১০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, শুক্রবার ২৪ নভেম্বর ২০১৭ , ৭:১০ অপরাহ্ণ

একজন মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ


গো নিউজ২৪ | গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০১৭ বৃহস্পতিবার
একজন মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ
বার্ধক্যজনিত কারণে হাটতে পারেন না আয়েশা বেগম

ময়মনসিংহ: ৮০ বছরের বৃদ্ধা আয়েশা বেগম। কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। পক্ষাঘাতগ্রস্থ হওয়ার কারণে হাঁটতেও পারেন না। শরীরে বাসা বেঁধেছে বার্ধক্যজনিত রোগ। 

মঙ্গলবার (১৭ অক্টোবর) অসুস্থ এই আয়েশাকে রাস্তায় ফেলে রেখে যায় তার পালিত মেয়ে হেলেনা। ক্ষুধার তাড়না ও মনের কষ্ট সইতে না পেরে বুধবার (১৮ অক্টোবর) ডুবে মরতে পুকুরে ঝাঁপ দেন বৃদ্ধা আয়েশা। 

খবর পেয়ে প্রতিবেশীরা তাকে উদ্ধার করে। পরে স্থানীয় সাংবাদিক রইছ উদ্দিনের সহযোগিতায় চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেয়া হয় তাকে। কিন্তু সেখানে সেবা-যত্নের কেউ না থাকায় চলে আসেন তিনি। 

বৃহস্পতিবার (১৯ অক্টোবর) সকালে আয়েশার দেখা মেলে গৌরীপুর পৌর শহরের বঙ্গবন্ধু চত্বরে। পরিচিত কাউকে দেখলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠছিলেন আয়েশা। মাঝে মাঝে পথচারী দেখলেই খাবার দেওয়ার জন্য ইশারা দিচ্ছিলেন। কাছে গিয়ে কথা বলতে চাইলে আবারো কেঁদে উঠেন আয়েশা। 

কাঁদতে কাঁদেতে তিনি বলেন, আমার কোমর ও একটি পা অচল থাকায় হাঁটতে পারি না। একা একা প্রকৃতির কাজও সারতে পারি না। কিছুদিন আগে আমি অসুস্থ্য হওয়ায় আমার পালিত মেয়ে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যায়। তাই মরার জন্য পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছিলাম। 

লোকজন হাসপাতালে নিলেও ডাক্তাররা কোনো ওষুধ দেয়নি। অনেকবার খাবার চাওয়ার পর সকালে একটা রুটি খেতে দিয়েছে। তাই হাসপাতাল থেকে চলে আসছি। 

এখন আমি কোথায় যাবো? কী খাবো? কিছুই জানি না। 

তিনি আরো বলেন, পালিত মেয়েটা ছাড়া দুনিয়াতে আমার কেউ নেই। ও আমাকে ফেলে দিছে এখন আমি কোথায় যাবো? কী খাবো? কিছুই জানি না। 

এ বিষয়ে জানতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মুহাম্মদ রবিউল ইসলাম বলেন, চিকিৎসা ও খাবার নিয়ে আয়েশা বেগমের অভিযোগ সত্য নয়। চিকিৎসার জন্য তাকে ভর্তি করা হলেও বৃহস্পতিবার (১৯ অক্টোবর) তিনি কাউকে না জানিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে গেছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পৌর শহরের রিকশা পট্টি মহল্লার বাসিন্দা আয়েশা বেগম কলা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। স্বাধীনতার পর তার স্বামী মারা যায়। 

নিঃসন্তান আয়েশা বেগম হেলেনা নামে একটি মেয়েকে ছোট বেলা থেকে লালন পালন করেন। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সেই মেয়ে বিয়ে করে ঢাকায় চলে যায়। 

আয়েশা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়লে পালিত মেয়ে হেলেনা তাকে (আয়েশা) ঢাকায় নিয়ে নিজের সঙ্গে রাখেন। 

স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার (১৭ অক্টোবর) পালিত মেয়ে হেলেনা আয়েশাকে গৌরীপুর পৌর শহরের রিকশা পট্রির রাস্তায় রেখে চলে যান। পালিত মেয়ে কেন ফেলে রেখে যান তা কেউ বলতে পারেনি। 

দৃষ্টি জুড়ে অসহায়ত্ব

প্রতিবেশিরা ধারণা করছেন, পক্ষাঘাত আর বার্ধক্যজনিত রোগের কারণে পালিত মেয়ে আয়েশাকে ফেলে রেখে গেছেন। পালিত মেয়ের সঙ্গে প্রতিবেশিরা যোগাযোগ করতে পারেননি। 

পৌর শহরের রিকশা পট্টি এলাকার বাসিন্দা নাজমা আক্তার বলেন, বুধবার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে পাড়া-প্রতিবেশিরা বাড়ির পাশে পুকুর পাড়ে চিৎকার শুরু করলে গিয়ে দেখি আয়েশা বেগম পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। পরে আমরা দ্রুত পুকুরে নেমে তাকে উদ্ধার করি। প্রতিবেশিরা টের না পেলে সে নিশ্চিত পানিতে ডুবে মরে যেতো।

বৃহস্পতিবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে সাংবাদিক রইছ উদ্দিন বলেন, আয়েশা বেগমকে কিছুদিনের জন্য স্থানীয় একটি মহিলার তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। আমরা তাকে সহযোগিতা করছি। এই মুহূর্তে তার চলাচলের একটি হুইল চেয়ার, থাকার জন্য একটি বাসস্থান ও খাবার-দাবার এবং দেখভালের জন্য সর্বাক্ষণিক একজন লোক প্রয়োজন। তাই আয়েশা আক্তারের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে তাকে দেশের যেকোনো বৃদ্ধাশ্রমে নেয়ার জন্য প্রশাসনের নিকট দাবি জানাচ্ছি।

গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মর্জিনা আক্তার বলেন, বৃদ্ধা আয়েশা বেগমের দূরাবস্থার বিষয়টি শুনেছি। তিনি বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। আমরা তাকে একটি ঘর তোলে দেয়ার ব্যবস্থা করে দিব এবং তার সাথে কথা বলে অনান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। 

গোনিউজ২৪/পিআর