চলুন ঘুরে আসি সুন্দরবন


পর্যটন ডেস্ক | আপডেট: ২১ নভেম্বর ২০১৫ শনিবার, ০৫:১৬  পিএম
চলুন ঘুরে আসি সুন্দরবন

ডাঙায় বাঘ আর জলে কুমিরের রাজত্ব। পর্যটকদের কাছে টান টান উত্তেজনার উৎস। এসবের প্রাপ্তির একটাই স্থান-সুন্দরবন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনও এই সুন্দরবন। সুন্দরবনে দেখার আছে অনেক কিছু। 

সুন্দরবনের মূল আকর্ষণ-অবশ্যই বাঘ! তবে অনেকেই ভাবেন, দেখা দেওয়ার জন্য বাঘ মামা পোজ দিয়ে বসে থাকবেন। আসল কথা হলো-মানুষ যেমন বাঘকে এড়িয়ে চলে, বাঘও মানুষ এড়িয়ে চলে। বাংলাদেশ-ভারত মিলে বর্তমানে প্রায় ৪০০টি বাঘ (২০০৯ সালের তথ্য) রয়েছে প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে। বাঘের দেখা পাওয়া যদিও ভাগ্যের ব্যাপার, তবে হরিণ আর বানর দেখতে পাবেন প্রচুর। পানির আশপাশে অবশ্যই পাবেন কুমির। আর নানা রকম পাখি তো রয়েছেই।

তিন-চার দিনের ভ্রমণ

সুন্দরবনে বেশ সহজেই ঘুরতে যাওয়া যায়। প্রচলিত বা অপ্রচলিত বেশ কিছু রুট রয়েছে সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে ঘোরার। তবে সুন্দরবন ভালো করে দেখতে চাইলে যেতে হবে আরো গভীরে। তাই তিন-চার দিনের ট্যুর প্ল্যান করাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। আর এই দায়িত্বটা ট্যুর অপারেটরদের ওপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো। সুন্দরবনের গহিনে ঢোকার অনুমতি, খাবার, পানি-সব কিছুই করবেন ট্যুর অপারেটররা। কারণ আপনার থাকা-খাওয়া সবই করতে হবে ছোট ট্যুরিস্ট জাহাজে। বেশির ভাগ ট্রিপই হয় সুন্দরবনের নির্জন সমুদ্রতীর কটকা পর্যন্ত। আসা আর যাওয়ার পথে বাঘ দেখার সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও এর পুরোটাই নির্ভর করে ভাগ্যের ওপর। তবে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, সাপ দেখা প্রায় নিশ্চিত। আরো নিশ্চিতভাবে দেখা যাবে চিত্রা হরিণ ও বন্য শূকর। তিন-চার দিনের ট্রিপের জন্য সেরা ট্যুর অপারেটর ‘গাইড ট্যুরস’ (৯৮৮৬৯৮৩, ৯৮৬২২০৫) ও ‘বেঙ্গল ট্যুরস’ (০১৭৭৫১০৫৩৫১)। ‘ম্যানগ্রোভ ট্যুরস’ও (০১৭১২৬৩৬৪৬৫) বেশ ভালো যদি আপনি বন্য প্রাণীর খোঁজেই সেখানে যেতে চান, কারণ এরই মধ্যে তারা বেশ কয়েকটি পাখি দেখার ট্যুরও পরিচালনা করেছে সুন্দরবনে। এ ধরনের তিন-চার দিনের ভ্রমণে খরচ হতে পারে জনপ্রতি ১২ থেকে ২০ হাজার টাকা। এই খরচও আবার দলের সংখ্যা এবং দর্শনীয় স্থানের ওপর নির্ভর করে থাকে। তিন-চার দিনের ভ্রমণে সাধারণত যেসব স্পটে যেতে পারেন।

কটকা

সুন্দরবনের অন্যতম সুন্দর এলাকা এই কটকা। দলবেঁধে চলা হরিণের পাল দেখার সেরা জায়গা এটি। আর যেখানেই খাবার, সেখানেই খাদক-অর্থাৎ হরিণ শিকারের আশায় বসে থাকে বাঘ। তবে ভাগ্য প্রসন্ন হলে তবেই দেখা মিলবে বাঘের। খুলনা শহর থেকে ১৫০ কিলোমিটার এবং মংলা থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত কটকা। এখানে যেতে হলে ট্যুর অপারেটর ধরেই যেতে হবে।

কচিখালী

সমুদ্র যাদের টানে, তাদের জন্য সেরা গন্তব্য কচিখালী। কটকা থেকে ১৪ কিলোমিটার পূর্ব দিকে এই সমুদ্রতীরে হেঁটে বা নৌযানে করে যাওয়া যেতে পারে। দূষণমুক্ত নির্জন সমুদ্রতটই এখানকার মূল আকর্ষণ। সেই সঙ্গে রাতের বেলায় জোনাকি, ছায়াপথ আর পানিতে ফ্লুরোসেন্ট প্ল্যাংকটন মিলে আলোছায়ার অদ্ভুত খেলা শুরু করে। আর সে সময়ে নৌকায় করে ঘোরার অনুভূতিটাই অন্য রকম। হরিণ, কুমির, বানর আর বাঘ এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। 

নীলকমল

সুন্দরবনের দক্ষিণাঞ্চলের এই জায়গাকে অনেকে হিরণ পয়েন্টও বলে থাকেন। মংলা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে এই স্পট। এখানকার মূল আকর্ষণ রাজগোখরা, ভোঁদড়, হরিণ আর বাঘ।  

মান্দারবাড়িয়া

মান্দারবাড়িয়া সুন্দরবনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। দুবলার চর বা নীলকমল থেকে খুব সহজেই নৌপথে এখানে যাওয়া যায়। বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হওয়ার সুবাদে নির্জনতা এখানকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এখানে সামুদ্রিক কাছিম শীতে ডিম পেড়ে যায়। ইরাবতী ডলফিন, বোতলনাক ডলফিন, শুশুক ফাড়াও, রাজগোখরা, রাজকাঁকড়াসহ অন্যান্য কাঁকড়া।  

দুবলার

চর কটকা থেকে ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে দুবলার চর নামের এই জেলেদ্বীপের অবস্থান। নানা প্রজাতির মাছ আর কাঁকড়া পাওয়া যায় এখানে। নভেম্বর মাসের পূর্ণিমায় রাশমেলা হয় এই দ্বীপেই। দ্বীপে বাস করা জেলেদের কার্যক্রম দেখতেও অনেকে এই দ্বীপে যান।  

এক দিনের ভ্রমণ

সময় আর অর্থের সংকট থাকলে সুন্দরবনে এক দিনের ডে ট্রিপও দেওয়া সম্ভব। সুন্দরবনের পুরো মজা তাতে না পেলেও দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে পারেন।   করমজল বাগেরহাটের মংলায় প্রচুর ছোট ইঞ্জিন নৌকা রয়েছে, যেগুলো নিয়মিত করমজল যায়।

করমজল

সুন্দরবনে ঢোকার অন্যতম পথ। মংলা সমুদ্রবন্দর থেকে মাত্র ৪৫ মিনিটের নৌপথ। যাদের হাতে সময় নেই, তাদের জন্য বেশ ভালো স্পট করমজল, কারণ আধা বেলা ঘুরেই গোটা সুন্দরবন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় এখান থেকে। বেড়াতে খরচ হবে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা। সুন্দরবন যেহেতু পুরোটাই ম্যানগ্রোভ, করমজলও এর ব্যতিক্রম নয়। করমজল যাওয়ার পথে দেখা যাবে শুশুকের ডিগবাজি। কাঠের ট্রেইল ধরে পুরো এলাকা ঘুরে বেড়ানো এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। এখানে লোনা পানির কুমির ও হরিণ প্রজননকেন্দ্রও রয়েছে। খুলনা থেকে এক দিনে ঘুরে খুলনায় ফেরত যাওয়া সম্ভব বলে এখানে পর্যটকরা বেশি আসে।  

হাড়বেড়িয়া

খুব ভোরে যদি বেরিয়ে পড়তে পারেন মংলা থেকে রূপসা নদী ধরে, তবে হাড়বেড়িয়া ফরেস্ট স্টেশন পর্যন্ত ঘুরে আসতে পারবেন দিনে দিনেই। খরচ হবে সর্বোচ্চ ছয় হাজার টাকা। হরিণ আর বানরের দল দেখা যাবে নিশ্চিত। ভাগ্য প্রসন্ন থাকলে দেখা মিলতে পারে মায়া হরিণেরও। আর নানা প্রজাতির পাখি তো রয়েছেই। এ ছাড়া সম্প্রতি শুশুক, ইরাবতী ডলফিন, কালিকাইট্টা কচ্ছপ, কালামুখ প্যারাপাখি ও ভোঁদড় রক্ষার জন্য তিনটি নতুন অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে।  

ঢাংমারী বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য ও চাঁদপাই বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য

ঢাংমারী খাল থেকে ঘাগরামারী টহল ফাঁড়ি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১২ কিলোমিটার নৌপথ এবং এর আশপাশের জঙ্গলকে এই অভয়ারণ্যের আওতায় আনা হয়েছে। পশুর নদীর খানিকটা অংশ ও করমজল টহল ফাঁড়ির ছিু অংশও এই অভয়ারণ্যের সীমানায় পড়েছে। আর নন্দবালা টহল ফাঁড়ি, চাঁদপাই রেঞ্জ অফিস, আন্ধারমানিক টহল ফাঁড়ির মধ্যবর্তী জায়গা নিয়ে চাঁদপাই বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য। ঢাংমারী ও চাঁদপাই যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো মংলা থেকে মোটরসাইকেল ভাড়া করে সেখানে যাওয়া।  

দুধমুখী বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য

দুধমুখী টহল ফাঁড়ি আর সুপতি রেঞ্জ অফিসের মধ্যবর্তী ভোলা নদী ও বেতমারী নদীর কিছু অংশ নিয়ে দুধমুখী বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য। বাগেরহাটের শরণখোলা থেকে মোটরসাইকেল ভাড়া করেই এই অভয়ারণ্য ঘুরে বেড়ানো যায়।