায় জাপান। তবে বেশকিছু শ্রমঘণ কারখানা ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ায় স্থানান্তর করার পরিকল্পনা আছে দেশটির। জাপানে স্থানান্তরে প্রণোদনার প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার খরচ করা হবে। বাকি প্রায় ১ হাজার ৭শ` কোটি টাকা কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশে কারখানা হস্তান্তরে ব্যয় করা হবে। সম্প্রতি দেশটির স্থানীয় গণমাধ্যম জাপান টাইমস এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
 
জাপানের কারখানা স্থানান্তরের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের জন্যও আশার আলো দেখছেন। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের বড় ব্যবসায়ী ও উন্নয়ন অংশীদার জাপান। বর্তমানে  দেশটির সাড়ে তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে। জাপানের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে।
  
বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ ধারণ করছেন যে, শ্রমঘন শিল্প, আর বিভিন্ন সংযোজন কারখানা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ অনেক উপযোগী। গত কয়েক বছর ধরে জাপান সহ উন্নত দেশগুলো বাংলাদেশের মানব সম্পদকে আধা দক্ষ ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছে, এতে করে বাংলাদেশে অনেক আধা দক্ষ ও দক্ষ কর্মী বাহিনী গড়ে উঠেছে।

এছাড়াও করোনাভাইরাসের কারণে বিদেশ থেকে একদল দক্ষ জনশক্তি দেশে ফিরে এসেছে, তাঁদের কাজে লাগানো যায়, তুলনামূলক খুব স্বল্প শ্রমমূল্যে। ব্যাপারটি চীন নিজেও জানে তাই সেদেশে বৈদেশিক মুদ্রা আর স্বর্ণের মজুত আছে আকাশচুম্বী। এছাড়া এই করোনা মহামারীর পরে যে বিশ্ব মন্দা দেখা দেবে সেখানে সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় বড় কোম্পানি, খনি, ইত্যাদি কিনে নেবে বা দীর্ঘ মেয়াদি সময়ের জন্য লীজ নেবে। চীন স্বল্প মূল্যে ভোগ্য পণ্যে তৈরির যে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে তাতে তার বাজার নষ্ট করা খুব সহজ হবে না।

এক দেশ না নিলে অন্য দেশে তাঁরা যাবে। যা হউক, এত কিছুর পরেও করোনা আমাদের মত উন্নয়নশীল বা হবু মধ্যম আয়ের দেশের জন্য হাজার সমস্যার মধ্যেও একটা অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন আলোর দেখা দিয়েছে, যা আমাদের উজ্জ্বল আগামীর ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে পারে, যদি কাজে লাগাতে পারি সেই সম্ভাবনা।

গোনিউজ২৪/এন

এক্সক্লুসিভ বিভাগের আরো খবর
করোনা ‘অপমানিত’ বোধ করছে বাংলাদেশে

করোনা ‘অপমানিত’ বোধ করছে বাংলাদেশে

বাংলাদেশে করোনা হেরে যাবে যেসব কারণে

বাংলাদেশে করোনা হেরে যাবে যেসব কারণে

দেশে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সহজ তিনটি উপায়

দেশে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সহজ তিনটি উপায়

বিশ্বজুড়ে কমে আসছে করোনার প্রভাব

বিশ্বজুড়ে কমে আসছে করোনার প্রভাব

করোনা: বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের সর্বশেষ পরিস্থতি

করোনা: বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের সর্বশেষ পরিস্থতি

করোনা বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে যেভাবে

করোনা বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে যেভাবে