চোখ জুড়ানো “হামহাম জলপ্রপাত”


পর্যটন ডেস্ক | আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০১৫ বৃহস্পতিবার, ০৩:১৭  পিএম
চোখ জুড়ানো “হামহাম জলপ্রপাত”

প্রায় ১৫০ ফুট উপর হতে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানি আছড়ে পড়ছে বড় বড় পাথরের গায়ে। সেই পানি থেকে সৃষ্ট জলকনা তৈরি করছে কুয়াশার আবরন। চোখ জুড়ানো এই দৃশ্য দেখতে পাবেন মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত হামহাম জলপ্রপাত ঘুরতে গেলে।

অবস্থানঃ সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৩৮ কিঃমিঃ পূর্ব-দক্ষিণে রাজকান্দি রিজার্ভ ফরেস্টের কুরমা বনবিটের গহীন অরণ্যঘেরা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত এই জলপ্রপাতটি। স্থানীয় বাসিন্দারা একে হামহাম ঝর্না বা অনেকে হাম্মাম ঝর্না বলে ডাকে। এটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি অবস্থিত।

বিবরনঃ নয়নাভিরাম হামহাম জলপ্রপাত একনজর দেখার জন্য দিনে দিনে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকদের আগমনে মুখরিত হয়ে উঠছে জলপ্রপাত এলাকা। দীর্ঘ পাহাড়ের আঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু গহীন অরন্যের পথ বেয়ে এই জলপ্রপাত দেখতে প্রতিদিন আগমন ঘটছে বহু পর্যটকের।

যাওয়ার পথের দু পাশের বনের দৃশ্য যে কোন পর্যটককে মুগ্ধ করতে সক্ষম। বন, পাহাড়, ঝিরিপথ দিয়ে যাওয়ার পথে দেখা মিলবে নানান ধরনের গাছগাছালি, বিভিন্ন পশু ও পাখি। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান কে পাশ কাটিয়ে গাড়ী চলে যাবে চা বাগানের রাস্তা ধরে। পথ পরবে জাহানারাপুর চা বাগান, মাধবপুর চা বাগান, শ্রী গোবিন্দপুর চা বাগান, কুড়মা চা বগান। রাস্তা কখনো পিচ ঢালা, কখনো শুধু ইট বিছানো, কখনো বা মাটির। ছোট ছোট পাহাড়ের গায়ে চা বাগান ছাড়াও দেখা যাবে সুপারি বাগান ও আনারসের জুম চাষ।

max-width: 100%; height: auto;

একে একে কুড়মা বাজার, চাম্পারায় চা বাগানে পার হয়ে আসতে হবে কলাবন পাড়া। চা শ্রমিকদের ছোট্ট গ্রাম কলাবন। কলাবন গ্রামের শেষপ্রান্ত থেকে রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের এলাকা শুরু। এই কলাবন থেকেই বনের মধ্যেই ট্র্যাকিং করতে হবে প্রায় আড়াই ঘন্টা। কলাবন পাড়া থেকে গাইড নিয়ে নিতে হবে। পাথুরে পাহাড়ের ঝিরি পথে হেঁটে যেতে যেতে সুমধুর পাখির কলরব মনকে ভাললাগার অনুভূতিতে ভরিয়ে দেবে। এভাবেই হাটতে হাটতে একসময় পৌঁছে যাবেন আপনার কাঙ্খিত হামহাম জলপ্রপাতের খুব কাছাকাছি। কিছু দূর এগুলেই শুনতে পাবেন হামহাম জলপ্রপাতের শব্দ।

কলাবন পাড়া থেকে হামহাম যাওয়ার জন্য বনের ভেতর দুটি পথ আছে। বনের শুরুতেই হাতের ডানে ও বামে পাশাপাশি পথ দুটির অবস্থান। একটা দিয়ে যাবেন এবং আরেকটা দিয়ে আসবেন, তাহলে দুটি পথই দেখা হয়ে যাবে। ডানের পথ দিয়ে ঢুকে বাম দিয়ে বের হবেন এটাই ভালো, কারন ডানের পথটা দীর্ঘ এবং অনেক গুলো উঁচু টিলা ডিংগাতে হয়, যা ফেরার পথে পরলে খুব কষ্ট হবে, তাই প্রথমে কষ্ট হলেও আসার সময় একটু আরাম করে আসবেন, ফেরার পথ কম না তবে সমতল বেশি, টিলা কম পেরোতে হয়।

কীভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে সরাসরি সড়ক ও রেল পথে মৌলভীবাজার যাওয়া যায়। ঢাকার সায়েদাবাদ, কমলাপুর, আরামবাগ থেকে হানিফ, শ্যামলী, মামুন, ইউনিক ইত্যাদি পরিবহনে অথবা কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে সিলেটগামী ট্রেনে করে শ্রিমঙ্গল এসে নামতে হবে। শ্রিমঙ্গল নেমে হোটেল নিয়ে নিলে ভাল করবেন। যদি রাতের গাড়ীতে আসেন তবে শ্রিমঙ্গল থেকে নাস্তা করে ৯ টার মধ্যে রওনা দিবেন। আর যদি দিনের গাড়ীতে রওনা হন তবে রাতে হোটেলে থেকে ভোরে হামহাম চলে যাবেন এবং পথে কুড়মা বাজারে নাস্তা সেরে নিবেন। শ্রিমঙ্গলে হোটেলের আশেপাশে অনেক সিন.এন.জি পাবেন, আপনাকে শ্রিমঙ্গল থেকে যেতে হবে কলাবন পাড়া, ওদের হামহাম যাব বললেই হবে। আপ ডাউন ১৫০০ টাকার মতো নিবে। কলাবন পাড়া পৌছে ওখানে চা শ্রমিক রাই গাইড হিসেবে যায়, ২০০/৩০০ টাকা নিবে গাউড। গহিন এবং পাহারি বনের ভেতরে প্রায় আড়াই ঘন্টা হাটতে হবে, বনের প্রায় সাড়ে ৭ কিলো ভেতরে হাম হাম। বর্ষা কালে অনেক পানি থাকলেও শীত কালে পানি কম থাকবে। উচু পাহারে উঠতে হবে, তাই সাবধান থাকতে হবে। সাথে অবশ্যই লাঠি নিবেন ওখান থেকে, ৫ টাকা নেবে। লবন বা গুল নিবেন জোকের জন্যে। আসা যাওয়া নিয়ে প্রায় ৫ ঘন্টা হাটতে হবে। শ্রিমঙ্গল ফিরে এসে রাতে হোটেল থেকে যেতে পারেন অথবা ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে রাতেই ঢাকা রওনা হতে পারেন।

কোথায় থাকবেনঃ শ্রীমঙ্গলে বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। যেমন- হোটেল প্লাজা - ০৮৬২৬-৭১৫২৫, টি রিসোর্ট -০৮৬২৬-৭১২০৭, বি.টি.আর.আই - ০৮৬২৬-৭১২২৫ ইত্যাদি। এছাড়াও কমদামি কিছু হোটেলও আছে যেখানে থাকতে পারেন, খরচ পরবে ৫০০/৮০০ টাকা। তবে হামহাম ঝর্না এলাকার আশেপাশে থাকার মতো তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই। তবে নিজেকে যদি মানিয়ে নিতে পারেন তাহলে তৈলংবাড়ী কিংবা কলাবন পাড়াতে আদিবাসীদের ঘরে থাকতে পারেন।

সতর্কতাঃ মনে রাখবেন অব্যবহৃত খাবার, চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের ফিল্টার, পানির বোতলসহ অন্যান্য আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলবেন না। এই গুলি সাথে করে নিয়ে আসবেন এবং বাইরে এসে কোথাও ফেলবেন। জোঁক ছাড়ানোর জন্য সাথে লবন বা গুল রাখবেন। জোঁক কামড়ালে হাত দিয়ে টেনে ছাড়াতে যাবেন না, লবণ/গুল ছিটিয়ে দিলেই কাজ হবে।

ঝর্ণায় যাওয়ার পথে বেশ কিছু উচু নিচু পাহাড়, বন, পিচ্ছিল এলাকা পার হতে হবে তাই সতর্ক হয়ে পথ চলবেন। মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ওই দুর্গম রাস্তা পাড়ি দিয়ে ফিরে আসা অনেক কঠিন হবে।

 

গো নিউজ২৪/বিএস/এসএম