ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২০, ৫ কার্তিক ১৪২৭

এক কেরানি এত টাকার মালিক!


গো নিউজ২৪ | নিউজ ডেস্ক প্রকাশিত: অক্টোবর ১০, ২০২০, ০৯:৪৬ এএম
এক কেরানি এত টাকার মালিক!

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) প্রধান অফিস সহকারী ছিলেন আব্দুল লতিফ। পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশাসনিক কর্মকর্তা। কিন্তু সম্পদের হিসাবে বড় বড় কর্মকর্তাকেও পেছনে ফেলেছেন তিনি। তার রয়েছে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ। চিঠি লিখে এক দিনেই ব্যাংক থেকে নিজের ও স্ত্রীর নামে তুলেছেন প্রায় কোটি টাকা। এতেই সন্দেহ হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টি জানতে পেরে চিঠি পাঠায় দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক)।

আব্দুল লতিফের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ বিভাগও। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আব্দুল্লাহীল কাফি স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে রেঞ্জ ডিআইজি অফিসে কর্মরত পুলিশ সুপার আব্দুস সালামকে তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, আব্দুল লতিফ আরএমপিতে যোগ দেওয়ার পর গত ১৩ বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতি, থানা থেকে মাসোহারা তোলা, নিয়োগ, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, মালপত্র না কিনেই বিল উত্তোলন এবং ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে তিনি নিজেই কাজ করে এই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

জানা গেছে, ২০০৭ সালে আব্দুল লতিফ প্রধান সহকারী হিসেবে আরএমপিতে যোগ দেন। যোগ দিয়েই তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে টাকার বিনিময়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ, আরএমপির থানাগুলোর ওসিদের বদলি ও পদায়ন শুরু করেন। তিনি কেরানি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হলেও ওসিরাই তাকে 'বড় ভাই' বলে সম্বোধন করেন।

২০১৭ সালে আব্দুল লতিফ এক দিনেই ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকে নিজ নামের হিসাব থেকে ৪০ লাখ এবং তার স্ত্রীর হিসাব থেকে ৫৮ লাখ টাকা তোলার জন্য চিঠি দেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টি জানতে পারলে একজন কর্মচারীর এত টাকার বিষয়ে তদন্তের জন্য দুদকে চিঠি দেয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় তিনি ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে সবকিছু ম্যানেজ করেন।

বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন আব্দুল লতিফ। রাজশাহী শহরের আলীগঞ্জ মৌজায় দুই কোটি টাকায় ১০ কাঠা জমি, কাজিহাটা মৌজায় আড়াই কোটি টাকায় চার কাঠা জমি, নাটোর শহরে আড়াই কোটি টাকা মূল্যের ১০ কাঠা জমি, নাটোরের বাগাতিপাড়ায় গ্রামের বাড়িতে দুই কোটি টাকায় ৪০ বিঘা জমি এবং ঢাকায় দুই কোটি টাকার দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। এ ছাড়া নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র আহ্বান করলেও সব ঠিকাদারকে শিডিউল দেন না আব্দুল লতিফ। ২০১৫ সাল থেকে বেশিরভাগ মেরামত ও সংস্কার কাজ, যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জাম কেনা থেকে শুরু করে আরও অনেক কাজ সারদা এলাকার আবদুর রহমান মুন্না নামে এক ঠিকাদারের মাধ্যমে করছেন। এই ঠিকাদারের পরিবারের সদস্যদের নামে ১০-১২টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০১৮-১৯ সালে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি জালিয়াতি করে এই ঠিকাদারকে তিনি কাজ দিয়েছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হলে লতিফের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তারপরও তিনি নগর পুলিশে স্বপদে বহাল রয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত আরএমপিতে মেরামত ও সংস্কার কাজ হয়েছে ছয় কোটি ৭০ লাখ টাকার। যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনা হয়েছে ১১ কোটি টাকার। মেরামতে ব্যয় করা হয়েছে ৫৭ লাখ টাকা। ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামে ব্যয় হয়েছে ১৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, মেরামত ও সংস্কারে নামমাত্র কাজ করে বাকিটা লুটপাট করেছেন লতিফ। যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনা হয়েছে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে। আর্চওয়ে গেটের বাজারমূল্য ৭০ হাজার টাকা থাকলেও শিডিউল মূল্য ছিল তিন লাখ ২০ হাজার টাকা। সাড়ে তিন হাজার টাকার সিসি ক্যামেরার শিডিউল মূল্য ছিল ১২ হাজার টাকা। এ ছাড়া ৫০-৫২ হাজার টাকা দামের কম্পিউটার কেনা হয়েছে ৯৮ হাজার টাকায়। প্রিন্টারের কালির শিডিউল মূল্য ছয় হাজার টাকা। লতিফ প্রতি মাসে ৫০টি কালির বিল করেন তিন লাখ টাকা।

অথচ নতুন কালি না কিনে রিফিল করেন ৫০০ টাকায়। কালির নামেই প্রতি মাসে দুই লাখ ৭৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন তিনি। প্রতি মাসে অন্যান্য স্টেশনারি সামগ্রীর বিল করেন চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। তবে মালপত্র কেনা হয় বড়জোর ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৯-২০ সালে টাঙ্গাইলের ঠিকাদার মো. শাহিনের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় ব্যবসা করেন লতিফ। ২০১৫ সালে ৭০ লাখ টাকার ওষুধ না কিনে টাকা আত্মসাতের ঘটনা জানাজানি হলে পুলিশ সদর দপ্তর হাসপাতালের তৎকালীন সুপারিনটেনডেন্টকে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে বদলি করা হয়। আরএমপির প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুল লতিফকে টেন্ডার ও কেনাকাটা কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার নির্দেশনা দেন। কিন্তু আরএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে লতিফ একই দায়িত্বে থেকেছেন।

এসব বিষয়ে ফোন করা হলে আব্দুল লতিফ বলেন, তার বিরুদ্ধে বেনামে দরখাস্ত করে এসব অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি উল্টো অভিযোগ করেন, রাজশাহী নগর পুলিশের প্রধান মোহরার শাহ আলম এসব অভিযোগ করেছেন। শাহ আলমও ছয়তলা দুটি বাড়ি ও একটি গাড়ির মালিক। লতিফ বলেন, এখন আমার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। কিছু বলার নেই। ব্যাংক থেকে এক দিনেই প্রায় কোটি টাকা উত্তোলনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে 'টেলিফোনে এসব বলা যাবে না' বলেই ফোন কেটে দেন তিনি।

তবে নগর পুলিশের প্রধান মোহরার শাহ আলম বলেন, আমি আব্দুল লতিফের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনিনি। আমার এমন কোনো সম্পদও নেই। লতিফ আমার বিরুদ্ধে কেন এমন অভিযোগ আনছেন, জানি না। তবে তিনি আমাকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে অভিযোগ করতে পারেন।

এ বিষয়ে নগর পুলিশ কমিশনার আবু কালাম সিদ্দিক বলেন, বিষয়টির তদন্ত চলছে। দোষী প্রমাণ হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আব্দুল লতিফের দুর্নীতির তদন্ত কর্মকর্তা রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজি অফিসের পুলিশ সুপার আব্দুস সালাম বলেন, এটা পুলিশ বিভাগের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তদন্ত চলাকালে এ নিয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

দুদকের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আব্দুল লতিফকে তার সম্পদের হিসাব চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি হিসাব দিয়েছেন। এখন তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।সমকাল

অপরাধ চিত্র বিভাগের আরো খবর
শহরে তিনটি বিলাসবহুল বাড়ির মালিক অফিস সহকারী

শহরে তিনটি বিলাসবহুল বাড়ির মালিক অফিস সহকারী

এক কেরানি এত টাকার মালিক!

এক কেরানি এত টাকার মালিক!

৪ শিশু মিলে এক শিশুকে ধর্ষণ, অতঃপর…

৪ শিশু মিলে এক শিশুকে ধর্ষণ, অতঃপর…

বন্ধ হচ্ছে না চিংড়িতে পুশ!

বন্ধ হচ্ছে না চিংড়িতে পুশ!

নিজের দুর্বিষহ জীবন ও লজ্জা ঠেলে উঠে দাঁড়াতে চান সেই নারী

নিজের দুর্বিষহ জীবন ও লজ্জা ঠেলে উঠে দাঁড়াতে চান সেই নারী

ভুয়া এনজিও করে ঋণের নামে ঠান্ডা মাথায় প্রতারণা করতেন পারভীন

ভুয়া এনজিও করে ঋণের নামে ঠান্ডা মাথায় প্রতারণা করতেন পারভীন