২৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার ০৯ ডিসেম্বর ২০১৬ , ২:০৬ পূর্বাহ্ণ

পাত্রী নির্বাচনের ৫টি জরুরি নববি হেদায়েত


গো নিউজ২৪ আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০১৫ শুক্রবার
পাত্রী নির্বাচনের ৫টি জরুরি নববি হেদায়েত

পাত্রী নির্বাচনে শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গি হলো দীনদারকে অগ্রাধিকার দিবে। চাই যত সম্পদশালী, অভিজাত বংশীয়া, সুন্দরী রূপসী হোক না কেনো। সর্বাগ্রে দৃষ্টি দিবে দীনদার কিনা, স্বভাব-চরিত্র ভালো কিনা।

পাত্রী নির্বাচনে শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গি হলো দীনদারকে অগ্রাধিকার দিবে। চাই যত সম্পদশালী, অভিজাত বংশীয়া, সুন্দরী রূপসী হোক না কেনো। সর্বাগ্রে দৃষ্টি দিবে দীনদার কিনা, স্বভাব-চরিত্র ভালো কিনা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

تنكح المرأة لاربع لما لها ولحسبها ولجمالها ولدينها فاظفر بذات الدين تربت يداك . # رواه البخاري

‘সাধারণত চারটি বিষয় দেখে মেয়েদের বিয়ে করা হয়—তার সম্পদ দেখে, বংশীয় কৌলিন্য দেখে, সৌন্দর্য দেখে, দীনদারি দেখে, অতএব তুমি দীনদারিকে প্রাধান্য দাও। নচেৎ তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

শুধু সম্পদ দেখবে না : বিয়ের পাত্রী নির্বাচনে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন রকম দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। কেউ বিয়ে করে পাত্রীর ধনসম্পদ দেখে। ধনী বাবার একমাত্র মেয়ে, প্রভূত ধন-সম্পদের অধিকারিণী। দামী গাড়ি, শানদার বাড়ি, পোশাকে আশাকে অতুলনীয়া। ওর সাথে বিয়ে হলে জীবনের মজাই হবে আলাদা। সম্পূর্ণ নিশ্চিমেত্ম নির্বিঘ্নে জীবন কাটবে। দুঃখ-দারিদ্র, অভাব-অনটনের হাহুতাশ থাকবে না। দীনদার হোক বা বেদ্বীন সেদিকে দৃষ্টি দেয়ার তেমন প্রয়োজন অনুভব করে না। এ-ধরনের লোকদের মোহ ভাঙ্গতে বেশি দেরি লাগে না। মানুষ সাধারণত তাড়াপ্রবণ, দ্রম্নত সিদ্ধান্ত নেয়া তার স্বভাব। একপেশে চিমত্মায় অভ্যসত্ম। বিপরীত দিক ভেবে দেখার অবসর পায় না। ধনীর দুলালীকে বিয়ে করলে জীবন যে বিষিয়ে ওঠবে, জীবনের সুখ স্বস্থি চলে যাবে তা ঘুর্ণাক্ষরেও মাথায় আসে না। দাম্পত্য জীবনের যে কর্তৃত্ব আল্লাহপাক রেখেছেন পুরম্নষের হাতে তা ক্ষুণ্ণ হবে। স্ত্রীর ভরণপোষণ দিয়ে কুলাতে পারবে না। ঘরের সামান-পত্র, চমৎকার ফার্নিচার, ছেলেমেয়ের রংবেরঙের পোশাক আশাক, যা দেখে পুরম্নষের মন ভরে, মন প্রফুলস্ন হয়, সেখানে মনে প্রশামিত্ম তো আসেই না, উপরন্তু বিতৃষ্ণা ও মনসত্মাপে মন ভরে যায়। কারণ, এসব অন্যের দেয়া মাল, নিজের উপার্জিত নয়। স্ত্রীর কাছেও তেমন সম্মান বাকি থাকে না। কারণ বিত্তশালী স্ত্রীর কাছে স্বামীর মর্যাদা একজন ম্যানেজারের চেয়ে বেশি নয়। অতি ভদ্রা সুশীলা হলে অবশ্য ম্যানেজারের সম্মান পাবে, অন্যথায়—আল্লাহ না করম্নন—অভদ্র হলে প্রতি মুহূর্তে খোটা দিবে, মুখ ঝামটা দিবে; স্বামীর মন বিষিয়ে তুলবে। স্ত্রৈণ স্বামীর প্রতি স্ত্রীর যেমন ভক্তি ভালোবাসা থাকে না, সমত্মানদেরও থাকে না যথাযথ ভক্তি শ্রদ্ধা। এমন স্ত্রীর কোনো ভুল ধরতে গেলে বা কোনো বিষয়ে সতর্ক করলে ফুঁসে উঠবে। হাজারটা কথা শুনিয়ে দিবে। ভেবে দেখুন, এমন স্ত্রী দিয়ে কি জীবনে সুখী হওয়া যায়? এদিকে ইঙ্গিত করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—

لا تزوجوهن لاموالهن فعسي اموالهن ان تطغيهن # رواه ابن ماجة

‘ধনসম্পদ দেখে কাউকে বিয়ে করো না; হতে পারে সম্পদ তাকে দাম্ভিক অবাধ্য বানিয়ে দিয়ে দিবে।’

বংশ পূজা করবে না : কেউ আবার বংশীয় আভিজাত্য দেখে বিয়ে করে। জ্ঞানগুণ, মেধা-প্রতিভা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখার অবসর পায় না। ব্যক্তিগত জ্ঞানগুণ, যোগ্যতা দক্ষতাই যদি না থাকলো বংশীয় কৌলিন্য দিয়ে কি পানি খাবে? অনেক সময় দেখা যায় দীনদার না হওয়ায় বংশীয় আভিজাত্যের কারণে স্ত্রী হয়ে যায় অহংকারী দাম্ভিক। মাটিতে যেনো পা-ই পড়ে না, কেবল হাওয়ায় উড়ে। এতে পুরম্নষের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়, তার নেতৃত্ব ব্যাহত হয়। আবার এটাও উদ্দেশ্য নয় যে, বংশগৌরব একদমই দেখা যাবে না। বরং উদ্দেশ্য হলো—শুধু বংশ মর্যাদা দেখাই যথেষ্ট নয়, যতক্ষণ না দীনদারি, জ্ঞানগুণ, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য না থাকে। এটাও মনে রাখবে, ইসলামে প্রথম লক্ষণীয় বিষয় হলো দীনদারি পরে অন্যকিছু। দীনদারির বিপরীতে ধনসম্পদ, বংশ কৌলিন্য কিছুই নয়।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

ولامة خرماء سوداء ذات دين افضل # رواه ابن ماجة

‘দীনদার হলে কান কাটা, কালো বাঁদিও ভালো।’

অন্যান্য হাদিসেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মোত্তাকীরাই হলো আমার বন্ধু; যেখানে থাকুক, যে কেউ হোক।

সৌন্দর্য পূজারী হয়ো না : কেউ আবার রূপসৌন্দর্য দেখে মজে যায়। অন্যকিছু ভেবে দেখার ফুরসত পায় না। সুঠাম সুন্দর গড়ন। সুডৌল সুনিটোল অঙ্গসৌষ্ঠব। দুধে আলতায় গায়ের রং। চাদবদন মুখ। গোলাকার চেহারা। লীলায়িত অঙ্গভঙ্গি। শুধু তাই নয়, আধুনিক জ্ঞানমনস্ক, ফ্যাশন-সচেতন। সপ্রতিভ বন্ধুবৎসল। প্রাণোচ্ছ্বল হাসিখুশি ভরা। এসব যে মেয়েদের জন্য তেমন কোনো বৈশিষ্ট্যের পর্যায়ে পড়ে না একটুও ভেবে দেখে না। জ্ঞানযোগ্যতা ও চারিত্রিক পবিত্রতাই যদি না থাকে শুধু রূপলাবণ্য আর ফ্যাশন-সচেতনতা মাপকাঠি হতে পারে না। কেননা পরে এসব রূপসৌন্দর্য হাজারো ফেতনার কারণ হবে। সৌন্দর্যের গর্বে গর্বিণী, দাম্ভিক ও অভিমানী হয়ে যায়। অযথা খরচ ও বাইরে ঘোরার অভ্যাস হয়। নিজের রূপলাবণ্য প্রদর্শন করে বেড়ায়, পুরম্নষদের আকর্ষণ করে; নিজে যেমন ফেতনায় পড়ে, আরো হাজারজনকে ফেতনায় ফেলে। স্বামীর মান সম্মান ডুবিয়ে ছাড়ে। এমন রূপসৌন্দের্যের ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

لا تزوجوا النساء لحسنهن فعسي حسنهن يرديهن # رواه ابن ماجة

‘শুধু রূপ-লাবণ্য দেখে কোনো নারীকে বিয়ে করো না। কেননা নিছক রূপসৌন্দর্য সাধারণত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।’

দীনদারি ও জ্ঞানগুণ হওয়া চাই মাপকাঠি : এজন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বিয়ের পাত্রী নির্বাচনে দীনদারিকে মাপকাঠি বানাও। ধনসম্পদ, বংশগৌরব, রূপসৌন্দয—এসব মাপকাঠি হওয়া উচিত নয়। পাত্রী নির্বাচনে অবশ্যই জ্ঞানযোগ্যতা ও চারিত্রিক পবিত্রতার দিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা চাই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, শুধু রূপসৌন্দর্য আর ধনসম্পদ দেখে বিয়ে করো না, তাহলে ফেতনায় পড়বে। তোমরা দীনদারিকে প্রাধান্য দাও। দীনদার হলে কালো মেয়েও ভালো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন

ولكن تزوجوا علي الدين # ابن ماجة

‘তোমরা দীনদার দেখে বিয়ে করো।’

ফতহুল কাদীর গ্রন্থ প্রণেতা তাবরানীর বরাত দিয়ে এই হাদিসখানি উলেস্নখ করেছেন। রাসুল সা. বলেন,

من تزوج امرأة لعزها لم يزده الله الا ذلا ومن تزوجها لمالها لم يؤده الا فقرا ومن تزوجها لحسبها لم يوده الله الا دناءة ومن تزوج امرأة لم يزد بها الا ان يغض بصره ويحصن فرجه او يصل رحمه بارك الله له فيها وبارك لها فيه

‘যে ব্যক্তি কোনো নারীর রূপ দেখে বিবাহ করে আল্লাহ তাআলা তাকে হেয় করেন, আর যে ব্যক্তি কোনো নারীকে তার ধন-সম্পদ দেখে বিবাহ করে আল্লাহপাক তাকে অভাবী করেন, যে ব্যক্তি নারীর বংশ দেখে বিবাহ করে আল্লাহ তাকে অপদস্থ করেন। আর যে ব্যক্তি কোনো নারীকে চক্ষু সংযত, যৌনাঙ্গ সংযত এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক দৃঢ় করার মানসে বিবাহ করে মহান আল্লাহ সে দম্পতিকে বরকত সহায়তা দান করেন।’ [শামী]

দীনদার গুণবতী রমণী স্বামীর সেবাযত্নে সদা সচেষ্ট থাকে। স্বামীর মনোরঞ্জন নিজের সর্বপ্রধান দায়িত্ব মনে করে। ঘর সংসার সামাল দেয় সুষ্ঠুভাবে। তারা সাধারণত অহেতুক গর্ব ও অহমিকায় ভোগে না। সমত্মান লালন-পালন ও পরিচর্যায় থাকে একনিষ্ঠ। পাড়া প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে অযথা ঝগড়া করে না। দীনদার নেককার মহিলার ওপর অন্যদের আস্থা থাকে। পাড়া পড়শীরা সম্মান করে। এতে সংসার হয় সুখের। শান্ত নিরম্নদ্বিগ্ন ও ভদ্রোচিত। এজন্যই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে চারটি জিনিস পেলো সে দীন দুনিয়ার সর্বোত্তম নেয়ামত পেলো—কৃতজ্ঞ অন্তর, সদা জিকিররত জবান, কষ্ট সহিষ্ণ দেহ, সতী সাধ্বী স্ত্রী, যে স্বামীর মালের হেফাযত করে। [মিফতাহুল খিতাবাহ]

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বলেন, এমন মেয়েদের বিয়ে করবে যাদের ঈমান পাকা, আখেরাতের পথে যারা হয় সহায়ক। [ইবনে মাজা]

আমল আখলাক না দেখার পরিণতি : ভেবে দেখা উচিত আমল আখলাকের পরিবর্তে শুধু রূপসৌন্দর্য ও বংশীয় আভিজাত্য দেখলে দুনিয়ার কী অবস্থা হবে? ফেতনা ফাসাদ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। সামাজিক শামিত্ম স্বস্থি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। ইজ্জত আব্রম্ন ও সতীত্ব সম্ভ্রম হবে ভুলণ্ঠিত। অনেক মেয়ের স্বামী জুটবে না, যাদের নেই রূপলাবণ্য। ফলে তারা নির্লজ্জ বেহায়া হয়ে যাবে। নিজেরাই পুরম্নষদের প্রলুব্ধ করবে। এদিকে ইশারা করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

اذا خطب اليكم من ترضون دينه وخلقه فزوجوه الا تفعلوا تكن فتنة في الارض وفساد عريض # رواه الترمذي

‘যাদের দীনদারি স্বভাব-চরিত্র তোমাদের পছন্দ তারা যদি প্রসত্মাব দেয় বিয়ে দিয়ে দাও। অন্যথায় জমিনে ভীষণ ফেতনা ফাসাদ দেখা দিবে।’

জা/আ