১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, শুক্রবার ২৬ মে ২০১৭ , ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ

‍‍`এই কাজ করার আগে আমার অনুমতি নিয়েছো ‍‍` - জৈনক পুরুষ


গো নিউজ২৪ | ফারজানা আক্তার আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০১৭ বৃহস্পতিবার
‍‍`এই কাজ করার আগে আমার অনুমতি নিয়েছো ‍‍` - জৈনক পুরুষ

নারী ও পুরুষ দুটি স্বাধীন সত্তা, দুজন স্বাধীন মানুষ। এই কথাটাই একজন পুরুষকে  ভুলে যেতে সাহায্য করে  দীর্ঘদিনের সামাজিক চর্চা। দীর্ঘদিনের সামাজিক চর্চা মনে করিয়ে দেয় একজন পুরুষের অনুমতি ছাড়া একজন নারী কিছুই করতে পারবে না।

এইতো কয়দিন আগের কথা। মিলি আর মিলন (ছদ্মনাম) ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো। মিলির বাবা - মা কিছুতেই মেয়ের এই বিয়ে মানতে পারে নাই। অনেক চেষ্টা করেও মিলি তার বাবা - মায়ের মন গলাতে পারে নাই। মিলন খুব বিরক্ত হয়েছিলো মিলির বাবা - মায়ের ওপর। মিলন তখন মিলিকে বলেছিলো ওই বাসার কারো সাথে যোগাযোগ করার দরকার নাই,যাবারও দরকার নাই। মিলি লুকিয়ে লুকিয়ে ওর মায়ের সাথে যোগাযোগ করতো। একদিন মিলির মা বললো মিলির বাবা খুব অসুস্থ। মিলি মিলনকে এইকথা জানালো কিন্ত মিলন অপারগ। সে তো যাবেই না, মিলিকেও যেতে দিবে না। কিন্ত মিলির বাবা যখন খুব অসুস্থ হয়ে পড়লো তখন মিলি মিলনকে না বলেই বাবাকে দেখতে চলে গেলো। মিলি যখন বাসায় ফিরলো তখন মিলন যা ইচ্ছে তাই বলে গালাগালি দেয়া শুরু করলো। মিলনের এক কথা তার অনুমতি ছাড়া মিলি এক পাও এদিক ওদিক করতে পারবে না।

এমন হাজারো মিলি - মিলন আছে আমাদের আশেপাশে।  আমরা সবার কথা জানি না, শুনিও না। এমন হাজারো মিলি মিলনদের জেলে আটকা পরে আছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে অনুমতি নেওয়ার ব্যাপার আসে কেনো ? এমন একটি প্রশ্ন করা হয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাবিবা রহমানকে।  তিনি বললেন, " নারী ও পুরুষ দুটি স্বাধীন সত্তা, দুজন স্বাধীন মানুষ। এখানে অনুমতি নেওয়ার তো প্রশ্নই আসা উচিত নয়। পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোর জায়গা থেকে স্বামী তাঁর স্ত্রীর ক্ষেত্রে এমনটা করেন। কিন্তু এটা যে তাঁর ব্যক্তিত্বের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে, সেটা তিনি বুঝতে পারেন না।  "

স্বামী - স্ত্রীর মধ্যে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে, পছন্দ - অপছন্দ উঠে আসবে , দুইজন দুইজনের মতামত দিবে কিন্ত কোনো স্বৈরাচারী থাকবে না। আমাদের সমাজের স্বামীরা নিজেদের পুরুষসত্ত্ব বুঝাতে যেয়ে নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করে ফেলে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আহমেদ হেলাল বলেন, "দীর্ঘদিনের সামাজিক চর্চা পুরুষের মনে এই ধারণা দেয় যে অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা কেবল তাঁরই। তিনি ভুলে যান, তাঁর স্ত্রীর স্বাধীন সত্তার কথা।"

এই সমস্যার সমাধান কি ? এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিলো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আহমেদ হেলাল স্যারের কাছে। তিনি বলেন, "অনুমতি নেওয়ার ব্যাপারটা যে ভালো লাগেনি, স্বামীকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে । এটা বলার জন্য তিনি সুসম্পর্কের সময়টা বেছে নিতে পারেন।  দৃঢ় অথচ শান্তভাবে তিনি এই ভালো না লাগার কারণ ও মতামত স্বামীকে জানাতে পারেন। এ ক্ষেত্রে কোনোভাবেই উত্তেজিত হওয়া যাবে না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। স্বামী আত্মরক্ষার নামে নিজের ভুলটাই আঁকড়ে ধরে সেটার পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন। ব্যক্তি হিসেবে নিজের চাওয়ার কথা নিঃসংকোচে স্বামীকে বলতে হবে। এতে বোধোদয় হয়ে স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখবেন স্বামী। "

দায়িত্বটা শুধু স্ত্রীরই নয়, স্বামীকেও উদ্যোগ নিতে হবে ।  ভালো কিছুর জন্য নিজেকে তো বদলে দেয়া যায়।  এই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মতে, " স্ত্রীকে ছোট করে দেখার মানসিকতা বন্ধ করতে হবে। কারণ, দুজনই স্বাধীন সত্তা, কেউ কারও অধীন নন।  এই উপলব্ধি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে আরও সুন্দর করে। এ ছাড়া এটাও মাথায় রাখতে হবে, স্ত্রীকে অনুমতি নিতে বলার মাধ্যমে তিনি আসলে নিজের দুর্বল ব্যক্তিত্বেরই প্রকাশ ঘটান।"


সুন্দর দাম্পত্যের জন্য দরকার পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, পরস্পরের স্বাধীন সত্তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।  নিয়ন্ত্রণ নয়, সম্মান আর  দাম্পত্যে ভালোবাসার শক্তিকে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে।