১০ শ্রাবণ ১৪২৪, মঙ্গলবার ২৫ জুলাই ২০১৭ , ১২:৩৬ অপরাহ্ণ
বইঃ আমার কথা

‘আমার প্রাত্যহিক জীবন’


গো নিউজ২৪ আপডেট: ০৬ জানুয়ারি ২০১৭ শুক্রবার
‘আমার প্রাত্যহিক জীবন’

সৈয়দ আবুল হোসেন বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘আমার কথা’। এই বইয়ে তিনি নিজের চিন্তা, কর্মকাণ্ড, মূল্যবোধ, নানা অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখেছেন।এটি পড়লে তাকে যারা পুরোপুরি চিনেন না তাদের সুবিধা হবে। বইটি ‘gonews24.com’ ধারাবাহিকভাবে ছাপছে। বইটির আজকের পর্বে থাকছে- ‘আমার প্রাত্যহিক জীবন’


এটি পড়লে তাকে যারা পুরোপুরি চিনেন না তাদের সুবিধা হবে। বইটি ‘ঢাকাটাইমস২৪ডটকম’ ধারাবাহিকভাবে ছাপছে। আজ পড়ুন বইটির প্রথম অধ্যায় ‘আমার অনুভব’

শিশুকাল থেকে আমি ছিলাম শান্তশিষ্ট, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী এবং হাসিখুশি। মনের দিক থেকেও সবসময় প্রাণবন্ত, বন্ধুবৎসল ও অমায়িক ছিলাম। শারীরিক দুরন্তপনা আমার কাছে পাশব মনে হতো। তার চেয়ে পাশব মনে হতো মন্দকথা। ‘সাম ওয়ার্ডস হার্ট মোর দ্যান সোর্ডস’- এটি আমার অন্তরে সর্বক্ষণ বিরাজ করত। তাই কাউকে কিছু বলার সময় সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের চেষ্টা করতাম।


যে কাজ অন্যকে আঘাত দেয়, যে কথা কাউকে মর্মাহত করে, যে আচরণ মানবিক বিকাশের পক্ষে ক্ষতিকর তা কখনও মেনে নিতে পারতাম না। এখনও পারি না। প্রত্যেকের কষ্টকে আমার নিজের কষ্টের চেয়েও ভয়ঙ্কর মনে হয়। তাই প্রতিটি কাজ করার আগে ভাবতাম। সবার সঙ্গে এমন ব্যবহার করতাম যাতে কেউ কষ্ট না পায়। আমার এ আচরণের জন্য উচ্ছ্বসিত প্রশংসা পেয়েছি। আবার অনেকের কাছে আমাকে ভীতু হিসাবেও প্রতিভাত করেছে। তবুও আমি আমার মননশীলতায় একাগ্র থেকেছি।


পৃথিবীর সব আকর্ষণীয় জিনিসগুলো নরম, ভালবাসা নরম, স্নেহ-মমতাও নরম। পৃথিবীর মনোহর বস্তুগুলোর কোনোটাতে শক্তি প্রয়োগের আস্ফালন নেই। নমনীয়তা সুন্দর, এটাই সর্বজনীন। সর্বজনীনতার চেয়ে অধিক আনন্দের এবং নিপুণ সাফল্যের আর কিছু নেই।


ছোটবেলার কথা এখনও মনে পড়ে। পিতামাতা আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। তাঁদের ধারণা আমি নিরীহ, বোকা এবং কখনও লড়তে পারব না; প্রতিষ্ঠিত হতে পারব না- নিষ্ঠুর পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন করে। আসলেই আমি নিরীহ ছিলাম। শিশুবেলা থেকে অন্যের কষ্ট মোটেও সহ্য করতে পারতাম না।
বাবা আফসোস করতেন- এত কোমল মনের ছেলে কি কখনও সংসারজীবনে টিকে থাকতে পারবে?


অনেকে আমাকে শক্ত হওয়ার উপদেশ দিতেন। শক্ত হওয়া কী আমি বুঝতাম না। নমনীয়তার মাঝে জীবনের সার্থকতা খুঁজতাম, আমি এতে আনন্দ পেতাম। পৃথিবীর সব আকর্ষণীয় জিনিসগুলো নরম, ভালবাসা নরম, স্নেহ-মমতাও নরম। পৃথিবীর মনোহর বস্তুগুলোর কোনোটাতে শক্তি প্রয়োগের আস্ফালন নেই। নমনীয়তা সুন্দর, এটাই সর্বজনীন। সর্বজনীনতার চেয়ে অধিক আনন্দের এবং নিপুণ সাফল্যের আর কিছু নেই।


আমার পিতামাতা আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে ধৈর্য ধারণ করতে হয়। রাগ সংবরণ করতে হয়। এক সেকেন্ডের রাগ কারও পুরো জীবনকে বিষিয়ে তুলতে পারে। যে ব্যক্তির ধৈর্য নেই, তার আত্মাও নেই। যার আত্মা নেই সে মানুষ নয়। রাগ পাশবতার নামান্তর। অধৈর্য মানুষকে পশুতে পরিণত করে। মানুষ কেন রাগে? মানুষ যখন ভুল করে এবং সে ভুল স্বীকার করে না, স্বভাবতই তখন সে রেগে যায়। রাগ অশান্তিকে প্রসারিত করে। রাগের জন্য মানুষের শান্তি হয় না, তবে রাগ নিজেই রাগের শাস্তি দিয়ে ছাড়ে। প্রবাদ আছে- “রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন”। আমি হারতে চাইনি। তাই আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস রপ্ত করে নিয়েছি। আমার পিতামাতা এভাবে আমাকে গড়ে তুলেছেন। ভদ্রতা দিয়ে মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারে। মহাত্মা গান্ধির ভাষায় বলতে পারি : In gentle way, you can shake the world. রাগ পোশাকের নিচে লুকিয়ে থাকা বিষধর সাপের মতো। এটি পরিহার করতে পারলে নিরাপত্তা ও শান্তি দুটোই বহুলাংশে নিশ্চিত হয়ে যায়। আমি বলি, রাগ একধরনের নিছক পাগলামী। তাই রাগকে সংযত করে চলাই মনুষ্যত্বের পরিচয়।


ষাটের দশকে গ্রামীণ মনের নির্ভেজাল স্নেহ, হৃৎটান, ধর্মবোধ ও সম্প্রীতি ছিল আমার বেড়ে ওঠার আবহ। আমার পরিবারের সবাই ছিলেন ধর্মপ্রাণ। ঐকান্তিক উদারতার প্রমুগ্ধ আতিথেয়তা ছিল আমার পরিবারের অবিচ্ছেদ্য পরিবেশ। মুরব্বিদের প্রতিটি পদক্ষেপ গভীরভাবে নিরীক্ষণ করতাম। সবার ভালো দিকগুলো আমাকে আকৃষ্ট করত। এভাবে আমি গভীর পর্যবেক্ষণে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। আমার অস্থিমজ্জায় পারিবারিক ঐতিহ্য-আদর্শ সম্পূর্ণভাবে নিজের হয়ে হৃদয়ে নির্ভীক স্পন্দন সৃষ্টি করে। এ স্পন্দন ছিল মানুষকে জানার, দেশকে ভালবাসার, গুরুজনদের শ্রদ্ধার এবং প্রকৃতিকে মহিমায় গ্রহণ করার।


আমি কখনও এ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। এসবকে ঘিরে আমার সত্তা আপন গতিতে আবর্তিত হয়েছে। বেরিয়ে আসতে না-পারাকে আমি এখনও সৌভাগ্যের বলে মনে করি। তবে এটাকে পশ্চাদপদতা বলার কোনো অবকাশ নেই। শেঁকড়ে লেগে থাকা যেমন উন্নয়ন নয় তেমনি শেঁকড় উপড়ে ফেলাও প্রগতি নয়। দুটোর মাঝে সমন্বয়কে আমি নিজের, জাতির, সর্বোপরি, বিশ্বের জন্য সর্বোচ্চ কল্যাণময় মনে করি। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণাতেও এটি প্রতীয়মান হয়েছে। নইলে কেন বিশ্ব এখনও তার অতীত ঐতিহ্যগুলোকে টিকিয়ে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টায় মগ্ন!


অভ্যাস, পরিবেশ ও চেতনা মানুষের সহজাত প্রত্যয়। এ তিনটি প্রতীতি মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধায়ক। মূলত এ তিনটি প্রত্যয়ই মানুষের নিয়ন্ত্রক। প্রত্যেকের জীবনে এগুলোর প্রভাব যেমন ব্যাপক, তেমনি অপ্রতিরোধ্য।


আর একটি কথা না বললে নয়- গত শতকের ষাটের দশকের কথা। তখন গ্রামে ধর্মীয় কুসংস্কার ছিল প্রবল। এখনকার মতো এত বৈশ্বিক যোজনার সমন্বিত যোগাযোগ ছিল না। দেশ ছিল পরাধীন। এখনও যে কুসংস্কার নেই তা নয়। আমার পরিবার প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষায় ঋদ্ধ ছিল। তাই তারা ছিল জাগতিক কুসংস্কার থেকে বহুলাংশে মুক্ত। ফলে ধর্ম আমাকে উদার করেছে, সংকীর্ণতা দিতে পারেনি। আমি ধর্মকে মর্মমূলে লালন করেছি বিকাশের মুগ্ধতায়। ধর্ম ছিল আমার সযত্ন অভিলাষের প্রসন্ন চয়ন। আগুনের আবিষ্কার মানবসভ্যতার প্রথম সূচনা। আগুনই মানুষকে গুহা হতে আধুনিক বিজ্ঞানময় বিশ্বের মহীয়ান আসনে আসীন করেছে। আবার এ আগুনের অপরিকল্পিত ব্যবহারই নিয়ে আসে মারাত্মক দুর্যোগ। প্রত্যেকটি বিষয়ের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য। আমি ধর্মকে উত্তমরূপে ব্যবহার করেছি, ঠিক আগুনকে যথাযথ ব্যবহারের মতো নিষ্ঠা আর সতর্কতায়। তাই কুসংস্কার নামের কোনো ভ্রান্তি আমার চেতনাকে কলঙ্কিত করতে পারেনি। ইসলাম মানবতার ধর্ম। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান নিজের ধর্ম যথাযথভাবে পালন করে, অন্যের ধর্ম পালনে কখনো বাধা দেয় না।


অভ্যাস, পরিবেশ ও চেতনা মানুষের সহজাত প্রত্যয়। এ তিনটি প্রতীতি মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধায়ক। মূলত এ তিনটি প্রত্যয়ই মানুষের নিয়ন্ত্রক। প্রত্যেকের জীবনে এগুলোর প্রভাব যেমন ব্যাপক, তেমনি অপ্রতিরোধ্য। অবহেলার সাধ্য নেই। ব্যক্তির ওপর এসবের প্রভাব রাষ্ট্রীয় প্রভাবের চেয়ে অনেক বেশি। এর সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত হয় পেশা। পেশা মানুষের অভ্যাস, পরিবেশ ও চেতনাকে ইতিবাচকতায় ধাবিত করার নিখুঁত ও অব্যর্থ অস্ত্র। তাই সভ্য সমাজে পেশা অগ্রগতির ধারক।


প্রত্যেক পেশার মানুষ কিছু সাধারণ অভ্যাস ও চেতনার ধারক। একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ তাকে লালন করে, ঐ পরিবেশের মধ্যে তাকে অতিবাহিত করতে হয়। একজন ব্যবসায়ী যখন রাজনীতিবিদ হয়ে যায় কিংবা একজন শিক্ষক যখন ব্যবসায়ী হয়ে যায় তখন তার আচরণ এবং ব্যবহারে অনিবার্য কিছু পরিবর্তন আসে। পেশা ক্রমাগত অস্থিমজ্জায় মিশে চিন্তা-চেতনাকে একাকার করে দেয়। এজন্য সমাজবিজ্ঞানীরা পেশা দিয়ে মানুষের চরিত্র ও আচরণগত সমীকরণ টানার প্রয়াস নেন। এটি বহুলাংশে বৈজ্ঞানিক। তাই সমাজ-গবেষণাকেও এখন সমাজবিজ্ঞান নামে অভিহিত করা হয়।


সততা ছিল আমার মূলধন, নিষ্ঠা ছিল আমার দক্ষতা আর শ্রম ছিল আমার প্রেরণা। এ তিনের সমন্বয় আমাকে, আমার ব্যবসায়কে প্রত্যাশিত লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। আমার ব্যবসায় লাভের মুখ দেখে। কিন্তু আমার প্রয়োজন ছিল সামান্য। ব্যবসায় আসার পর যা আয় হয়েছে তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি।
বাকি অর্থ দিয়ে কী করব? বাবা-মায়ের কাছে জানতে চাইলাম। বাবা বললেন, এলাকার গরিবদের জন্য কিছু করো। মা বললেন- শিক্ষা প্রসারের জন্য ব্যয় করো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আমরা নারীরা লেখাপড়া করতে পারিনি। তুমি মেয়েদের লেখাপড়ার পথ সুগম করার জন্য কিছু করো। মায়ের কথা সেদিন রাখতে না পারলেও পরবর্তীকালে রেখেছিলাম। মায়ের প্রত্যাশার শ্রদ্ধা- আমার প্রতিষ্ঠিত ‘শেখ হাসিনা একাডেমী অ্যান্ড উইমেন্স কলেজ’, যা গুণগত শিক্ষার মান বিবেচনায় ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে জাতীয়করণ করা হয়েছে।


বাবা-মায়ের নির্দেশে ও আমার স্বতঃস্ফূর্ত তাগিদে নজর দিলাম এলাকার প্রতি। গরিব-দুঃখীদের প্রতি। তখন ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ এবং আমি সাতাশ বছরের টগবগে যুবক। তবু আমি যৌবনকে বিপথে হারাতে দিইনি। একটি পয়সাও অবৈধ পথে কিংবা অশালীন কাজে কখনও খরচ করিনি।


আমার এলাকার দিকে নজর দিয়ে আমার অন্তর ও যৌবনের সব উদ্দামতা সবুজ নিগড়ে জনকল্যাণের কোলে টেনে নিয়েছিল। আমিও সানন্দে এগিয়ে গিয়েছিলাম এলাকার কল্যাণে, এলাকার উন্নয়নে। ওই জনপদে আমার মা, বাবা, ভাইবোন। ওখানে আমার পায়েচলা পথ, গুবাক তরুর সারি। স্কুল ছিল না, স্কুল হলো। কলেজ ছিল না, কলেজ হলো। রাস্তা ছিল না, রাস্তা হলো। বিদ্যুতের আলো ছিল না, আলো এলো। এভাবে নিজের অজান্তে এলাকার জনগণের কাছাকাছি চলে এলাম অবলীলায়।


রাজনীতি- সে অনেক পরের ঘটনা। ভালোই চলছিল ব্যবসায়, বেশ প্রশান্তিতে ছিলাম জনসেবায় নিমগ্ন থেকে। কিন্তু বিধাতা হয়তো তা চাইছিলেন না। তিনি আমাকে রাজনীতিতে টেনে আনেন। ঘটনাটা আকস্মিক নয়, তবে নাটকীয়। জীবনের প্রতিটি মোড়-পরিবর্তনকারী ঘটনা নাটকীয়ই হয়।


রাজনীতিতে আসার পর আমার চেতনায় নতুন একটি মাত্রা যোগ হয়। আগে জনসেবা ছিল আমার নেশা ও আনন্দ। এখন যুক্ত হয় কর্তব্যবোধ। তিনটির সমন্বয় আমাকে জনসেবায় অদম্য করে তোলে। জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছেন, তাদের ভালবাসা দিয়েছেন। প্রতিটি ভোট প্রতিটি মানুষের ভালবাসা; শুধু ভালবাসা নয়, ভালবাসার দুর্লভ আমানত। আমার কর্তব্য বেড়ে যায়, বেড়ে যায় দায়িত্ব। প্রতিটি ভোটার আমার পরিবারের সদস্য হয়ে যায়।


প্রতিটি ভোট প্রতিটি মানুষের ভালবাসা; শুধু ভালবাসা নয়, ভালবাসার দুর্লভ আমানত। আমার কর্তব্য বেড়ে যায়, বেড়ে যায় দায়িত্ব। প্রতিটি ভোটার আমার পরিবারের সদস্য হয়ে যায়।


পরিবার-প্রধানের লক্ষ্য, পরিবারের সদস্যবর্গের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা এবং আর্থসামাজিক নিরাপত্তা বিধান করা। আমি সংসদ সদস্য থাকাকালীন আমার সম্মানিত ভোটারগণের মৌলিক চাহিদা ও আর্থসামাজিক নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে নিজেকে নিবেদিত করার মাধ্যমে আমার নির্বাচনি এলাকার জনগণকে পরিবারের সদস্য হিসাবে বিনি সুতোর মালায় একীভূত করে নেওয়ার অনুপ্রেরণা পাই। এভাবে আমি অগ্রসর হয়েছি। মানুষের কল্যাণে কাজ করেছি।  সংসদ সদস্য না হয়েও এখনও তাদের সাথে আমার অন্তরের বন্ধন আছে- তা কখনও ছিন্ন হবে না।  -ইনসাল্লাহ।


ডাসার, কালকিনি- মাদারীপুর আমার জন্মস্থান। এ সংসদীয় এলাকা থেকে আমি পর পর চার বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিরল সম্মানে ভূষিত হয়েছি। গর্বিত হয়েছি মুগ্ধকর সম্মানে। তাই ডাসার-কালকিনি- মাদারীপুর এবং এর জনগণ উভয়ে আমার গর্ব, আর শাশ্বত অহঙ্কারের নির্মল অনুভব। এলাকার উন্নয়ন আমার স্বপ্ন। আমার চিন্তা-চেতনা ও কর্ম-ভাবনা সব ডাসার-কালকিনি- মাদারীপুরকে ঘিরে সারাদেশের জন্য আবর্তিত। আমার এই এলাকা- আমার সুখ, আমার শান্তি।


আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতামাতাসহ পুণ্যবান পূর্বপুরুষগণ ডাসার-কালকিনি- মাদারীপুর-এর মাটিতে শুয়ে। তাই ডাসার-কালকিনি- মাদারীপুর আমার অস্তিত্বের কেন্দ্র। আমি চাই আমার এলাকা নন্দিত সৌকর্য আর মায়াবী মাধুর্যের প্রশান্তিময় শান্তিতে অমিয় নীড়ের স্বর্গ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাক, সমৃদ্ধ হোক বর্ণিল মহিমার অনন্ত সৌহার্দ্য, ভরে উঠুক চিরন্তন উৎসবের প্রাণোচ্ছল আনন্দে। আমার স্বপ্ন আমার এলাকা এমন একটি জনপদরূপে প্রতিষ্ঠা পাক, যেখানে নিরক্ষরতা থাকবে না; থাকবে না ক্ষুধা, দারিদ্র্য, সন্ত্রাস এবং অনাচার। আমার প্রত্যাশা- এ এলাকার সমৃদ্ধ যোগাযোগ, ঋদ্ধ পরিবেশ, গুণী মানুষ এবং মানবসম্পদের আকর্ষণীয় উন্নয়ন। আমার এলাকাই হবে শিক্ষার বিমূর্ত প্রতীক, মানবিক মূল্যবোধে প্রাগ্রসর, বিদগ্ধতায় অবিনশ্বর। এখানে থাকবে আদর্শ ও যুগোপযোগী শিক্ষা; প্রতিটি নারী ও প্রতিটি পুরুষ সত্যিকার মানুষ হিসাবে গড়ে উঠবে। সৎ ও দক্ষ কর্মী হয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত থাকার পরিপূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করবে।


১৯৯১-এর আগে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও আর্থসামাজিক চিত্র ছিল ভয়াবহ। এলাকাটি সন্ত্রাসের জনপদ হিসাবে পরিচিত ছিল। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের প্রথমদিকে এলাকার একটি কাজে তৎকালীন আইজিপির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। তিনি আমার বাড়ি ডাসার-কালকিনি- মাদারীপুর শুনে আঁতকে উঠেছিলেন- এটি খুব প্রত্যন্ত এলাকা, সন্ত্রাসী জনপদ। আইজিপির কথায় কষ্ট পেলেও প্রতিবাদ করতে পারিনি। সেসময় আমার এলাকার সড়কে-নৌপথে, ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপত্তা ছিল না। খুন-খারাবি ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। পশ্চাৎপদ ডাসার-কালকিনি- মাদারীপুরের যোগাযোগব্যবস্থা ছিল ভীষণ নাজুক। উন্নয়নবঞ্চিত এবং মারাত্মকভাবে অবহেলিত নির্বান্ধব জনপদটির দেখ্ভালের কেউ ছিল না। আমি এলাকার সন্তান হিসাবে, আমার সুন্দর স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে উন্নয়নের কাজ শুরু করি। আমি বিশ্বাস করি, মানুষকে সভ্য করার, দেশকে উন্নত করার এবং নিজের মর্যাদা ও গৌরব বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান পথ শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরীর চেয়ে মহৎ ও কল্যাণকর কাজ আর নেই। আমার চেষ্টা আর জনগণের সহায়তায় আজ প্রত্যন্ত ও অবহেলিত এ এলাকা আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার সাবলীল মুখরতায় যোজিত। সড়ক ও সেতুর বন্ধনে এলাকা সংযুক্ত হয়েছে আধুনিকতার বিশ্বায়নে। অন্ধকার জনপদে জ্বলছে আলো। সন্ত্রাস পুরোপুরি নির্মূল না হলেও একেবারে শূন্যের কাছাকাছি। স্কুল হয়েছে, কলেজ হয়েছে। সর্বজনীন শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।


এ ধারা যদি দেশের সব উপজেলায়, সব নির্বাচনি এলাকায় বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন অবধারিত। আমার প্রত্যাশা, আমার অনুভব এবং আমার স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটবে- বাংলাদেশ রূপান্তরিত হবে সোনার বাংলায়। জনগণের অধিকারকে কোনোভাবে কেড়ে নিলে, জনগণ অধিকার বঞ্চিত হলে পক্ষান্তরে দেশই বঞ্চিত হবে।


আমার শক্তি সততা। মর্মে রয়েছে আমার মানুষের প্রতি ভালবাসা, কর্মে নিষ্ঠা এবং ধর্মে অবিচল একাগ্রতা। প্রত্যেক শিশু নিষ্পাপ হয়ে জন্মায়। নানা কারণে সে পাপী হয়ে যায়, পাপী হতে বাধ্য হয়। এজন্য ব্যক্তির চেয়ে সমাজ কম দায়ী নয়। তাই আমি পাপীকে ঘৃণা করি না, পাপকে ঘৃণা করি। পাপীর চেতনা হতে ঘৃণার্হ পাপ দূরীভূত করা গেলে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষটাও উৎকৃষ্ট হয়ে উঠতে পারে। নিজাম ডাকাত-সহ পৃথিবীর বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনিতে এমন শত শত উদাহরণ রয়েছে। আমি যা বলি এবং বিশ্বাস করি- ঠিক ওটাই কর্মে প্রতিফলন করার চেষ্টা করি। সাধুর ভাণ করি না, সাধুর চিন্তা ও কর্ম বাস্তবে প্রতিফলন করে নিজের নিষ্ঠাকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রাণন্তকর চেষ্টা করি।

আগামীকাল থাকছে ‘আদর্শ জীবন গঠনে মূল্যবোধ’ চোখ রাখুন Gonews24.com এ ।