২৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার ০৯ ডিসেম্বর ২০১৬ , ২:০১ পূর্বাহ্ণ

গৌরবময় মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন ঐতিহাসিক বাঘা শাহী মসজিদ


গো নিউজ২৪ | ইসলাম আপডেট: ১৬ নভেম্বর ২০১৫ সোমবার
গৌরবময় মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন ঐতিহাসিক বাঘা শাহী মসজিদ

 

রাজশাহীর বাঘা মুসলিম স্থাপত্যের প্রাচীন নিদর্শন সমৃদ্ধ দর্শনীয় স্থান। রাজশাহী জেলা সদর হতে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বাঘা উপজেলায় অবস্থিত গৌরবময় মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন ঐতিহাসিক বাঘা শাহী মসজিদ। ১৫২৩ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন সুলতান নাসিরউদ্দীন নসরাত শাহ। প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো মসজিদ ৫০ টাকার নোটে ও জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত শাহী মসজিদ শোভা পাচ্ছে। সুবিশাল দীঘি, মহিলাদের প্রাচীন আন্দরমহল পুকুরের ধ্বংসস্তূপ, হযরত আবদুল হামিদ দানিশ মান্দ ও তদ্বীয় হযরত মুয়াজ্জেম দানিশ মান্দ শাহদৌলা ৫ জন সঙ্গীর মাজার ঐতিহাসিক ভ্রমণপ্রিয় ধর্মানুরাগী মানুষের জন্য এক আকর্ষণীয় স্থান। পদ্মার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক স্থাপত্য কীর্তির প্রাচীন নিদর্শনটি দেশের অন্যান্য পর্যটন শিল্পের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর থেকে রাজনৈতিক দলের প্রধানসহ এমপি, মন্ত্রী, বাঘাকে পর্যটন কেন্দ্রে হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিলেও তার কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। পর্যটন শিল্পের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে শাহী মসজিদ। ব্যিখাত ও বহুল প্রচারিত শাহী মসজিদ এককালে এতদঞ্চলে ইসলাম প্রচারে নিবেদিত এক সাধকের প্রতি বাংলার সুলতানি আমলের অন্যতম সুযোগ্য শাসকের স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধার নিদর্শন। যা বর্তমানে ৫০ টাকার নোটে ও ১০ টাকার ডাকটিকিটে শোভা পাচ্ছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দলের এমপি মন্ত্রীর শত আশ্বাসের পরও রাজশাহীর বাঘা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। ইতিহাস: মসজিদটি ১৫২৩-১৫২৪ সালে (৯৩০ হিজরি) হুসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন শাহের পুত্র সুলতান নসরাত শাহ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় এই মসজিদের সংস্কার করা হয় এবং মসজিদের গম্বুজগুলো ভেঙ্গে গেলে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদে নতুন করে ছাদ দেয়া হয় ১৮৯৭ সালে। স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য: মসজিদটি ২৫৬ বিঘা জমির ওপর অবস্থিত। সমভুমি থেকে থেকে ৮-১০ ফুট উঁচু করে মসজিদের আঙিনা তৈরি করা হয়েছে। উত্তর পাশের ফটকের ওপরের স্তম্ভ ও কারুকাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। মসজিদটিতে ১০টি গম্বুজ আছে । আর ভেতরে রয়েছে ৬টি স্তম্ভ। মসজিদটিতে ৪টি মেহরাব রয়েছে যা অত্যন্ত কারুকার্য খচিত। দৈর্ঘ্য ৭৫ ফুট প্রস্থ ৪২ ফুট, উচ্চতা ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। দেয়াল চওড়া ৮ ফুট গম্বুজের ব্যাস ৪২ ফুট, উচ্চতা ১২ ফুট। চৌচালা গম্বুজের ব্যাস ২০ ফুট উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট। মাঝখানের দরজার ওপর ফার্সি ভাষায় লেখা একটি শিলালিপি রয়েছে। মসজিদটির গাঁথুনি চুন-সুরকি দিয়ে। ভেতরে এবং বাইরের দেয়ালে মেহরাব ও স্তম্ভ রয়েছে। বাঘা মসজিদের দৈর্ঘ্য ২২.৯২ মিটার, প্রস্থ ১২.১৮ মিটার এবং উচ্চতা ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। এর দেয়াল ২.২২ মিটার পুরু। মসজিদটিতে সর্বমোট ১০টি গম্বুজ, ৪টি মিনার (যার শীর্ষদেশ গম্বুজাকৃতির) এবং ৫টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। এই মসজিদটি চারদিক হতে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এবং প্রাচীরের দু’দিকে দু’টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। মসজিদের ভিতরে-বাইরে সবর্ত্রই টেরাকোটার নকশা বর্তমান। মসজিদের পাশে অবস্থিত বিশাল দিঘীও একটি দর্শনীয় স্থান। এছাড়া বাঘা মসজিদের পাশেই রয়েছে একটি মাজার শরীফ। বিবরণ: বাঘা মসজিদটির গাঁথুনি চুন এবং সুরকি দিয়ে। মসজিদের ভেতরে এবং বাইরের দেয়ালে সুন্দর মেহরাব ও স্তম্ভ রয়েছে। এছাড়া আছে পোড়ামাটির অসংখ্য কারুকাজ যার ভেতরে রয়েছে আমগাছ, শাপলা ফুল, লতাপাতাসহ ফার্সি খোদাই শিল্পে ব্যবহৃত হাজার রকম কারুকাজ। এছাড়া মসজিদ প্রাঙ্গণের উত্তর পাশেই রয়েছে হজরত শাহদৌলা ও তার পাঁচ সঙ্গীর মাজার। বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহর পুত্র নাসিরউদ্দীন নসরত শাহ জনকল্যাণার্থে মসজিদের সামনেই একটি দিঘী খনন করেন। শাহী মসজিদ সংলগ্ন এ দিঘিটি ৫২ বিঘা জমির ওপর রয়েছে। এই দিঘির চারপাশে রয়েছে সারিবদ্ধ নারিকেল গাছ। প্রতিবছর শীতের সময় এ দিঘিতে অসংখ্য অতিথি পাখির কলতানে এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। বর্তমানে দিঘিটির চারটি বাঁধানো পাড় নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এ মসজিদ সংলগ্ন জহর খাকী পীরের মাজার রয়েছে। মূল মাজারের উত্তর পাশে রয়েছে তার কবর। এ ছাড়া মসজিদ সংলগ্ন মাটির নিচ থেকে মহল পুকুর আবিষ্কৃত হয়। ১৯৯৭ সালে মাজারের পশ্চিম পাশে খনন কাজের ফলে ৩০ ফুট বাই ২০ ফুট আয়তনের একটি বাঁধানো মহল পুকুরের সন্ধান মেলেছে। এই পুকুরটি একটি সুড়ঙ্গপথ দিয়ে অন্দরমহলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তিন দিক থেকে বাঁধানো সিঁড়ির ভেতরে নেমে গেছে। মসজিদের ভেতরে ও বাইরে রয়েছে প্রচুর পোড়ামাটির ফলক। মসজিদের ভেতরে উত্তর-পশ্চিম কোণে একটু উঁচুতে নির্মিত একটি বিশেষ নামাজের কক্ষ আছে। এ মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় প্রতিবছর ঈদুল ফিতরের দিন থেকে ৩ দিন পর্যন্ত `বাঘার মেলা`র আয়োজন করা হয়। এ মেলাটি ৫০০ বছরের ঐতিহ্য।

.

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া