২৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার ০৯ ডিসেম্বর ২০১৬ , ২:০০ পূর্বাহ্ণ

দেখে আসুন ঝর্ণা রাণি “খৈয়াছড়া”


গো নিউজ২৪ | পর্যটন ডেস্ক আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০১৫ বুধবার
দেখে আসুন ঝর্ণা রাণি “খৈয়াছড়া”

আকার আকৃতি ও গঠনশৈলির দিক দিয়ে নিঃসন্দেহে এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝর্ণা ‘খৈয়াছড়া’। এই ঝর্ণাতে আছে মোট ৭টি মুল ধাপ (কারো মতে ৯টি) এবং অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন ধাপ, যা বাংলাদেশের আর কোন ঝর্ণাতে এখনও পর্যন্ত দেখা যায়নি। তাই ‘খৈয়াছড়া’ কে বলা যায় বাংলাদেশের ঝর্ণা রাণি।

অবস্থানঃ খৈয়াছড়া ঝর্ণা চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পার্শ্বে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪.২ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। এর মধ্যে ১ কিলোমিটার পথ গাড়িতে যাওয়া যায় এবং বাকী পথ পায়ে হেঁটে যেতে হবে। ২০১০ সালে সরকার বারৈইয়াঢালা ব্লক থেকে বড়তাকিয়া ব্লকের ২৯৩৩.৬১ হেক্টরর পাহাড়কে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করলে খৈয়াছড়া ঝর্ণা জাতীয় উদ্যানের আওতাভুক্ত হয়।

বিবরনঃ খৈয়াছড়ার মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি অন্যান্য ঝর্ণার মতো সরাসরি পাহাড় থেকে নিচে এসে পড়েনি। ঝর্ণাটির মোট ৭টি ধাপ (কারো মতে ৯টি ধাপ) আছে। এর মধ্যে খুব সহজে নিচ থেকেই দেখা যাবে তিনটি ধাপ, কিন্তু ওপরের চারটি ধাপ দেখতে হলে বাম পাশের প্রায় খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে বেশ খানিকটা ওপরে।

ওপরের ওঠার পর তার সৌন্দর্য আপনার সমস্ত কষ্ট ভুলিয়ে দিবে। ওপরে উঠলে দেখা মিলবে আরো একটি ধাপের। এর বাম পাশ দিয়ে সামান্য হাঁটলেই দেখা মিলবে অপর তিনটি ধাপের। এতেও যদি আপনার মন না ভরে তাহলে এই তিনটি ধাপের পাশ দিয়ে পাহাড় বেয়ে উঠে যান আরো ওপরে, সেখানে আশপাশের বহুদূর বিস্তৃত পাহাড় আর জঙ্গলের অপূর্ব দৃশ্য কিছুক্ষণের জন্য হলেও আপনাকে ভুলিয়ে দেবে আপনার পরিশ্রম আর নিরাপদে নিচে ফিরে যাওয়ার ভাবনার কথা।

ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তাটি দারুন মনোমুগ্ধকর। গাড়ির রাস্তা পার হয়ে যখন হাঁটা শুরু করবেন এর চারি পাশের দৃশ্য দেখে আপনি মুগ্ধ হতে বাধ্য হবেন। খানিকক্ষণ উঁচু-নিচু রাস্তা পার হয়ে একসময় এসে পড়বেন পাহাড়ি ঝিরিপথে। এরপরই শুরু হবে আপনার আসল অ্যাডভেঞ্চার। আপনাকে ঝিরি পথ ধরেই এগিয়ে যেতে হবে। কখনো হাঁটুপানিতে পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটবেন তো সেই পানিই কখনো কখনো আপনার কোমর ছাড়িয়ে বুক পর্যন্ত উঠে আসবে। আনুমানিক দেড় ঘণ্টার মতো হাটার পর আপনি ঝর্ণার কাছে পৌছে যাবেন। এরপর যখন খৈয়াছড়ার দর্শন পাবেন, তখন বিস্ময়ে অভিভূত হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।

এই ঝর্ণার পানিতে গোসল করার লোভ সামলানো কারো পক্ষেই সম্ভব না। সুতরাং দেরি না করে নেমে পড়ুন ঠান্ডা ঝর্ণার জলে। পানি যেহেতু খুব বেশীনা তাই ডুবে যাওয়ার ভয় নেই। ঝর্ণার বাম দিক থেকে ডানদিক অপেক্ষাকৃত গভীর।

যেভাবে যাবেনঃ ঢাকার যেকোনো বাস কাউন্টার থেকে চট্টগ্রামগামী বাসে উঠবেন। যাওয়ার পথে ঢাকা চট্টগ্রাম রোডে চট্টগ্রামের মিরেরসরাই পার হয়ে বারতাকিয়া বাজারের আগে খৈয়াছড়া আইডিয়াল স্কুলের সামনে নামবেন। পথে যানজট না থাকলে ৪/৫ ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন মিরেরসরাই। বড় তাকিয়া বাজারে খৈয়াছড়া আইডিয়াল স্কুলের কাছে গিয়ে স্থানীয় লোকদের জিজ্ঞাসা করলেই তারা বলে দেবে কোন পথে যেতে হবে। ঢাকা চট্টগ্রাম রোডে নেমে পূর্বদিকে গ্রামের রাস্তা ধরে দশ মিনিট হাঁটলে পথে রেললাইন পরবে, রেললাইন পার হয়ে আরো দশ মিনিট হাঁটলে ঝিরি পাবেন। ইচ্ছে করলে ঢাকা চট্টগ্রাম রোড থেকে ঝিরি পর্যন্ত আপনি সি.এন.জি নিয়ে (৭০-৮০টাকা লাগবে) যেতে পারবেন। ঐখান থেকে আপনাকে খৈয়াছড়া ঝর্ণার মূল ট্র্যাকিং শুরু করতে হবে। প্রয়োজন হলে সেখান থেকে গাইডও নিয়ে নিতে পারেন। ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তা একটিই, আর পথে আরো অনেক অ্যাডভেঞ্চারপিয়াসীর দেখা পাবেন, কাজেই পথ হারানোর ভয় তেমন একটা নেই বললেই চলে। এছাড়া সীতাকুন্ড বা মিরেরসরাই নেমে ঐখান থেকে সি.এন.জি নিয়েও আসতে পারেন ঝিরির আগ পর্যন্ত।

জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পাহাড়ি ঝিরিপথ ধরে প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটলে দেখা পাবেন ঝর্ণার। হাতে সময় নিয়ে যাওয়া ভালো, ঝর্ণা দেখে ফিরতে ফিরতে বেশ সময় লাগবে। খাবার সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারেন, তবে ঝর্ণায় যাওয়ার পথেই অন্তত তিনটি জায়গায় দেখা মিলবে স্থানীয় হোটেলের, চাইলে সেখান থেকেও খেয়ে নিতে পারেন। খাবারের দাম তুলনামূলক সস্তাই হবে।

যদি ২ দিন সময় নিয়ে যান তবে সাথে ঘুরে আসতে পারেন নাপিত্তাছড়ার ৩টি ঝর্ণা, সীতাকুন্ড ইকো পার্কে সুপ্তধারা ঝর্ণা, সহস্রধারা ঝর্ণা, মহামায়া লেক ও ঝর্ণা, মহুরী প্রজেক্ট ও উইন্ডমিল। এছাড়াও আরো সময় থাকলে যেতে পারেন চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ওপরে যেখান থেকে বঙ্গোপসাগর দেখা যায়।

থাকার জায়গাঃ বড়তাকিয়া বাজারে থাকার কোন হোটেল নেই। কিন্তু আপনি চাইলে চেয়ারম্যানের বাংলোয় উঠতে পারেন। এছাড়াও স্থানীয় লোকদের সাথে ব্যবস্থা করে তাদের বাড়ীতে থাকতে পারবেন। মিরেরসরাই বা সীতাকুন্ডে আপনি থাকার জন্য বেশ কিছু স্থানীয় হোটেল পাবেন। মিরেরসরাই বা সীতাকুন্ডে খাওয়ার জন্য অনেক রেস্টুরেন্টও পাবেন।

কি কি নিবেনঃ যেহেতু নিয়মিত টুরিষ্ট যাচ্ছে তাই অনেক কিছুই সেখানে পাওয়া যাবে। তবে ভ্রমনের সুবিধার জন্য কিছু জিনিস সাথে রাখলে ভাল হবে:

১) জিনিসপত্র রাখার জন্য ব্যাগ
২) পড়ার জন্য এবং গোসলের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড়
৩) তোয়ালে
৪) রেইন কোর্ট/ছাতা
৫) ভাল সোলসহ সেন্ডেল (নন-স্লিপি)
৬) শুকনা খাবারঃ বিস্কিট, কেক, চকলেট, ফল ইত্যাদি
৭) প্রয়োজনীয় সংখ্যক পানির বোতল
৮) ছবি তোলার জন্য মোবাইল+ক্যামেরা+ব্যাটারী+চার্জার
৯) জোঁক ছাড়ানোর জন্য গুল/লবন
১০) দড়ি
১১) প্রয়োজনীয় ঔষধ
১২) ভেজা কাপড় আনার জন্য পলিথিন ব্যাগ।

১৩) ক্যাপ/সানগ্লাস

১৪) অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস

সতর্কতাঃ মনে রাখবেন অব্যবহৃত খাবার, চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের ফিল্টার, পানির বোতলসহ অন্যান্য আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলবেন না। এই গুলি সাথে করে নিয়ে আসবেন এবং বাইরে এসে কোথাও ফেলবেন। জোঁক ছাড়ানোর জন্য সাথে লবন বা গুল রাখবেন। জোঁক কামড়ালে হাত দিয়ে টেনে ছাড়াতে যাবেন না, লবণ/গুল ছিটিয়ে দিলেই কাজ হবে।

ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তা বেশ দুর্গম এবং পাথরের যায়গা পিচ্ছিল থাকতে পারে। তাই সতর্ক হয়ে পথ চলবেন। মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ওই দুর্গম রাস্তা পাড়ি দিয়ে ফিরে আসা অনেক কঠিন হবে। একেবারে ওপরের ধাপগুলো খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে তাই সেই ক্ষেত্রে খুব সতর্ক হয়ে চলতে হবে। পাহাড়ে চড়ার অভিজ্ঞতা না থাকলে ওপরে ওঠার চেষ্টা না করাই ভালো।

বি/এস/এস এম