১০ শ্রাবণ ১৪২৪, বুধবার ২৬ জুলাই ২০১৭ , ৪:৪৩ পূর্বাহ্ণ
আমার কথা

‍‍`​​ সত্য ও ন্যায় :  সমাজ ও জীবনের প্রত্যয় ’


গো নিউজ২৪ আপডেট: ০১ মার্চ ২০১৭ বুধবার
‍‍`​​ সত্য ও ন্যায় :  সমাজ ও জীবনের প্রত্যয় ’

সৈয়দ আবুল হোসেন বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘আমার কথা’। এই বইয়ে তিনি নিজের চিন্তা, কর্মকাণ্ড, মূল্যবোধ, নানা অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখেছেন।

এটি পড়লে তাকে যারা পুরোপুরি চিনেন না তাদের সুবিধা হবে। বইটি’ ধারাবাহিকভাবে ছাপছে গো-নিউজ। বইটির আজকের পর্বে থাকছে - '​​ সত্য ও ন্যায় :  সমাজ ও জীবনের প্রত্যয় ’

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- ‘তুমি জান ক্ষুদ্র যাহা ক্ষুদ্র তাহা নয়,/সত্য যেথা কিছু আছে বিশ্ব সেথায় রয়।” সত্য চিরন্তন। সত্যই জীবন। সত্যই চাওয়া-পাওয়া। সত্যের জন্যই আমাদের সংগ্রাম, আমাদের যুদ্ধ। ক্ষণিকের জন্য মিথ্যা দ্বারা সত্য রাহুগ্রস্ত হলেও সবশেষে সত্যের জয় হয়। তাই বলা হয়- সত্যের আকড়েঁ বাঁধা এ পৃথিবী। ‘সত্যং শিবং সুন্দরম’ অর্থাৎ সত্যই বিধাতা এবং সত্যই সুন্দর। সত্যই জীবনের আলোকবর্তিকা। সত্যের স্পর্শে জীবন হয়ে ওঠে সুন্দর। জীবনের এই চলমান সত্য চিরকালীন এবং চিরব্যাপ্তি। যুগ থেকে যুগান্তরে অন্তহীন এর যাত্রা। 

মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে লড়াই হয়েছে প্রতিনিয়ত। সত্য ও মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়-এর মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়েছে। লড়াই ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে সত্যের জয় হয়েছে। আমরা জানি, সত্য ও মিথ্যা- এই দুই বিপরীত শক্তির মধ্যদিয়ে মানুষকে পথ চলতে হয়। সত্যের শক্তি মানুষকে সৎ, নির্লোভ ও ত্যাগী জীবনের দিকে চালিত করে। মিথ্যার শক্তি মানুষকে নিয়ে যায় লালসা, পরিভোগ ও স্বার্থপরতার পথে। সত্য পথের পথিককে আমরা বলি সৎ এবং সৎ গুণকে বলি সততা। মিথ্যা পথের পথিককে বলি অসৎ এবং অসৎ গুণকে বলি অসততা। আজকের দুনিয়ায় মানুষ সততা ও অসততার দ্বন্দ্বে প্রচ-ভাবে দোদুল্যমান। আমাদের চারপাশে অসততা এমন প্রচ- শক্তি নিয়ে সমাজকে, রাষ্ট্রকে গ্রাস করছে যে- সৎ ও সরল মানুষ ক্রমশ একঘরে হয়ে পড়ছে। সততার আদর্শ ও মহিমা থেকে বিচ্যুত হওয়ার লক্ষণ মানুষের মধ্যে ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। 

সততা একটি শক্তি। কখনো অসততার জয় হলেও চূড়ান্ত বিচারে সততার জয় হবেই, অবশ্যম্ভাবী। সততাই মানুষকে মুক্তি ও কল্যাণের পথ দেখায়। যে অসৎ সে হয়তো কখনো ভোগে, সম্পদে ও বিলাসিতায় অনেক বড় হয়ে ওঠে, কিন্তু সে ভোগের মধ্যে কখনো প্রকৃত শান্তি বা প্রশান্তি থাকে না। সে সর্বত্র অসততার পীড়ন অনুভব করে। অসৎ মানুষের মৃত্যু কেউ মনে রাখে না। তাদের জীবন বর্তমান এবং ক্ষণস্থায়ী। পক্ষান্তরে সৎ যাঁরা- তারা যদিও সাময়িক কষ্টভোগ করেন- কিন্তু তাদের ঠাঁই হয় মহাকালের বুকে। এরই ধারাবাহিকতায় সংসার পালনে, সামাজিক জীবনযাপনে কতকগুলো সত্য চিহ্ন পরিস্ফুটিত হয়েছে যা মানুষের চলার পথকে সুন্দর করেছে। সত্যে ও ন্যায়ে পথে থাকার পথ দেখিয়েছে। সত্যের সে কথাগুলো, শব্দগুলো মানুষের ভাবনার জগতকে বিকশিত করেছে- সমাজকে নতুন ভাবনায়, সত্যের অবগাহনে উচ্চকিত করেছে- সেই কথাগুলো, উপদেশগুলো মেনে চললে আমরা বর্তমান ঝঞ্চা-বিক্ষুব্ধ পৃথিবীকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসতে সক্ষম হবো।

আমরা পড়াশুনা করতে গিয়ে, সমাজে চলতে গিয়ে- সেই সত্যের, চিরন্তন বাণীগুলো প্রায়ই অবলোকন করি। কেউ তা অনুসরণ করি, কেউ আদৌ খেয়াল করি না, পালনের চেষ্টাও করি না। তবে এসকল বাণী আমাদের মননে, মনের মুকুরে সঞ্চিত থাকে। জীবন চারণের ক্ষেত্রে, টেবিল টকে, তর্কে জেতার জন্য, নিজের জ্ঞানের পরিধি অন্যকে বুঝানোর জন্য, আমরা সেই সত্য বাণীগুলো ব্যবহার করি। যেমন- সাধনা করো- একাগ্রচিত্তে। দান করো- মুক্তহস্তে। আহার কর- পরিমিতভাবে। বিশ্বাস করো- মনেপ্রাণে। সেবা করো- যতেœর সাথে। সংকল্প করো- দৃঢ়চিত্তে। পথ চলো- সাবধানে। 

আবার, চলার পথে আমরা প্রতিনিয়ত আরো কতকগুলো সত্য বাণীর মুখোমুখি হই। যেমন- এমন উপদেশ দিও না- যা নিজে করো না। এমন ওয়াদা করিও না- যা পূরণ করতে পারবে না। হিংসা করিও না- করলে আত্মপীড়ন হবে। কুসংগে থাকিও না- থাকলে নিন্দিত হবে। কৃপণতা করিও না- করলে মর্যাদা নষ্ট হবে। অহংকার করিও না- করলে ধ্বংস হবে। অথচ এ সত্য বাণীগুলো মনে-প্রাণে বিশ্বাস করলেও আমাদের কাজে তার প্রতিফলন ঘটাই না। 

বর্তমানে আমরা কিছু ভাল কাজের মধ্যেও বৈপরিত্য লক্ষ্য করি। এ বৈপরিত্য বা অসত্য ভাবনা ইদানিং সত্য বলে প্রতিভাত। আদতে এটা সত্য নয়। যেমন- প্রশ্রয় দিলে- মাথায় ওঠে। উপকার করলে- অস্বীকার করে। বিশ্বাস করলে- ক্ষতি করে। সুখের কথায়- হিংসা করে। দুঃখের কথায়- সুযোগ খোঁজে। ভালোবাসলে- আঘাত করে। স্বার্থ ফুরালে কেটে পড়ে। বস্তুতপক্ষে সমাজে প্রচলিত- মানুষের মধ্যে ইতিবাচক মূল্যবোধগুলো ক্রমান্বয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং এধরনের নেতিবাচক কাজ প্রতিনিয়ত দেখতে পাওয়ায়- মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশাও বাসা বেঁধেছে। একারণে একশ্রেণির মানুষ এখন আর ভাল কাজ করতে চায় না। কারো সাহায্যে এগিয়ে আসতে চায় না। আর অনেক সময় সহযোগিতা করাটাও বিপজ্জনক মনে করে। মানুষ বারবার ঠকতে সাহস পায় না। প্রতারিত হতে চায় না। এমতাবস্থায়, সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সত্য মূল্যবোধ কার্যকর করতে হবে। ভাল কাজের সম্মান দিতে হবে। সত্যকে পুরস্কৃত করতে হবে। 

রাষ্ট্র বিজ্ঞানী মতে, একটি কল্যানমুখী রাষ্ট্র বা দেশের অবস্থান কি হবে- তাও রাষ্ট্রপরিচালনায় সরকারের সততার উপর নির্ভর করে। দেশের শাসনকর্তা যখন ন্যায়পরায়ণতা প্রদর্শনে সফলকাম হয়, সত্য পথে চলার নিয়ামক হয়  এবং জনগণ যখন ন্যায় বিচার পায়, তখন সে সরকারকে কল্যাণকামী ও ন্যায়পরায়ণ সরকার বলা হয়। সরকার যদি ভাংচুর, জ্বালাও-পোড়াও’র প্রতি কঠোর হয়, ‘না’- সূচক পদক্ষেপ নেয় এবং ইতিবাচক কাজকে এগিয়ে নেয়, সরকারের পদক্ষেপগুলো জনকল্যানমুখী হয়, তাহলে সমাজে শান্তি  ও উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে এবং সরকার জনপ্রিয়তা লাভ করবে।

সত্য ও ন্যায় এবং মজলুম ও জুলুম সম্পর্কে আমাদের নবী (স.) বলেছেন- “মজলুমকেও সাহায্য কর, জালেমকেও সাহায্য কর।” আমাদের কাছে পরম্পরা পাওয়া অভিজ্ঞতা ও দায়-বোধ থেকে এটা বুঝতে পারি, কোন মজলুমকে আমাদের সাহায্য করা উচিত, তাদের সহযোগিতায় বা তাদের রক্ষায় আমাদের এগিয়ে আসা উচিত। এটাই স্বর্গীয় মূল্যবোধ। আর ‘জালেমকে সাহায্য কর’- অর্থাৎ এখানে জালেমকে সাহায্য করা মানে- জালেমকে তার নেতিবাচক কর্মসূচি থেকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করা। তাকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখতে সাহায্য করা। এর মানে দাঁড়ায়- জুলুমকারী যেন আর জুলুম না করে। জুলুম বন্ধ করে। জুলুমবাজ ব্যক্তি যেন সত্য ও ন্যায়ের পথে ফিরে আসে।

মূলত দেশের শাসনভার যাঁর হাতে থাকে তার কর্তব্য হলো, দায়িত্ব হলো- জালেমকে প্রচলিত আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা। জনগণকে সচেতন করে- জালেমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে সরকার যদি এগিয়ে না আসে, সমাজ যদি প্রতিরোধ গড়ে না তোলে- তাহলে ব্যক্তিকে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যক্তির জীবনের ঝুঁকি থাকলে, পারিপার্শ্বিকতা যদি তাকে এ কাজে সহায়তা না-ই করে, তাহলে ‘জালেম’কে ঘৃণা করতে হবে। অন্তত মনে মনে হলেও তাকে ঘৃণা করতে হবে। এক্ষেত্রে জালেম ব্যক্তি হলেও তার কুকর্মকে ঘৃণা করতে হবে। তবে ব্যক্তিকে ঘৃণা করা যাবে না। কারন, তিনি মানুষ। তার জুলুম ও অত্যাচার সাদৃশ্য পাপকর্মকে ঘৃণা করা যাবে। এজন্য সর্বধর্মে বলা হয়েছে- “পাপকে ঘৃণা কর, 
পাপীকে নয়।” এরপরও পাপ কাজ থেকে জালেমকে ফিরাতে না পারলে- দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় তাকে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে- যাতে অন্য জুলুমবাজরা শিক্ষা নিতে পারে- সৎ পথে ফিরে আসতে পারে। তবে, শাসককে সুশাসন ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অবশ্যই দায়িত্ব পালন করতে হবে। 

আমরা জানি, আচরণে ভদ্রতা ও রুচিবোধের যৌক্তিক মিলনের নাম শিষ্টাচার। শিষ্টাচারের ভিত্তিভূমির ওপর গড়ে উঠে সৎ চরিত্রের সুরম্য অট্টালিকা। সৎ ও চরিত্রবান ব্যক্তি সমাজ ও জাতীয় জীবনে বিশেষ অবদান রাখতে পারে। মহৎ ও বরণীয় মানুষ মাত্রই মানবজীবনে সততার মূর্ত প্রতীক। সত্যকে বরন করতে গিয়ে মৃত্যুবরন করেছেন- এমন মহান ব্যক্তিত্বের উদাহরন এ বিশ্বে রয়েছে। সত্যের জন্য ক্রুশবিদ্ধ হয়েছেন যিশুখ্রিষ্ট্র। সত্যাশ্রয়ী জোয়ান অব আর্ককে ‘ডাইনি’ বলে মিথ্যা অভিযুক্ত করে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। জ্ঞানপ্রেমিক দার্শনিক সক্রেটিসকে সত্যকে সমুন্নত করতে ‘হেমলক বিষ’ পান করে জীবন দিতে হয়েছে। কিন্তু এরাই মানব সভ্যতার ইতিহাসে চিরঞ্জীব। আর মিথ্যাশ্রয়ীরা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। যেমন ফেরাউন, হিটলার, মুসোলিনী। তাই সমাজকে, দেশকে সঠিক পথে চালাতে- আমাদের ন্যায় ও সত্যের পথে হাঁটতে হবে। সমাজে প্রচলিত সত্য ধারণাগুলো বাস্তবায়নে একাগ্রচিত্তে কাজ করতে হবে। অন্যায় ও জুলুমবাজদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মজলুমদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। সত্য ও ন্যায়ের পথে দেশকে পরিচালিত  করতে হবে। যেখানে অন্যায়- সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। দেশের শাসনভার যার হাতে থাকবে- তাকে সুশাসন ও ন্যায়-বিচার কায়েম করতে হবে। এর যে কোন ব্যত্যয়- কারো জন্য সুফল বয়ে আনবে না। না জনগণের জন্য, না শাসকের জন্য। তাই সবার উচিত- ‘জালেম-জুলুম’-এ শব্দ দু’টি পরিহারে বা অভিধান থেকে বিদায় করতে- সর্বাত্মক চেষ্টা করা। সমাজের সত্য মূল্যবোধগুলো ধারণ করে সমাজ ও দেশের উন্নয়নে কাজ করা। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে একটি সুখী, সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করি। মহান আল্লাহর, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছের প্রতিফলনে কাজ করি।


আগামীকাল কাল থাকছে - “একটি দেশের জন্মঃ অপরাধবোধ ও স্বীকারোক্তি”