৫ আশ্বিন ১৪২৪, বুধবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ , ৫:০৪ অপরাহ্ণ

মরমী ভাবসাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ


গো নিউজ২৪ আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০১৬ মঙ্গলবার
মরমী ভাবসাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ

বাউল সম্রাট লালন শাহের নাম জানেন না, গান শোনেননি দেশে এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। আত্মতত্ত্বে রচিত ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’ গানটির মাঝে পাওয়া যায় তার অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ।

মরমী ব্যঞ্জনা ও শিল্পগুণসমৃদ্ধ, সহজ-সরল শব্দময় তার গানে মানবজীবনের রহস্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে ওঠে।

ধর্ম-গোত্র-বর্ণ-সম্প্রদায় সম্পর্কে খুব সংবেদনশীল ছিলেন এই বাউল। ব্রিটিশ আমলে যখন হিন্দু-মুসলমান বিভেদ বাড়ছিল তখন লালন ছিলেন এর বিরূদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তিনি মানুষে-মানুষে কোনও ভেদাভেদে বিশ্বাস করতেন না।

এরকম বহু আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, গুরু-মুর্শিদতত্ত্ব, প্রেম-ভক্তিতত্ত্ব, সাধনতত্ত্ব, মানুষ-পরমতত্ত্ব, আল্লা-নবীতত্ত্ব, কৃষ্ণ-গৌরতত্ত্ব ছাড়াও নানা বিষয়ে গানের রচয়িতা ফকির লালন শাহ, যাকে বাউল সম্রাট বলা হয়।

লালন শাহ মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক , দার্শনিক ও একই সাথে অসংখ্য গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। অত্যন্ত সাধারণ পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি তবে তার জন্ম এবং বংশপরিচয় দুটোই এক রহস্যের জালে বন্দি।

লালনের জন্ম তারিখ, বছর, জাত বা সম্প্রদায় নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। লালন নিজে কখনও তা প্রকাশ করেন নি। কিছু সূত্রে পাওয়া যায় লালন ১৭৭২ মতান্তরে ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ড উপজেলার হারিশপুর গ্রামে জন্ম নেন।

জানা যায়, লালন জন্মের আগেই বাবাকে হারান। জন্মের পাঁচ কি ছয় বছর বয়সে তার মাও মারা যান। এদেশের গরিব অনাথ ছেলেমেয়েদের জীবন যেভাবে কাটে, হয়তো তেমনি অবহেলা আর অনাদরে কোনো আত্মীয়ের আশ্রয়ে কেটেছিল লালনের শৈশব-কৈশোর।

যৌবনে লালন ভাড়ারা গ্রামের একদল তীর্থযাত্রীর সঙ্গে নবদ্বীপ যাত্রা করেন। পথেই তার বসন্ত রোগ হলে সঙ্গীরা তাকে পথেই ফেলে রেখে চলে যায়। ওই অবস্থায় মৃত্যুপথযাত্রী লালনকে তুলে নিয়ে যান মলম কারিগর নামে ছেঁউড়িয়া গ্রামের এক মুসলমান ব্যক্তি। মলম শাহ এবং তার স্ত্রী মতিজান তাকে আশ্রয় দেন এবং সুস্থ করে তোলেন।

মলম শাহ তাকে নিজ ধর্মে শিক্ষা দেন এবং ধর্মীয় শিক্ষার জন্য সিরাজ সাঁই নামের একজন ফকিরের কাছে পাঠান। মলম কারিগর নিজেও ছিলেন সিরাজ সাঁইয়ের শিষ্য।

লালন নিজেও পরে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়াতে একটি আখড়া তৈরি করেন, যেখানে তিনি তার শিষ্যদের শিক্ষা দিতেন, যা মূলত ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষা। শিষ্যরা তাকে সাঁই বলে সম্বোধন করতেন।

চট্টগ্রাম, রংপুর, যশোর এবং পশ্চিমে অনেক দূর পর্যন্ত বাংলার বিভিন্ন জায়গায় বহু লোক লালনের শিষ্য ছিলেন। শোনা যায় তার শিষ্যের সংখ্যা ছিল প্রায় দশ হাজারের মতো।

তিনি প্রত্যেক শীতকালে একটি ভান্ডারার (মহোৎসব) আয়োজন করতেন। সেখানে হাজারও শিষ্য একত্র হতেন এবং সংগীত ও আলোচনা হতো।

এছাড়া লালন সংসারী ছিলেন বলেও জানা যায়। তার সামান্য কিছু জমি ও ঘরবাড়ি ছিল। তার দীর্ঘ সাধনায় নিজস্ব প্রেম, ভক্তি ও সন্ধানের দর্শন রেখে গেছেন। গুরুবাদী এই সাধনায় রয়েছে মানুষ ভাগ, দেহ ভাগ এবং আত্মা ভাগ।

আধ্যাত্মিক ভাবধারায় লালন প্রায় দুই হাজার গান রচনা করেছিলেন। তিনি ছিলেন নিরক্ষর মানুষ অথচ তার গানের ভাব-ভাষা এমন ছিল, আজও তার আবেদন এতটুকু কমেনি।

১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ১১৬ বছর বয়সে এই মরমী ভাবসাধক মারা যান। ১৬ অক্টোবর ছিল এই সাধকের ১২৬ তম মৃত্যু বা তিরোধান দিবস।

ছেঁউড়িয়ার আখড়াতেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়। মৃত্যু এই মরমী সাধককে তার ভক্তের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। দিনটিকে স্মরণ করতে হাজার ভক্তের সমাবেশে লালনের আখড়া থাকে জমজমাট।

গো নিউজ২৪/এএফপি