“তৈদুছড়া” বাংলাদেশের নয়নাভিরাম ঝর্ণা জোড়া


পর্যটন ডেস্ক | আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০১৫ মঙ্গলবার, ০১:২৪  পিএম
“তৈদুছড়া” বাংলাদেশের নয়নাভিরাম ঝর্ণা জোড়া

বাংলাদেশের যে কয়েকটি নয়নাভিরাম ঝর্ণা রয়েছে তার মধ্যে তৈদুছড়া ১ ও ২ অন্যতম। খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলায় সবুজ পাহাড় আর বুনো জঙ্গলের মাঝে অবস্থিত নয়নাভিরাম ঝর্ণা দুটির নাম তৈদুছড়া ঝর্ণা।

ত্রিপুরা ভাষায় `তৈদু` মানে হল `পানির দরজা` আর ছড়া মানে ঝর্ণা। অসাধারণ সৌন্দর্য আর প্রাকৃতিক বৈচিত্রতা এই ঝর্ণাকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। খাগড়াছড়িতে যে কয়টি দর্শনীয় স্থান রয়েছে তৈদুছড়া তাদের মধ্যে অন্যতম।



বেশ কিছু উচু নিচু পাহাড় ডিঙ্গিয়ে যেতে হয় তৈদুছড়া ঝর্ণায় তাই এখনও পর্যটকদের আগমন অনেক কম। তবে দিনে দিনে পর্যটকদের আগমন বাড়ছে। ঠিকমতো প্রচার করা গেলে এটি হতে পারে পাহাড়ের অন্যতম পর্যটন স্পটও।

ত্রিপুরা ভাষায় ‘তৈ’ অর্থ পানি আর ‘দু’ অর্থ ধারা। তৈদু পাড়ার স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে জানা যায়, গ্রামের লোকজন পাহাড়ে জুম চাষ করতে গিয়ে এ ঝর্ণা আবিস্কার করে। তারা ঝর্ণার নাম দেয় তৈদু ছড়া। সরেজমিনে ঝর্ণা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, তৈদুছড়া ঝর্ণা – ১ এ পৌঁছার পূর্বে বেশ কিছু জায়গাজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন প্রাণীর আকৃতির বড় বড় পাথর। কিছু পাথর দেখলে মনে হয় একপাল হাতি বাচ্চা নিয়ে ছড়ার পানিতে শুয়ে রয়েছে। পাশেই মনোমুগ্ধকর জলপ্রপাত। পানির  নিচে প্রাকৃতিকভাবে পাথর দিয়ে ঢালাই করা। পরিস্কার পানির স্রোতে গোসল করার লোভ সামলানো কারো পক্ষে সম্ভব না।



তৈদু ঝর্ণাতে পড়ন্ত পানির মাঝখানে বসার জন্য রয়েছে বেশ কিছু স্তর যা বাংলাদেশের অন্য ঝর্ণা গুলোতে দেখা যায়না। তৈদু ঝর্ণার পাশের জলপ্রপাত গুলো আরো বেশি আকৃষ্ট করে। যারা বনে, পাহাড়ে ট্র্যাকিং করতে ভালবাসেন তাদের জন্য এটি একটি আদর্শ ঝর্ণা। প্রথম ঝর্ণা থেকে দ্বিতীয় ঝর্ণায় যেতে সময় লাগবে প্রায় ১ ঘন্টা এবং এই পথটা কিছুটা বিপদজনক কারন কিছু জায়গায় খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে। তবে ঝর্ণা দেখার পর আপনার সকল কষ্ট দূর হয়ে যাবে এবং এর রূপ দেখে আপনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন।

কি ভাবে যাবেন?

ঢাকা টু খাগড়াছড়িঃ

বাসে করে ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি যেতে হবে। নন-এসি বাস ৫২০ টাকা (শ্যামলী, শান্তি পরিবহন, ঈগল, ইকোনো, এস আলম ইত্যাদি), এসি বাস ৮০০ টাকা (একমাত্র সেন্টমার্টিন পরিবহন)। ঢাকা থেকে বাস ছাড়ে সকালে ও রাতে (১১.০০ টায়) এবং খাগড়াছড়ি থেকে বাস ছাড়ে সকালে ও রাতে (৯.০০ টায়)। ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি যেতে সময় লাগবে রাতে ৭/৮ ঘন্টা এবং দিনে ৮/১০ ঘন্টা।

খাগড়াছড়ি টু তৈদুছড়াঃ

খাগড়াছড়ি থেকে তৈদুছড়া ২ ভাবে যাওয়া যায়। একটি দীঘিনালা হয়ে এবং অন্যটি সীমানা পাড়া দিয়ে। সীমানা পাড়া দিয়ে গেলে সময় অনেক বেঁচে যাবে কারন ট্র্যাকিং অনেক কম করতে হবে।

সীমানা পাড়া হয়ে গেলেঃ খাগড়াছড়ি শহড়ের শাপলা মোড় থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে নয় মাইল নামক স্থানে নামতে হবে। দীঘিনালাগামী যে কোন বাসে করে অথবা সিএনজি নিয়ে নয় মাইল যাওয়া যাবে। সেখান থেকে ৩/৪ কি.মি. হেটে সীমানা পাড়া যেতে হবে। এছাড়াও যে কেউ চাইলে শাপলা মোড় থেকে চাঁদের গাড়ী সীমানা পাড়া পর্যন্ত আপ-ডাউন ভাড়া করে নিতে পারেন। গাড়ী আপ-ডাউন ভাড়া পড়বে প্রায় ১৮০০/২০০০ টাকা। সকাল ৭ টায় রওনা হলে বিকাল ৪ টার মধ্যে খাগড়াছড়ি ফিরে আসতে পারবেন। সীমানা পাড়া থেকে গাইড ঠিক করে তাকে নিয়ে তৈদুছড়ার পথে হাটতে হবে। প্রায় ১ ঘন্টা ৪৫ মিনিট হাটার পর প্রথমে পড়বে তৈদুছড়া ঝর্ণা – ২ (উপরের ঝর্ণা)এবং সেখান থেকে ১ ঘন্টার পথ তৈদুছড়া ঝর্ণা – ১ (নিচেরঝর্ণা)।

দীঘিনালা হয়ে গেলেঃ বাসে করে খাগড়াছড়ি শহড়ের শাপলা মোড় থেকে ২৪ কি.মি. দূরে দীঘিনালা বাস স্টপেজে যেতে হবে। সেখান থেকে দীঘিনালা বাজার গিয়ে গাইড ঠিক করে নিতে হবে। তারপর জামতলি নামক জায়গা থেকে ট্র্যাকিং শুরু করতে হবে। ঝিরিপথ, উচু নিচু পাহাড় পার হয়ে প্রায় ৩ ঘন্টা হাটার পর তৈদুছড়া ঝর্ণা – ১ (নিচেরঝর্ণা) পড়বে এবং সেখান থেকে ১ ঘন্টার পথ তৈদুছড়া ঝর্ণা – ২ (উপরের ঝর্ণা)। গাইড খরচ পড়বে ৩০০/৫০০ টাকা। দীঘিনালা হয়ে গেলে যেহেতু সময় বেশী লাগবে তাই একটু তাড়াতাড়ি বের হতে হবে।

খাগড়াছড়িতে কোথায় থাকবেনঃ

পর্যটন মোটেলঃ যোগাযোগ ০৩৭১-৬২০৮৪, ০৩৭১-৬২০৮৫, ০১৫৫৬৫৬৪৩৭৫, এসি রুম ২১০০ টাকা এবং নন-এসি ১৩০০ টাকা প্রতি রাত। এটি শহড়ে ঢুকার ২ কি.মি. আগে চেঙ্গী নদীর পাশে অবস্থিত।

হোটেল ইকোছড়ি ইনঃ যোগাযোগ ০৩৭১-৬১৬২৫, ০৩৭১-৬১৬২৬, ০১৮২৮-৮৭৪০১৪। রুম ভাড়া ১০০০-২৫০০ টাকা প্রতি রাত।

শৈল সুবর্ণঃ যোগাযোগ ০৩৭১-৬১৪৩৬। ভাড়া ৬০০-১০০০ টাকা প্রতি রাত।

এছাড়াও শাপলা মোড়ে অবস্থিত অন্যান্য হোটেলে ৩০০-৭০০ টাকাতে থাকা যাবে।  

উল্লেখযোগ্য হোটেলেঃ হোটেল জিরান ০৩৭১-৬১০৭১, ফোর স্টার ০৩৭১-৬২২৪০, থ্রি স্টার ০৩৭১-৬২০৫৭, লবিয়ত ০৩৭১-৬১২২০, চেঙ্গী ০৩৭১-৬১২৫৪, উপহার ০৩৭১-৬১৯৮০, রাজু বোর্ডিং ০৩৭১-৬১১৬১, চৌধুরী বোর্ডিং ০৩৭১-৬১১৭৬, ভাই ভাই বোর্ডিং ০৩৭১-৬১৪৬১ ইত্যাদি।

সতর্কতাঃ

তৈদুছড়া ঝর্ণা – ১ (নিচের ঝর্ণা, ছবিতে প্রথম ঝর্ণা)এর সামনের পানির অংশ অনেক গভীর। তাই যারা সাতার জানেন না তারা অবশ্যই পানির গভীরতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে পানিতে নামবেন। নতুবা বিপদ হতে পারে। তৈদুছড়া ঝর্ণা – ২ তে এই সমস্যা নেই, ঐ যায়গার পানি অগভীর। জোক থেকে বাচার জন্য সাথে লবন বা গুল রাখবেন কারন নিশ্চিত ভাবেই আপনি তাদের দেখা পাবেন। দুপুরে খাবার জন্য শুকনা খাবার, চকলেট জাতীয় খাবার রাখবেন। সাথে পানি নিতে ভুলবেন না। অব্যবহৃত খাবার, পানির বোতল, প্লাস্টিক ইত্যাদি ফেলে আসবেন না, সাথে নিয়ে আসবেন।

বি/এস