৩ মাঘ ১৪২৩, সোমবার ১৬ জানুয়ারি ২০১৭ , ১১:১৩ অপরাহ্ণ

বইঃ আমার কথা

সরকারি কাজের পর্যবেক্ষণ


গো নিউজ২৪ আপডেট: ০৬ জানুয়ারি ২০১৭ শুক্রবার
সরকারি কাজের পর্যবেক্ষণ

সৈয়দ আবুল হোসেন বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘আমার কথা’। এই বইয়ে তিনি নিজের চিন্তা, কর্মকাণ্ড, মূল্যবোধ, নানা অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখেছেন।এটি পড়লে তাকে যারা পুরোপুরি চিনেন না তাদের সুবিধা হবে। বইটি ‘gonews24.com’ ধারাবাহিকভাবে ছাপছে। বইটির আজকের পর্বে থাকছে- ‘সরকারি কাজের পর্যবেক্ষণ’ 

মানুষের জীবনের সবচেয়ে সাফল্যের কারণ হচ্ছে- নিজের কাছে নিজের জবাবদিহি উপস্থাপনের মানসিক সদিচ্ছা ও নিয়ামক মূল্যবোধের প্রয়োগ। জবাবদিহি নিজের কাছে না থাকলে, সে সফল হতে পারে না। এই কারণে নিজেকে জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। কেবল মানুষের জীবনের বেলায় নয়, সরকারের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। একটি সফল সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হচ্ছে সরকারি কাজের পর্যবেক্ষণ করা। আমরা সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষমতায়ন করেছি, তাদের নেতৃত্ব এবং আয়-ব্যয় করার ক্ষমতা দিয়েছি। একই সঙ্গে তাদের কাজের অগ্রগতি এবং তাদের দায়িত্ব পর্যবেক্ষণও করছি। সুতরাং যখন কোনো কর্মকর্তা ভুল করে অথবা কোনো অন্যায় করে, তখন কী অবস্থার সৃষ্টি হয় এক্ষেত্রে এবং তাকে কতবার সুযোগ দেওয়া যায়?
 
এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, আমাদের নিয়ম বা আইনের মাধ্যমে এবং তা সরকারি কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমস্যার সমাধান করা। আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, ব্যক্তিপর্যায়ের অনিচ্ছাকৃত ভুলগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা উচিত।

কৌশলগত পরিকল্পনার অগ্রগতির পরিমাপ করাই হচ্ছে প্রথম ধাপের পর্যবেক্ষণ। আমরা ব্যাপকভাবে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করি, যার মাধ্যমে মন্ত্রণালয়গুলোর পরিকল্পনার বাস্তবায়নের হাজার হাজার অগ্রগতির সূচক পরিমাপ করা যায়। আর এভাবে, আমি নিজে যখন দায়িত্বে ছিলাম তখন সরাসরি মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের অগ্রগতির খোঁজখবর নিতাম। মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতির পরিমাপ করার জন্য তার নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে। সরকারের উচ্চমহল থেকে এটা করা দরকার যে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় তাদের কাজের যে অগ্রগতির প্রতিবেদন প্রেরণ করে তার ত্রুটি চিহ্নিত করে মন্ত্রনালয়ে প্রেরণ করা যাতে তারা দ্রুত তাদের কাজের ত্রুটিগুলো দূর করতে পারে।

দ্বিতীয় ধাপের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে মাঠপর্যায়ের। যার অর্থ হচ্ছে- গ্রাহক সেবার পর্যবেক্ষণ বা খোঁজখবর নেওয়া। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য আমাদের গোপন ক্রেতা ও গ্রাহক থাকতে হবে। তারা গ্রাহক-সেবার মানের ওপর প্রতিবেদন তৈরি করে এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয় এ প্রতিবেদন বিচার-বিশ্লেষণ করে যে ভুল-ত্রুটি পায়, তা দ্রুত সমাধান করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরামর্শ দেবে।

সরকারি কাজের পর্যবেক্ষণের জন্য প্রচুর প্রতিবেদন গ্রহণ করতে হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তৃতীয় স্তরের পর্যবেক্ষণ শেষ না হয়। সরকারের এমন কাউকে দায়িত্ব দিতে হবে যিনি ব্যক্তিগতভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শন করবেন। সরকারি কাজের প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির খোঁজখবর নেবেন। আমি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাককালীন তা করেছি। সরকারি কাজে বাস্তবায়িত কিছু সফল নীতির সঠিক বাস্তবায়নের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাই এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে কাজের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করি। কাজের অগ্রগতির পর্যবেক্ষণ শুধু অফিস থেকে হবে, সেটা আমি বিশ্বাস করি না। মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে কাজের মান সম্পর্কে নতুন নতুন ধারণা দেয়, নীতি বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পাওয়া যায়। যেখানে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সেখানে ব্যবস্থা নিয়েছি।
 
চতুর্থ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। মহাহিসাবনিরীক্ষা অধিদফতর এ কাজটি করে থাকে। হিসাবনিরীক্ষা অধিদফতরের প্রতিবেদন সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষ বিচার-বিশ্লেষণ করে, যদি কোনো ভুল-ত্রুটি পায়, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। এই হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
 
আমি মনে করি, সরকারের কাজগুলো ঠিকমতো হচ্ছে কিনা এজন্য ফেডারেল ন্যাশনাল কাউন্সিলের মতো একটি কাউন্সিল করা দরকার, যারা কাজের পঞ্চম স্তরের পর্যবেক্ষণ করবে। এটা অতিরিক্ত ও ভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবে এবং আমাদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এ কাউন্সিলের সকল পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। আমাদের চলমান উন্নয়ন এবং অগ্রগতির মাধ্যমে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে কাউন্সিলের প্রায় সকল পরামর্শ অনুমোদন করতে হবে। এটা করা জরুরি মনে করছি। আশা করছি সরকার তা করবে। আমি আরও বলতে চাই, আমাদের সকল কার্যক্রমের এবং আন্দোলনের একটাই জাতীয় লক্ষ্য, তা হচ্ছে আমাদের নাগরিকদের সুখে, শান্তিতে এবং নিরাপদে রাখা। এটা শুধু অর্থ দিয়ে সম্ভব নয়; তার সঙ্গে প্রয়োজন মূল্যবোধ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার।

মানুষ মাত্রই ভুল করে। আর তাই, মাঝে মাঝে আমাদের কাজের ভুল হয়ে থাকে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আমরা কোনো কাজে অবহেলা, অবজ্ঞা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করার চেষ্টা করি না। এটাই আমাদের প্রত্যয় এবং দৃঢ়সংকল্প, যা আমাদের বিবেচনাবোধকে জাগ্রত রাখে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করার পূর্বে কয়েকবার সুযোগ দেওয়া যায়।

ভুল করেই মানুষ শেখে। যখন মানুষ ব্যর্থ হয়, তৎক্ষণাৎ সে বুঝতে পারে না, কিসে তার ভুল হয়েছে। পরবর্তীকালে তার ভুল বুঝতে পারে। অতএব, একজন ব্যক্তি তার ভুল থেকেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এর অর্থ এই নয় যে, ইচ্ছাকৃত ও সহজে ভুল করে যাক। তবে এটা ঠিক- কিছু ভালো কর্মকর্তা, যারা কাজপাগল ও পরিশ্রমী তাদের জন্য কিছুটা নমনীয়তা প্রয়োজন। কাজ করে বলেই ভুল হয় এবং যে বেশি কাজ করবে তার ভুলও বেশি হবে। আমি পুনরায় বলছি, মানুষ মাত্রই ভুল করে। তবে ভুলের ভয় থাকা ভালো। কারণ ভুলের ভয় শুদ্ধতা ও সৃজনশীলতার পথ দেখায়। তবে সেটা নিয়ে বসে থাকলে হবে না। নতুন নতুন সৃজনশীল কাজ করতে হবে। একজন মানুষ এ জীবনে যতটুকু কাজ করার সুযোগ পায় তার প্রতিটাতে সৃজনশীল কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করা দরকার।
 
যারা কাজে ভুল করে, তাদের প্রতি আমি অত্যন্ত নরম আচরণ করি। তবে, যারা কোনো কাজই করে না, প্রচেষ্টাও চালায় না, তাদের প্রতি আমি অত্যন্ত কঠোর। আমাদের কর্মকর্তৃবৃন্দ ভুল করার ভয়কে অতিরঞ্জিত করুকÑ সেটা আমি পছন্দ করি না। কেননা ভুলের ভয় আমাদের কর্মকর্তাদের সৃষ্টিশীল, উদ্ভাবনক্ষম হতে এবং বদলাতে সাহায্য করে না। যারা কিছু ভুল করে, তারা আরও পরিশ্রমী এবং উৎপাদনশীল হয়। অপরদিকে, যারা অলস ও ভয়কাতুরে তাদের এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। যারা ভুল হওয়ার ভয়ে কোনো কাজ করে না তারা বদ্ধ জলাশয়ের মতো অবশেষে কেবল গন্ধই উৎপাদন করে।
 
উদ্ভাবন-শক্তি একজন সরকারি কর্মকর্তাকে একইসঙ্গে নেতা ও ত্রাতায় পরিণত করতে পারে। সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ভাবন-শক্তিকে বিকশিত করার জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অবশ্য এখন সরকার ‘এ টু আই’ প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা ছাড়াও সাধারণ জনগণের মাঝে উদ্ভাবন-শক্তির বিকাশ ঘটানোর প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। এটাকে অব্যাহত রাখতে হবে।

রাজনীতিবিদগণের মতো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীগণও জনগণের সেবক। সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সকল সময় জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। তাই আমি বলি, আপনারা যে যেখানেই কাজ করবেন, আপনাদের সামনে থাকবে শুধু বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষ। আপনাদেরকে আপনাদের প্রিয় মাতৃভূমির ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে হবে। জানতে হবে আমাদের পূর্বসূরিরা কী অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করে এ দেশকে স্বাধীন করেছেন। এলাকার উন্নয়ন নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তৃবৃন্দের ওপর। তাঁদের মনে রাখতে হবে, শুধু রুটিনমাফিক কাজ করাই যথেষ্ট নয়। মাঠপর্যায়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের উদ্ভাবন-শক্তি থাকতে হবে এবং তাঁদের সংশ্লিষ্ট এলাকায় কোন কাজটি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত তা খুঁজে বের করতে হবে।
 
দেশের কীভাবে উন্নয়ন করা যেতে পারে- সরকারি কর্মকর্তাদের এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাঁদের কাজ করতে হবে। অবশ্য এজন্য তাঁদের দায়িত্ব ও ক্ষমতাকেও তেমনভাবে সজ্জিত করতে হবে। বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তৃবৃন্দ যে নীতির আওতায় কাজ করেন তাতে উদ্ভাবন-শক্তি বিকাশের সুযোগ তেমন একটা নেই। তাই সরকারের উচিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্ভাবন-শক্তির বিকাশমূলক কার্য সম্পাদনে উৎসাহমূলক নীতি প্রণয়ন করা।

গো নিউজ ২৪/ এস কে