ঢাকা শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২১, ১০ বৈশাখ ১৪২৮

দুর্গন্ধহীন ও পরিবেশবান্ধব দেশি মুরগি পালনে সফলতা


গো নিউজ২৪ | বাগেরহাট প্রতিনিধি প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২১, ১০:৫৩ এএম
দুর্গন্ধহীন ও পরিবেশবান্ধব দেশি মুরগি পালনে সফলতা

সাধারণ মানুষের কাছে মুরগির খামার মানেই প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ও নোংরা পরিবেশের একটি জায়গা, যেখানে কিছু উচ্চবর্ধনশীল মুরগি লালনপালন করা হয়। বাজার থেকে চড়া দামে মুরগি কিনে বাণিজ্যিক খাবার খাইয়ে নির্দিষ্ট সময় পরে তা বিক্রি করে দেওয়া হয়। ব্যবসাটি লাভজনক হলেও দুর্গন্ধ ও নোংরা পরিবেশের কারণে অনেকেই বিষয়টি থেকে সরে আসেন। তবে প্রচলিত সব ধারণা পাল্টে দিয়ে দুর্গন্ধহীন ও পরিবেশবান্ধব দেশি মুরগি পালন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বাগেরহাটের মো. ইছহাক খান।

১৯৮২ সালে এসএসসি পাস করার পর থেকে সংসারে অভাব-অনটন থাকায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে রাজমিস্ত্রি হয়ে যান। ২০০০ সালের দিকে উপঠিকাদারি শুরু করেন। ২০০৪ সালের দিকে বাগেরহাটে জমি কিনে বাড়ি করেন। মা, স্ত্রী ও চার ছেলে নিয়ে তার সংসার। বড় ছেলে এমদাদুল খান সরকারি পিসি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে পড়েন। মেজ ছেলে ইব্রাহিম খান খুলনা ম্যানগ্রোভ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে ডিপ্লোমা করছেন। সেজ ছেলে ইমরান খান স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে এবং ছোট ছেলে ইসরাফিল তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করে।

যেভাবে শুরু

একসময় ইছহাক উপঠিকাদারি করলেও আর্থিক সচ্ছলতা না আসায় ২০১৬ সালে বাগেরহাট সদর উপজেলার কালদিয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে ‘মাহমুদা অ্যাগ্রো ফার্ম’ নামে একটি খামার প্রতিষ্ঠা করেন। শুরু করেন দেশি মুরগি দিয়ে। বিভিন্ন জায়গা থেকে দেশি মুরগির ডিম সংগ্রহ করে নিজস্ব ইনকিউবেটরে (বাচ্চা ফোটানোর যন্ত্র) ফোটান ৬০০ বাচ্চা। খামারে এখন আছে ছোট-বড় ২ হাজার মুরগি। ১০ টাকা দরে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০টির মতো ডিম বিক্রি করেন। সব মিলিয়ে দেড় লাখ টাকা নিয়ে তার খামারের যাত্রা শুরু।

এ বিষয়ে ইছহাক খান বলেন, দীর্ঘদিন ঠিকাদারি করে আর্থিকভাবে কিছুটা সচ্ছলতা আসে। কিন্তু ২০১৩ সালের পর থেকে একের পর এক লোকসানের মুখে পড়ি। একপর্যায়ে অনেক টাকা ঋণ হয়ে যায়। কী করব ভাবতে ভাবতে একদিন মাত্র ৫০ হাজার টাকায় একটি ইনকিউবেটর কিনি এবং বিভিন্ন স্থান থেকে দেশি মুরগির ডিম সংগ্রহ করে বাচ্চা ফোটাই। চার বছরে এই ফার্মের আয় থেকে ঋণের কিছু অংশ পরিশোধও করেছি। তিন ছেলের লেখাপড়া, সংসার―সবই চলে এই ফার্মের আয়ে।

সরেজমিনে ইছহাকের খামার

তিনতলা বাড়ির নিচতলা ও তিনতলার ওপর ইছহাকের মুরগির খামার। তার খামারে তেমন গন্ধ পাওয়া যায়নি। খামারে দেশি মুরগির পাশাপাশি বেশি দামের বিদেশি মুরগি রয়েছে। এর মধ্যে তিতির, কাজাকাস্তান, ফেন্সি অন্যতম। ফার্মের মুরগি ও ডিমের ওপর মানুষের যে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে, ইছহাক খানের খামারের দেশি মুরগির ডিম ও মাংসের উৎপাদনে তা ইতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।

শেডগুলো থেকে কিছু ডিম সংরক্ষণ করেন বাচ্চা ফোটানোর জন্য। আবার বাড়ির নিচতলায় স্থাপন করেছেন ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানো ও বাচ্চা বড় করার শেড। তিনতলায় থাকে পূর্ণবয়স্ক মুরগি। ঘরের সামনের শেডে আলাদা করে রাখা হয়েছে মোরগগুলোকে।

মুরগি পালন পদ্ধতি

ইছহাকের দাবি, তিনি অর্গানিক পদ্ধতিতে মুরগি পালন করেন। তার কাছে মুরগি পালনের একাধিক বই রয়েছে। কোনো সমস্যা হলে সেই বই দেখে বাজারে প্রচলিত ওষুধ কিনে খাওয়ান। বাগেরহাট জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগও প্রয়োজনীয় কারিগরি ও চিকিৎসা সহায়তা দিচ্ছে বলে জানান ইছহাক।

মুরগির খাদ্য

ইছহাক খান খামারে কোনো বাণিজ্যিক খাবার ব্যবহার করেন না। স্থানীয় বাজার থেকে কালোজিরা, মেথি, সাদা তিল, তিশি, সাবু দানা, হলুদগুঁড়া, লেবু, চাল এবং স্থানীয়ভাবে অ্যালোবেরা, থানকুনিপাতা, তুলসীপাতা, নিমপাতা, শজনেপাতা, কলমিশাক, ছাঁচিশাক, হেলেনচা শাক সংগ্রহ করে মিশ্রণপদ্ধতিতে খাওয়ান। ফলে মুরগি শতভাগ স্বাস্থ্যসম্মতভাব বেড়ে উঠছে। এ কারণে খামারে কোনো প্রকার দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয় না।

 খরচ ও লাভ

এ বিষয়ে ইছহাক জানান, ডিম, বাচ্চা ও মোরগ বিক্রি করে সব ব্যয় মিটিয়ে মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা লাভ থাকে তার। তবে আগামী ছয় মাসে এই লাভের পরিমাণ লক্ষাধিক টাকা হবে বলে মনে করছেন ইছহাক। তিনজন কর্মচারীকে তিনি মাসে ১৮ হাজার টাকা বেতন দেন বলেও জানান।

খামারে কর্মরত বেলাল ও ডালিম বলেন, আমরা মাহমুদা অ্যাগ্রো ফার্মে কাজ করি। প্রতিদিন সকালে এসে মুরগির বাচ্চাকে খাবার দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ও ডিম সংগ্রহ করা আমাদের কাজ। এখান থেকে যে বেতন পাই, তাতে আমাদের সংসার চালানো যায়। আমরা এখানে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করি। কারণ, অন্যান্য মুরগির খামারের চেয়ে এই খামার আলাদা। এখানে কোনো দুগন্ধ সৃষ্টি হয় না।

ইছহাকের পাশে বিসিক

পরিবেশবান্ধব, অর্গানিক খাদ্যপদ্ধতি ও গন্ধহীন হওয়ায় ডিম ও মুরগি বাজারজাতকরণে বাগেরহাট শিল্প সহায়ক কেন্দ্র (বিসিক) থেকে সহযোগিতা পাচ্ছেন ইছহাক।

এ ব্যাপারে শিল্পসহায়ক কেন্দ্র (বিসিক) বাগেরহাটের উপব্যবস্থাপক মো. মোফাজ্জল হোসেন বলেন, মুরগি পালন ব্যবসা হিসেবে অনেক পুরোনো হলেও ইছহাক খানের ধারণা অনন্য। বাগেরহাটে বাণিজ্যিকভাবে দেশি মুরগির উদ্যোক্তা তেমন তৈরি হননি। আমরা ইছহাকের খামারের মুরগি ও ডিম সহজে বাজারজাতকরণের জন্য পরামর্শসহ সব ধরনের সহযোগিতা করছি। ব্যবসা পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ এবং ইছহাককে আর্থিক সহযোগিতা প্রদানেরও চেষ্টা করছি আমরা।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেমন দেখছেন, এমনটা নিয়ে ইছহাক বলেন, বাজারে দেশি মুরগির মাংস ও ডিমের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। আমার পর্যাপ্ত পরিমাণ জমি রয়েছে, কিন্তু নগদ টাকার অভাবে খামারের আকার বড় করতে পারছি না। যদি স্বল্প সুদে ঋণ বা সরকারি কোনো সহযোগিতা পাই তাহলে আমি এই খামারকে আরও বড় করে তুলতে পারব। এতে ভোক্তাদের প্রকৃত চাহিদা পূরণ করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন ইছহাক।

এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, ইছহাক খান একজন প্রাণিবান্ধব মানুষ। তার দেশি মুরগির খামারটি একটি আধুনিক ও সম্ভাবনাময় মুরগির খামার। এটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আমরা সব সময় ইছহাক খানকে কারিগরি সহায়তা ও চিকিৎসা-সুবিধা দিয়ে থাকি। ইছহাকের মতো যদি দেশি মুরগির খামার করে আরও উদ্যোক্তা তৈরি হতেন, তাহলে দেশে দেশি মুরগির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হতো।

কৃষি ও প্রকৃতি বিভাগের আরো খবর
বিরল রেড কোরাল সাপটির চিকিৎসা যেভাবে হচ্ছে

বিরল রেড কোরাল সাপটির চিকিৎসা যেভাবে হচ্ছে

দুর্গন্ধহীন ও পরিবেশবান্ধব দেশি মুরগি পালনে সফলতা

দুর্গন্ধহীন ও পরিবেশবান্ধব দেশি মুরগি পালনে সফলতা

শীতে টবের গাছের যত্ন নেবেন যেভাবে

শীতে টবের গাছের যত্ন নেবেন যেভাবে

দেশে মনিপুরী ইলিশ চাষ করলেই ব্যবস্থা

দেশে মনিপুরী ইলিশ চাষ করলেই ব্যবস্থা

ছোট পরিবারের জন্য এলো নতুন জাতের লাউ

ছোট পরিবারের জন্য এলো নতুন জাতের লাউ

বিরল প্রজাতির বন্য ছাগল উদ্ধার

বিরল প্রজাতির বন্য ছাগল উদ্ধার