৮ আশ্বিন ১৪২৪, শনিবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ , ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ
বইঃআমার কথা

‘সাফল্যের স্বর্ণদ্বার’


গো নিউজ২৪ আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০১৭ রবিবার
‘সাফল্যের স্বর্ণদ্বার’

সৈয়দ আবুল হোসেন বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘আমার কথা’। এই বইয়ে তিনি নিজের চিন্তা, কর্মকান্ড, মূল্যবোধ, নানা অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখেছেন।

এটি পড়লে তাকে যারা পুরোপুরি চিনেন না তাদের সুবিধা হবে। বইটি Gonews24.com ধারাবাহিকভাবে ছাপছে। আজ পড়ুন বইটির প্রথম অধ্যায় ‘সাফল্যের স্বর্ণদ্বার’

আমি সবসময় একজন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। নিখাদ সাদা চরিত্রের মানুষ। শোভন ও ভালোর বিপরীতে কিছু করতে অভ্যস্থ নই। সাধারণত সবাই যেসব বিষয়ে গা ভাসিয়ে দেয়- সেটা আমি করি না। আমার কোনো বদাভ্যাস নেই। কোনো অসৎসঙ্গ নেই। এই কারণে আমার ওইরকম কোনো ভয় নেই। নেই পিছুটানও। আর এ কারণে সর্বক্ষেত্রে সাফল্য লাভের অদম্য ইচ্ছা ও দৃঢ় প্রত্যয় আমাকে তাড়িত করে। তবে জেদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে অথবা চূড়ান্ত সাফল্য অর্জনের প্রতিবন্ধকতা বা জটিলতা সম্পর্কে যখন আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করেন, তখন উত্তরে আমি বলি- রানার্স আপ বা দ্বিতীয় স্থান অধিকারীকে কেউ মনে রাখে না, স্মরণও করে না। কে বলতে পারবে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি হিমালয়ের চূড়ায় আরোহণ করেছে? দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি চাঁদে পা রেখেছে? কে বলতে পারবে কোন ব্যক্তি দ্বিতীয় নম্বরে এসেছে? এসবের উত্তর কেউ দিতে পারবে না। কারণ দ্বিতীয় ব্যক্তিকে কেউ মনে রাখে না। সবার নজর থাকে প্রথম স্থান অধিকারীর দিকে। জিগ জিগলারের ভাষায়: If you don't see yourself as a winner, then you cannot perform as a winner.

আমরা এখন সফলতার স্বর্ণদ্বারে উপনীত হওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি এবং লক্ষ্যস্থল আমাদের নিকট থেকে বেশি দূরে নয়। যে নিজে উপলব্ধি করে যে, সে প্রথম স্থান লাভের যোগ্য নয়, তাহলে সে তো শুরুতেই নিজের নিয়তির কাছে হেরে গেল। আমাদের জনগণ এখন সেরা হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশ এখন সেরাদের তালিকায়, বাংলাদেশের জনগণও তাই। এ আমার মুখের কথা নয়। পরিসংখ্যান দিয়ে জাতিসংঘ বলছে, বলছেন অমর্ত্য সেন এবং সারা বিশ্ব। বাংলাদেশ এখন তার জনগণের অদম্য ইচ্ছা আর অধ্যবসায়ের কারণে বিশ্বের যেকোনো দেশের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সকল যোগ্যতায় সমৃদ্ধ।

গত দুই দশকের আর্থনীতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের সূচক বিচারে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন যেকোনো বিবেচনায় স্বকীয়তার প্রেক্ষাপটে নম্বর ওয়ানে। ১৯৯০-এর পর সার্বিক প্রবৃদ্ধিতে উন্নয়নশীল দেশের গড় হারের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। দারিদ্র্যের হার কমে অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। মেয়েদের আর্থনীতিক কর্মকা-ে অবদানের হার দ্রুত বেড়েছে, জনসংখ্যা, গড় আয়ু, শিশুমৃত্যুর হার, মেয়েদের স্কুলে পড়ার হার, সক্ষম দম্পতিদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের হার ইত্যাদি সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ সমপর্যায়ের উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশ, এমনকি প্রতিবেশী ভারতকেও অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের সাফল্য অনেক বেশি। নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তাঁর লেখা ‘অ্যান আনসারটেইন গ্লোরি : ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইটস কন্ট্রাডিক্শন্স্’২৮ গ্রন্থে বাংলাদেশ নিয়ে আলাদা একটি অধ্যায় লিখেছেন। সেখানে তিনি যুক্তি ও তথ্যসহ বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নের বিবরণ দিয়েছেন।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এখন গড় মাথাপিছু আয় ৫২৮ ডলার। আর দক্ষিণ এশিয়ার গড় আয় ১ হাজার ১৭৬ ডলার। ১ হাজার ৪৪ ডলার নিয়ে দক্ষিণ এশিয়াকে প্রায় ধরে ফেলেছে বাংলাদেশ। সাফল্য আছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারেও। বাংলাদেশে এখন এ হার মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ আর দক্ষিণ এশিয়ার গড় ১ দশমিক ৪ শতাংশ। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এ গড় অনেক বেশি, ২ দশমিক ১ শতাংশ। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মানুষের গড়-আয়ু ছিল ৪৬ বছর, এখন তা ৬৯ বছর। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার গড়-আয়ু হচ্ছে ৬৫ বছর। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এক হাজার নবজাতকের মধ্যে মারা যায় ৭০ জন, দক্ষিণ এশিয়ায় ৫২, আর বাংলাদেশে ৩৫ জন। মেয়েরা সবচেয়ে বেশি স্কুলে যায় বাংলাদেশে।

বাংলাদেশের কৃষ্টি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরব কোনো অংশেই কম নয়। আমাদের ঐতিহ্য শুধু সহস্র বছরের পুরনো নয়, এটি মানুষের চেতনা আর উৎসের গভীরে গ্রথিত বিশ্ব-ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছিন্ন অংশ। বাংলার কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তাই বাঙালি জাতির সত্তাকে একাকার করে দিয়েছে প্রকৃতির সাথে- তাদের মনে ও মননে। এসব দিক থেকেও বাংলাদেশ সেরাদের একটি।

আমাদের প্রত্যেকের উচিত সেরা হওয়ার জন্য সেরা নীতি প্রণয়ন করা, সেরাদের ন্যায় সেরা কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হওয়া। আমরা শ্রেষ্ঠ আসনে আসীন হওয়ার লক্ষ্যে অদম্য অধ্যবসায় নিয়ে সবার সঙ্গে এগিয়ে যেতে চাই। এটা আমাদের নতুন চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য নয়, আমি এটা আমার পরিবার এবং আমাদের জাতির সম্মিলিত প্রয়াসের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। আমার মা-বাবা আমাকে ছোটবেলা হতে শিক্ষা দিয়েছেন কীভাবে বড় হতে হয়, কীভাবে সেরা ও ব্যতিক্রমী থাকার জন্য নিজেকে নিয়োজিত রাখতে হয়। তাঁরা আমাকে শিখিয়েছেন কারও সঙ্গে প্রতারণা করে নয়, বরং যোগ্যতা দিয়ে অন্যকে হারিয়ে নিজের আসন প্রতিষ্ঠা করাতেই আনন্দ। এটাই মহত্ত্ব আর গৌরবজনক অধ্যায়। যারা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ষড়যন্ত্র করে, অন্যকে ঠকায়, তারা তো ঠগই।

আমরা অনেক কিছুতেই শ্রেষ্ঠ। জ¦লন্ত উদাহরণ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সারা বিশ্বে আমরাই একমাত্র জাতি, যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। আমরা জীবনের বিনিময়ে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার অর্জন করেছি। আমাদের ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো।৩১ এটি সামান্য বিষয় নয়।

আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিক দলের নেতা-নেত্রীরা তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন এবং তৎসঙ্গে প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে উপস্থাপন করার কারণে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উৎসভূমি হিসাবে বাংলাদেশ পরিচিতি লাভ করেছে। এ বিষয়টি জানানোর জন্য এখন বিশ্বের অনেক দেশেই শহিদ মিনার তৈরি করার জন্য সরকার জায়গা দিচ্ছে। ভাষার জন্য একটি দেশের মানুষ কী করতে পারে সে উদাহরণ দিয়ে তাঁরাও তাঁদের জনগণকে উজ্জীবিত ও উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেন। এর ফলে, আজ বাংলাদেশের মাতৃভাষা দিবস অনেক দেশের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে গড়ে উঠছে বিভিন্ন গবেষণাকেন্দ্র।

বাংলাদেশের কৃষ্টি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরব কোনো অংশেই কম নয়। আমাদের ঐতিহ্য শুধু সহস্র বছরের পুরনো নয়, এটি মানুষের চেতনা আর উৎসের গভীরে শিহরিত বিশ্ব-ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছিন্ন অংশ। বাংলার কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তাই বাঙালি জাতির সত্তাকে একাকার করে দিয়েছে প্রকৃতির সাথে- তাদের মন ও মননে। এসব দিক থেকেও বাংলাদেশ সেরাদের একটি। বিশে^র সংস্কৃতির শহরও বলা যায় ঢাকাকে। এখানে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিভিন্ন জাদুঘর নির্মাণ, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং অনেক কিছুরই সুন্দর শিল্পকর্মের সমাহার। এমন মহান কর্মযজ্ঞের কারণে বাংলাদেশকে সেরা বলা যেতেই পারে। আমাদের জন্য সেরা হওয়ার বিকল্প কোনো কিছু নেই। শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করতে হলে সে যোগ্যতা থাকতে হবে, থাকতে হবে যথার্থ অনুশীলন আর ঐকান্তিক সাধনা।

এর ব্যাখ্যায় আমি বলব, যদি কেউ ১ কিলোমিটার দৌড়াতে চান, সেটা সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করার পর তিনি খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। এটাই বাস্তব। ধরুন, আবার একই ব্যক্তি যদি ১০ কিলোমিটার দৌড়াবার ইচ্ছা করলেন এবং তা শুরুও করলেন, এবার আর প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় কিলোমিটার দৌড়ানোর পরও তিনি ক্লান্ত হবেন না। কেননা এবার তার লক্ষ্য এক, দুই বা তিন কিলোমিটার নয়, দশ কিলোমিটার। তাই তার ক্লান্ত হয়ে পড়ার কোনো সুযোগ নেই। সাফল্য ও বিজয় অর্জন করতে হলে দৃঢ়সঙ্কল্প ও শক্তি রাখতে হবে লক্ষ্যের সমানুপাতিক। সুতরাং প্রথম স্থান অর্জনের সংকল্প করতে হবে। 

প্রথম স্থান অর্জনের বাইরে অন্য কোনো স্থান লাভের চেষ্টাও করা কারও পক্ষে সমীচীন হবে না। তখন সেরাটাই আপনার অনিবার্য প্রাপ্য হয়ে উঠবে, যদি কেউ দৃঢ়সঙ্কল্পে আবদ্ধ থাকেন। নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে কারও কখনও কোনো সময় সন্দিহান থাকলে হবে না, কখনও নিজের ক্ষমতার অবমূল্যায়ন করা মানে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়া। নিজেকে কখনো অপরের চেয়ে ছোট মনে করা ঠিক নয়। আত্মবিশ্বাস, আত্মজ্ঞান ও আত্মনিয়ন্ত্রন- এ তিনটি বিষয় মানুষকে বড় করে তোলে এবং আত্মবিশ্বাসই মানুষের বড় হওয়ার মূলমন্ত্র। আত্মবিশ্বাস লক্ষ্যবস্তু থেকে মনকে বিচ্যুত করবেন না। শ্রেষ্ঠ হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যান এবং আপনি আপনাকে মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করে তুলুন। সফলতা অবশ্যম্ভাবী।

বর্তমানে বাংলাদেশ যেসব ক্ষেত্রে সেরা হতে চাইছে সেগুলো হলো : অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, নাগরিকদের সুখ ও সন্তুষ্টি, নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, নিরাপত্তা, ব্যবসা, ট্যুরিজম বা ভ্রমণব্যবস্থা এবং অন্যান্য আরও অনেক ক্ষেত্রেই প্রথম স্থানে আছে বাংলাদেশ। সব ক্ষেত্রে সারা বিশে^র মধ্যে শ্রেষ্ঠ হওয়ার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা চলতেই থাকবে। আমরা জাতি হিসাবে প্রথম স্থান ব্যতীত অন্যকিছু নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চাই না। আমাদের প্রচুর দক্ষ জনশক্তি আছে, তাদের আছে অদম্য স্পৃহা। অতএব, সেরা হওয়া আমাদের শুধু সময়ের ব্যাপার। গত ২১ জুন, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ বিশ্বক্রিকেটের অন্যতম শক্তি ভারতকে হারিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে বিজয় অর্জন করেছে। এটি আমাদের সেরা হওয়ার যোগ্যতার একটি অন্যতম নিয়ামক। 

একতার চেয়ে বড় শক্তি আর নেই। ঐক্যবদ্ধ হলে অনেক কঠিন কাজ সহজ হয়ে যায়, আবার বিভক্তি অনেক সহজ কাজকেও কঠিন করে দেয়। কেউ এককভাবে কিছু করতে চাইলে সফলতা না-ও আসতে পারে। তবে সম্মিলিত প্রয়াস কখনও ব্যর্থ হয় না। ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে পারলে আমরাও ব্যর্থ হব না। আমরা জিতবই- ইনাশাআল্লাহ।

আগামীকাল কাল থাকছে - 'নারীর ক্ষমতায়ন ও বাংলাদেশ'