২ ভাদ্র ১৪২৪, বৃহস্পতিবার ১৭ আগস্ট ২০১৭ , ৯:৪১ পূর্বাহ্ণ

ভারতে মানুষের ওপর বন্যপ্রাণির আক্রমণ কেন বেড়েই চলেছে?


গো নিউজ২৪ | আন্তর্জাতিক ডেস্ক আপডেট: ১২ আগস্ট ২০১৭ শনিবার
ভারতে মানুষের ওপর বন্যপ্রাণির আক্রমণ কেন বেড়েই চলেছে?

ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসরত ‘পাহাড়িয়া’ উপজাতির সদস্যরা এখন আর একটি রাতও ঘুমিয়ে কাটাতে পারেন না। কয়েক মাস আগে একটি বন্য হাতির আক্রমণে নিহত হয়েছে সেখানকার ১৫ জন মানুষ। সবাইকে পায়ের নিচে পিষে মেরেছে হাতিটি। একই অবস্থা দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য উত্তরপ্রদেশে। সেখানে আছে বাঘের ভয়।

স্থানীয় পিলিবিথ বাঘ সংরক্ষণাগারের আশপাশের গ্রামগুলোর বাসিন্দারাও ঘুমাতে পারেন না রাতে। এক সপ্তাহের মধ্যে তিনজনকে কামড়ে মেরেছে মাঘ। গত বছরের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ওই সংরক্ষণাগারটির আশপাশের এলাকায় বাঘের হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছে।

উত্তরপ্রদেশের বন বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ভিকে সিং বলেন, ‘বাঘটিকে শান্ত করে সেটিকে সংরক্ষণাগারে ফেরত পাঠাতে আমরা কয়েকটি টিম পাঠিয়েছিলাম। আমরা বুঝি যে জনগণ খুবই ভয়ে থাকে। কিন্তু এটা চ্যালেঞ্জিং।’

এমন আরো অসংখ্য ঘটনা আছে ভারতের দক্ষিণ এবং পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে। বিশেষ করে যেসব জায়গায় প্রাণি সংরক্ষণাগার অবস্থিত। শুধু বনাঞ্চলগুলো নয়; আশপাশের ছোট শহরগুলোতে বাড়ছে চিতাবাঘের মতো বন্যপ্রাণিদের আক্রমণ। ভারতের পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ২০১৪ সালের এপ্রিল মাস থেকে ২০১৭ সালের মে মাস পর্যন্ত দেশটিতে হাতি এবং বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছে ১ হাজার ১৪৪ জন মানুষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিতা এবং অন্য প্রাণিদের আক্রমণে নিহতের হিসাবে আনলে এই সংখ্যা আরো বাড়বে।

আন্তর্জাতিক বন সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচারস’ (আইইউসিএন) টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান আলেক্সান্দ্রা জিমারম্যান বলেন, ‘প্রাণি সংরক্ষণে একটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, মানুষ ও প্রাণিদের সংঘর্ষ। বিশেষ করে বড় আকারের প্রাণিগুলো।’

বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সত্তরের দশক থেকে বাঘ রক্ষায় ’প্রোজেক্ট টাইগার’ উদ্যোগ নিয়েছে ভারত সরকার। ঘোষিত অঞ্চলগুলোতে বাঘ সংরক্ষণ, শিকার না করার নির্দেশনা আছে এতে। ফলে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু তাতে বিপদে পড়েছে মানুষ। বিশ্বের মোট বাঘের তিনভাগের দুইভাগই বাস করে ভারতে। গত পাঁচ বছরে এই সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা সায়েন্স এশিয়ার পরিচালক কে উল্লাস কারানথ জানান, মানুষ এবং বন্যপ্রাণিদের মধ্যে সংঘাত বৃদ্ধির কারণ হিসেবে প্রাণি সংরক্ষণ প্রচেষ্টার সফলতার কথা বলা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘এটা ভারতের কিছু অঞ্চলের সমস্যা, যেখানে প্রাণি সংরক্ষণাগার আছে এবং বন্যপ্রাণির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।’

ভারতের তামিলনাড়ুতে অবস্থিত সাথিয়ামাঙ্গালাম বাঘ সংরক্ষণাগারটি ২০১৩ সাল থেকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর আগে বাঘের আবাস হিসেবে পরিচিত ছিল না এটি। বর্তমানে সেখানে আছে ২৫টি বাঘ। সংখ্যায় আরো বাড়ছে তারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্নাটকের মতো আশপাশের যেসব রাজ্যে বাঘের সংখ্যা বেশি, সেখান থেকে বাঘ এনে এই সংরক্ষণাগারে রাখা যায়।

স্থানীয় গ্রামের বাসিন্দারা জানান, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট এবং নদীতে আগের চেয়ে অনেক বেশি বাঘ দেখতে পান তারা। এখানে বন্যহাতির হামলা বেড়েই চলেছে। কিন্তু স্থানীয়রা বেশি উদ্বিগ্ন বাঘ নিয়ে।

এশিয়ার ৬০ ভাগ বাঘ বাস করে ভারতে। সংখ্যাটা ২৪ হাজার থেকে ৩২ হাজার হবে। ভারতে সবচেয়ে বেশি হামলা হয় বন্যপ্রাণির। বছরে এতে মারা যায় কমপক্ষে ৫০০ মানুষ। অন্য যেকোনো প্রাণির হামলার চেয়ে হাতির হামলায় মৃতের সংখ্যা এখানে অনেক বেশি। জিমারম্যান বলেন, ‘পুরনো রুটের বাইরেও হাতির চলাচল বেড়েছে। আর এ কারণে লোকালয়ে হামলার ঘটনাও বেড়েছে।’ হাতিদের চলাচলের করিডোর কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে- সে বিষয়ে আরো ভেবে দেখা দরকার বলেও মনে করেন তিনি।

কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রাণিদের বসবাসের স্থান ক্ষুদ্র হয়ে আসছে। ভারতের বর্তমান জনসংখ্যা ১২০ কোটি। দিন দিন তা বাড়ছে। এতে চাপ পড়ছে ভূমি, বাড়িঘর এবং কারখানার ওপর। কারনাথ বলেন, ‘যেহেতু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, তাই এসব প্রকল্পের ব্যাপারে আমাদের আরো সতর্ক হতে হবে। কিন্তু সরকার সেটা করছে না। সঠিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা ছাড়া তারা শুধু আর্থিক প্রকল্পের পেছনে ছুটছে। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়।’

গো নিউজ২৪/ আরএস