৫ কার্তিক ১৪২৪, শুক্রবার ২০ অক্টোবর ২০১৭ , ১:০২ অপরাহ্ণ

মেয়েটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ


গো নিউজ২৪ আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সোমবার
মেয়েটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেডে হাঁসি মুখে নুর নাহার

নুর নাহারের বয়স ৯ বছর। বাড়ি পাবনার বেড়া উপজেলার কাপাসডাঙ্গা মণ্ডলপাড়া গ্রামে। পড়াশুনায় অত্যান্ত মেধাবী হলেও তাঁর মুখে ছিল না হাসি। কারন তাঁর সাথে সমবয়সীরা খেলতো না। খেলবে কি ভাবে তাকে দেখলেইতো সবাই ভয় পেত। তাই তাঁর বয়সী বাচ্চারা সবাই যখন খেলতো সে মলিন মুখে ঘরে বসে থাকতো। এ ভাবেই কেটেছে তাঁর ৯টি বছর। তবে এবার হাসি ফুটেছে নুর নাহারের মুখে। যে দুঃসহ যন্ত্রণা সে এতোদিন বয়ে বেড়িয়েছে তা তাঁর শরীর থেকে কেটে ফেলে দেয়া হয়েছে। আজ সকালে সুস্থ শরীরে সে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে নিজ বাসার উদ্দ্যেশে যাত্রা করেছে। এ যেন তাঁর নব জীবনের যাত্রা।

ফুটফুটে এই মেয়েটির জন্ম থেকেই কোমরের নিচে (পেছনের অংশে) একটি টিউমার ছিল। শুরুতে ছোট থাকলেও দিন দিন তা বেড়ে হয়েছিল বেশ বড় আকৃতির। এ কারনে সে কখনো ঠিকমতো বসতে পাড়তনা। এই অবস্থাতেও সে তাঁর লেখাপড়া ঠিকমতো চালিয়ে গেছে। সে স্থানীয় সিন্দুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। তাঁর বাবা সিদ্দিক মণ্ডল একজন হতদরিদ্র কৃষক যিনি অন্যের ক্ষেতে নিজের শ্রম বিক্রী করতেন। কয়েক শতক জমির ওপর বাড়িটিই ছিল তাদের একমাত্র সম্বল। অন্যের জমিতে চাষ করেই চলত তাদের পাঁচ সদস্যের পরিবারের ভরনপোষন।

 নুর নাহারের জন্মের পর থেকে তার কোমরের নিচে (পেচনের অংশে) ছোট একটি টিউমার ধরা পড়ে। বড় হওয়ার সাথে সাথে টিউমারও বড় হতে থাকে। তিন বছর বয়সে প্রথমে পাবনার হামিদা ক্লিনিকে তাকে ডাক্তার দেখানো হয়। পরে কাশিনাথপুরের স্থানীয় একজন ডাক্তারকেও দেখানো হয়। তখন সবাই বলছে, এ টিউমার অপারেশন করা যাবে না। করলে মেয়ে বাঁচবে না। আর এর ফলে তারা আর কোন ডাক্তারকে মেয়েটিকে দেখায়নি। কেউ কেউ ঢাকায় নিতে বললেও টাকা না থাকায় তারা মেয়েটিকে ঢাকায় নিতে পারেনি।

নুর নাহারের কোমড়ের পিছনের টিউমার

 

এই মেয়েটিকে নিয়েই গত ২২ জানুয়ারী, ২০১৭ তে একটি অন লাইন নিউজ পত্রিকায় একটি খবর বের হয় যার শিরোনাম ছিল '২০ হাজার টাকা হলেই সুস্থ হয়ে উঠবে নুর নাহার'। কারন ঐ দিন মেয়েটিকে নিয়ে ঐ পত্রিকার প্রতিবেদক পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. সিরাজুল ইসলামের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে নুর নাহারকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন ও এক্স-রে করে দেখেন ডা. সিরাজুল ইসলাম।  তিনি জানান, নুর নাহারের টিউমারটি জন্মগত। মেডিকেলের ভাষায় একে ‘সেক্রো কক্সিজিয়াল টেরাটোমা’ বলা হয়। মেরুদণ্ডের নার্ভের সঙ্গে সংযোগ থাকতে পারে টিউমারটির। তাই অপারেশনে একটু ঝুঁকি আছে। তারপরও অপারেশন করা সম্ভব এবং রোগী সুস্থ হবে। তিনি আরও জানান, এ অপারেশন ঢাকা অথবা রাজশাহীর যেকোনো সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করা যাবে। সেখানে অপারেশনের জন্য কোনো খরচ হবে না। শুধু ওষুধপত্রের জন্য ৬/৭ হাজার টাকা খরচ হবে। সব মিলে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা লাগবে।

হৃদয়কাড়া এই নিউজটি এই প্রতিবেদক তাঁর ফেসবুকের ওয়ালে শেয়ার করলে নুর নাহারের সহযোগীতায় এগিয়ে আসার জন্য বেশ কয়েকজন আগ্রহ দেখান। তাদের সহযোগীতায় মেয়েটিকে পাবনা থেকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় চিকিৎসার জন্য। এ ক্ষেত্রে সহযোগীতা করেন জাগোনিউজ পত্রিকার সাংবাদিক সোহাগ ভাই। ২৯ জানুয়ারী মেয়েটিকে ঢাকা নিয়ে এসে পিজি হাসপাতালের বহির্বিভাগে দেখানো হয়। ৩১ জানুয়ারী মেয়েটিকে ভর্তী করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সি-ব্লকের ৫ম তলায় শিশু সার্জারী বিভাগের ১৪ নম্বর বেডে। সেখানে শিশু সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডঃ গাজী জহিরুল হাসানের তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়।  বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরিক্ষার পর গত ১১ ফেব্রুয়ারী মেয়েটির দেহে সফল অস্ত্রপাচারের মাধ্যমে বৃহৎ আকৃতির টিউমারটি কেটে ফেলে দেয়া হয়। এর ফলে মেয়েটির মুক্তি মেলে দীর্ঘ ৯ বছরেরে যন্ত্রণা থেকে। হাসপাতাল থেকে জানানো হয়েছে মেয়েটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। তবে ২ সপ্তাহ পরে একবার এসে হাসপাতালের বহির্বিভাগে দেখিয়ে নিয়ে যেতে বলেছে।

বাবার সাথে হাস্যোজ্জল নুর নাহার

 

দীর্ঘ ১ মাস এখানেই চিকিৎসা চলে মেয়েটির। মেয়েটি এখন সুস্থ হয়ে হাটা চলা করতে পারছে। চোখে মুখে খেলছে দুষ্টুমির হাসি। একই ভাবে হাসি ফুটেছে এই হতদরিদ্র পরিবারটির মুখেও। আজকে তাই হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে রওনা হয়েছে নিজের আপন নিবাস পাবনার বেড়া উপজেলার কাপাসডাঙ্গা মণ্ডলপাড়া গ্রামে। মেয়েটির চিকিৎসার পর প্রায় ৪০ হাজার টাকা বেচে যায়, যা এই হতদরিদ্র পরিবারটির হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। এই টাকা দিয়ে তারা একটি দুগ্ধদানকারি গাভী কিনবে যা দিয়ে চলবে মেয়েটির পড়াশুনা। যা দিয়ে মেয়েটি দেখবে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। মেয়েটির পরিবারের পক্ষ থেকে মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট শুকরিয়া এবং তাকে সহযোগীতা করার জন্য সকলের নিকট কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।

গো-নিউজ২৪/বিএস

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত