ঢাকা শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৯, ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

আদালতের তোয়াক্কা না করেই ৬৫টি গাছ কেটে ফেললেন ইউএনও 


গো নিউজ২৪ | শামসুদ দোহা, লালমনিরহাট প্রতিনিধি: প্রকাশিত: জুলাই ১২, ২০১৯, ০৯:৫১ পিএম আপডেট: জুলাই ১৪, ২০১৯, ০৯:৪৪ পিএম
আদালতের তোয়াক্কা না করেই ৬৫টি গাছ কেটে ফেললেন ইউএনও 

লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আব্দুল করিমের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননাসহ সাধারণ জনগণকে ভয় ভীতি প্রদর্শন ও নানা প্রকার অনিয়ম অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। 

যোগদানের পরদিন থেকে তিনি বেশ কিছু হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে উপজেলা পরিষদকে চরম বিবব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছেন। 

সম্প্রতি তিনি পাটগ্রামে একটি বিলুপ্ত সিটমহলে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত গঠন ছাড়াই একটি সড়কের পাশের অর্ধশতাধিক গাছ কাটার নির্দেশ দেন। তার নির্দেশে ৬৫ টি তরতাজা জীবিত ইউক্যালেক্টর গাছ কেটে ফেলা হয়। 

জানা গেছে, ১ একর ৪৬ শতাংশ জমির ওপর দু'দিকে দু'টি রাস্তার মধ্যে একটি জনসাধারণের জন্য ছেড়ে দেন জমির মালিক জয়নাল আবেদীন। সিটমহল বিনিময়ের পর ভূমি জরিপের সময় অন্য রাস্তাটিও ভুলবশত রেকর্ড হওয়ার কারণে সেটি সংশোধনের জন্য লালমনিরহাট সহকারি জজ আদালতে আবেদন করেন জয়নাল আবেদন পরিবার গং। সেই রাস্তাটিতে থাকা ৬৫টি গাছ কেটে ফেলেন ইউএনও। সেসময় ইউএনওকে আদালতে আবেদনের কাগজ দেখালে তিনি অবজ্ঞা করেন বলে প্রত্যেক্ষদর্শীরা জানান। ইউএনও বলেন, কিসের আদালত, আমিই আদালত। 

এসময় তার সঙ্গে ছিলেন পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনছুর আলী, ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সুমন কুমার মহন্ত, ইন্সপেক্টর (ডিএসবি) ফিরোজ হোসেনসহ পুলিশফোর্স ও তার কার্যালয়ের সহকারিগণ।

ইউএনও মো. আব্দুল করিমসহ অন্যরা

এজাহার ও ঘটনার বিবরণ সুত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ২৮ এপ্রিল ১৬নং ভোটবাড়ী বিলুপ্ত সিটমহল এলাকার বাসিন্দা জাবর উদ্দীন পরিবার গং পূর্বশত্রুতা বশত জয়নাল আবেদীন পরিবারের বিরুদ্ধে রাস্তা বন্ধ করে চলাচলে বাঁধা সৃষ্টির অভিযোগ এনে পাটগ্রাম ইউএনও বরাবর একটি আবেদন করেন। আবেদনটি তদন্ত করেন পাটগ্রাম সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেব কুমার শর্মা। তদন্ত প্রতিবেদনে রাস্তাটি আংশিক বন্ধ করে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে মর্মে পাটগ্রাম ইউএনও কর্তৃক গত ২১ মে একটি নোটিশ করা হয়। নোটিশের জবাব দিতে জয়নাল আবেদীন পরিবার ভয়ে উপস্থিত না হলে ৪ জুন রোববার ইউএনও আব্দুল করিম সরেজমিন পরিদর্শনে যান এবং রাস্তাটি সচল রাখার জন্য জয়নাল আবেদীন পরিবারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। এরপর জয়নাল আবেদীন পরিবার রেকর্ড সংশোধনের জন্য লালমনিরহাট সহকারি জজ আদালতে একটি মামলা করেন। বিজ্ঞ আদালত মামলা আমলে নিয়ে নথিভুক্ত করেন। যার নম্বর অন্য ১১৭/১৯।

জয়নাল আবেদীন নিজে ও ৮ ছেলে বাদী হয়ে করা মামলাটিতে বিবাদী করা হয়েছে সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা, পাটগ্রাম সহকারি কমিশনার (ভূমি), ইউনিয়ন তহশিলদার, জোনাল ভূমি কর্মকর্তা রংপুর, মহাপরিচালক ভূমি অধিদপ্তর, ভূমি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা এবং জেলা প্রশাসক, লালমনিরহাটকে

সেখানে ইউএনওকে আসামী করা হয়নি। জয়নাল আবেদীন পরিবার আদালতে আশ্রয় নিয়েছেন জেনে পাটগ্রাম ইউএনও গত ৭ জুলাই রোববার বিকেল ৪ টার সময় শ্রীরামপুরে অন্য একটি ঘটনায় পরিদর্শনে গিয়ে ফেরার পথে সিটমহলের রাস্তাটি পর্যবেক্ষণ করতে ইচ্ছা পোষণ করেন। সেদিন সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে এক বাংলাদেশির মৃত্যু হলে পুলিশ-বিজিবি লাশ দেখতে যায়। লাশের সুরতহাল রিপোর্ট শেষে ওসিসহ আরো দু'জন ইন্সপেক্টর ইউএনও’র ডাকে সিটমহল ভোটবাড়ীতে যান। সেখানে কী কাজ কেন যেতে হবে সেটা আগে জানানো হয়নি বলে তদন্ত ওসি মোবাইলে বলেন। 

ভোটবাড়ীতে গিয়েই ইউএনও আব্দুল করিম তার কার্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মী রিপন মিয়া, ড্রাইভার আব্দুল ওয়াহেদ, স্টেনো কাম কম্পিউটার অপারেটর জালাল হোসেনসহ উপস্থিত ভাড়াটে কিছু লোককে গাছ কাটার আদেশ দেন। 

এসময় জয়নাল আবেদীন পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে রেকর্ড সংশোধনের জন্য মামলার কাগজ দেখাতে গেলে ইউএনও তা হাতে নিয়ে মাটিতে ছুড়ে ফেলেন এবং বলেন- কিসের আদালত, আমিই আদালত। 

গাছের সঙ্গে কাটা হয় কয়েটি বাঁশও

তাৎক্ষণিক ফোনে বিষয়টি আত্মীয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আজিজুল ইসলাম বাবুলকে জানান জয়নাল আবেদীন। এরপর সচিব নিজে ইউএনওকে ফোন করেন। সচিবের ফোন পেয়ে আরও বেশি রেগে যান ইউএনও। 

একপর্যায়ে গাছগুলো কাটা হলে এলাকাবাসীর তোপের মুখে ওসির পরামর্শে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন ইউএনও। ইউএনওকে ওসি বলেন, গাছগুলো কাটা মনে হয় অন্যায় হল স্যার, এখান থেকে চলে যাওয়াই ভালো। 

এদিকে ঘটনার পর উল্টো জয়নাল আবেদীন পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন ইউএনও আব্দুল করিম। 

ঘটনার পর রাত ৯টার দিকে ইউএনও'র নিরাপত্তাকর্মী রিপন মিয়া ও ড্রাইভার আব্দুল ওয়াহেদকে আহত দেখিয়ে পাটগ্রাম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
 
হাসপাতালে তাদের দুজনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর যথাক্রমে ১৬৯৩/১০ বেড নং ০৭ এবং ১৬৯৪/১১ বেড নং ০৮। বুধবার রাত ১২ টার সময় পাটগ্রাম হাসপাতালে সাংবাদিকরা গিয়ে জানতে পারেন, ইউএনও'র দু'জন স্টাপ ভর্তি হয়ে বেড বুকিং দিয়ে তখনই চলে গেছে। তারা রাতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকবেন না। একটা মামলা করার কাজে সার্টিফিকেট লাগবে বলে ভর্তির হন। হাসপাতালের সার্টিফিকেটে বেড নম্বর ৭ ও ৮ পুরুষ রোগী ওয়ার্ডে লেখা থাকলেও বাস্তবে কোন বেডও নাই রোগীও নাই।

হাসপাতাল থেকে সার্টিফিকেট নেওয়ার পরে ইউএনও'র স্টেনো টাইপিস্ট কাম কম্পিউটার অপারেটর জালাল হোসেন বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ০৫(৮/৭/১৯)। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, জনগণ বে-আইনী ভাবে দলবদ্ধ হয়ে সরকারী কাজে বাঁধা প্রদান করে এবং সরকারী কর্মচারীকে গুরুতর জখম করে ও বল প্রয়োগ করাসহ ভয়ভীতি হুমকি প্রদান করে। 

মামলায় জয়নাল আবেদীন পরিবারকে হুকুমের আসামি করা হয়। মামলার পর থেকে বাপ-ছেলেসহ পরিবরের ৭ সদস্য পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। 

এ প্রসঙ্গে জানতে চেয়ে পাটগ্রাম থানায় ফোন করলে ওসি (তদন্ত) ও মামলার আইও সুমন কুমার মহন্ত বলেন, সেদিন সেখানে ইউএনও'র ডাকে হঠাৎ করে যাওয়া। পুলিশকে আগে বলা হয়নি গাছ কাটা বা কোন অভিযানের কথা। যাই হোক, গাছকাটা দেখে জমির মালিক ও তার ছেলেরা হতাশায় সেদিন নিজেরা নিজেদের বাড়ীঘরে আগুন দিবে বলে হুমকি দেয় যার ভিডিও করেছেন ইউএনও স্যার।

গাছগুলো কেটে এভাবেই ফেলা রাখা হয় রাস্তায়

ঘটনা প্রসঙ্গে জানার জন্য পাটগ্রাম ইউএনও আব্দুল করিমের ফোনে কথা হলে তিনি বলেন, সরকারি রেকর্ডভুক্ত রাস্তা উদ্ধার করতে অভিযান পরিচালনা করেছি। এসময় রাস্তাটি দখলমুক্ত করতে আমার লোকজন ১১কি ১৩টা গাছ কাটে। সর্বমোট ৬৫ টা তাজা গাছ কাটা হয়েছে উল্লেখ করে ইউএনও বলেন, বাকীগুলো ওই এলাকার লোকজন কাটে। তবে তার আদেশে কাটা হয়েছে বলে স্বীকার করেন ইউএনও। 

তিনি আরো বলেন, গাছ কাটার সময় দু'জন স্টাপ প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হয়েছে। সেজন্য সরকারি কাজে বাঁধা দানে মামলা করা হয়েছে। 

তবে জয়নাল আবেদীন পরিবার জমির রেকর্ড সংশোধনের জন্য আদালতে আবেদনের পরও কেন গাছ কাটা হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, লোকগুলো খুব চালাক। তিনমাস আগের থেকে তাদেরকে নোটিশ করা হয়েছে অথচ তারা একমাস আগে আদালতে মামলা দিয়েছে। রায়ের কপি নাই। 

অন্যদিকে মামলা চলমান অবস্থায় ইউএনও’র এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি বলে মনে করেন এলাকার মানুষ। 

তারা অভিযোগ করেন, ইউএনও আব্দুল করিমের এমন হঠকারীতা ও নানা অনিয়মের কারণে গত মে মাসে ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুরে বদলি করা হয়। কিন্তু তিনি বদলি ঠেকিয়ে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। রাস্তাটির রায় যাই হোক, সরকার নয় তো জমির মালিক যে পায় পাবে কিন্তু রাস্তার ধারে লাগানো গাছগুলোর কী অপরাধ! আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত গাছগুলো এভাবে তড়িঘড়ি করে না কাটলে কী এমন সমস্যা হত?

এলাকাবাসী আরো জানান, এলাকায় অনেক মানুষ জয়নাল আবেদীনের জমির উপর দিয়ে চলাচল করে। স্কুল থেকে দক্ষিণ বরাবর সোজা একটি রাস্তা সেটাও জয়নাল পরিবার গং ও হাজ্বী গোরাচান দুজনে জমি দান করেছেন। শুধুমাত্র পূর্বশত্রুতার জেরে জয়নাল পরিবারের বড়ধরনের ক্ষতি করা হলো।

সত্তর উর্ধ্ব জয়নাল আবেদীন বলেন, বয়স বিবেচনা করে দেখেন অসুস্থ দেহ খানা অচল। ছেলেরাও অত্যন্ত নম্র-ভদ্র। আমার জমিতে দু'টি রাস্তা। একটা সরকারকে দিমো। জনগণ চলাচলে বাঁধা নাই। আরেকটা রাস্তা ক্ষেত খামারে যাবার রাস্তা। সেটা রেকর্ড সংশোধন করার জন্য আদালত গিয়েছি। মামলাও দিয়েছি কিন্তু ইউএনও সেটা বুঝতে চায়না।

জানা গেছে, দানশীল এ ব্যক্তি ১২ বিঘা জমি দান করেছেন স্থানীয় মসজিদে। ১৮ বিঘা জমি দান করে জয়নাল আবেদীন শিক্ষানগর উচ্চ বিদ্যালয় ও রহিমউদ্দীন ফুলজানটারী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণ করেছেন। ইতোমধ্যে বিদ্যালয় দুটো সরকারী অনুমোদন পেয়েছে। সিটমহল বাসিন্দা হিসেবে নব্য এই বাংলাদেশি পরিবারটির বিরুদ্ধে বিগত দিনে কোন মামলা বা জিডি থানায় নাই। 

গো নিউজ২৪/আই

দেশজুড়ে বিভাগের আরো খবর
প্রকাশ্যে মৎস্য ব্যবসায়ী খুন

প্রকাশ্যে মৎস্য ব্যবসায়ী খুন

তিন চাকার যান চলাচলের দাবিতে  অবরোধ

তিন চাকার যান চলাচলের দাবিতে অবরোধ

চাঁদাবাজী মামলায় দুই যুবক গ্রেপ্তার

চাঁদাবাজী মামলায় দুই যুবক গ্রেপ্তার

বিদ্যুৎ স্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু

বিদ্যুৎ স্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু

আশুগঞ্জে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ডাকাত নিহত

আশুগঞ্জে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ডাকাত নিহত

একটি ব্রীজ হলে পাল্টে যাবে ৭ গ্রামের মানুষের জীবন চিত্র

একটি ব্রীজ হলে পাল্টে যাবে ৭ গ্রামের মানুষের জীবন চিত্র