৩ মাঘ ১৪২৩, সোমবার ১৬ জানুয়ারি ২০১৭ , ১১:১২ অপরাহ্ণ

বইঃ আমার কথা

বৈশ্বিক সহায়তা


গো নিউজ২৪ আপডেট: ০৬ জানুয়ারি ২০১৭ শুক্রবার
বৈশ্বিক সহায়তা

সৈয়দ আবুল হোসেন বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘আমার কথা’। এই বইয়ে তিনি নিজের চিন্তা, কর্মকাণ্ড, মূল্যবোধ, নানা অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখেছেন। এটি পড়লে তাকে যারা পুরোপুরি চিনেন না তাদের সুবিধা হবে। বইটি ‘gonews24.com’ ধারাবাহিকভাবে ছাপছে। বইটির আজকের পর্বে থাকছে- ‘বৈশ্বিক সহায়তা’

আমাদের দেশের আরেকটি গর্বিত রেকর্ড হচ্ছে- বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সাহায্যের জন্য বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি প্রেরণ। এদের মধ্যে এমন অনেক আছে, যারা বিভিন্ন দেশে গিয়ে নিপীড়নের শিকার হয়েছে বা আমাদের চেয়ে কম ভাগ্যবান হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। আমরা তাদের প্রতি জানাই সহানুভূতি ও শ্রদ্ধা।

১৯৭২ থেকে ২০১১ খ্রিস্টাব্দের জুন পর্যন্ত গত চার দশকে বাংলাদেশ মোট তিন লাখ ৯৬ হাজার ৯৩০ কোটি টাকার বৈদেশিক সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে ঋণ হিসাবে ২ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা এবং অনুদান বাবদ ১ লাখ ৭০ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। প্রকাশিত বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বাধীনতার পর প্রথম ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে মোট ২৭ কোটি ডলার ঋণসহায়তা পেয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে ৫৫ কোটি, ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে ৪৬ কোটি ডলার ঋণসহায়তা পেয়েছিল বাংলাদেশ।৯৬

সাধারণত খাদ্য, পণ্য ও প্রকল্প- এ তিন খাতে উন্নয়ন-সহযোগীরা ঋণসহায়তা দিয়ে থাকে। গত চার দশকে খাদ্যে ৪২ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা অনুদানসহ মোট ৪৮ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা পাওয়া গিয়েছে। চাল, গম ও ভুট্টা বাবদ এসব ঋণসহায়তা পাওয়া গিয়েছিল। পণ্য খাতে ৪১ হাজার ২৫১ কোটি টাকা অনুদানসহ মোট ৭৯ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা ঋণ পাওয়া গেছে। এছাড়া প্রকল্প-সাহায্য বাবদ গত চার দশকে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা পাওয়া গিয়েছে।৯৭

তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত চার দশকে উন্নয়ন-সহযোগী দেশ ও সংস্থা থেকে ৫ লাখ ১৪ হাজার ১৩৯ কোটি টাকার সহায়তা পাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের। এর মধ্যে ঋণ হিসাবে ৩ লাখ ২০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা এবং অনুদান হিসাবে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। কিন্তু প্রতিশ্রুতির চেয়ে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার কম বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান পেয়েছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ প্রতিশ্রুত প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার এখনও পাইপলাইনে রয়েছে।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবাসী কর্মীরা ৪১৪ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠাবেন বলে ধারণা করছে বিশ্বব্যাংক, যার মধ্যে বাংলাদেশে আসবে আনুমানিক ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। এই হিসাবে রেমিটেন্স আকর্ষণের দিক দিয়ে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের সপ্তম দেশ।৯৮ অভিবাসী-অধিকার নিয়ে নিউইয়র্কে চলমান জাতিসংঘ সম্মেলন উপলক্ষে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই থেকে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের জুন পর্যন্ত এক বছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ১ হাজার ৪৬০ কোটি ডলারের রেমিটেন্স দেশে পাঠিয়েছেন, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। আর ২০১১-১২ অর্থবছরে ১ হাজার ২৮৪ কোটি ডলারের রেমিটেন্স দেশে আসে।৯৯

১৯৯০-এর দশক থেকে ২০ বছরে বাংলাদেশিদের বিদেশে পাড়ি জমানোর হার বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। চলতি ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ১৪ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসী হয়েছেন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। এদের মধ্যে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ নারী। ২০০০ থেকে ২০১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা বছরে ২ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বেড়েছে, যেখানে ১৯৯০ থেকে ২০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ হার ছিল ১ দশমিক ১ শতাংশ। গত এক দশকে জীবিকার তাগিদে অথবা নিরাপত্তার জন্য সারাবিশ্বে মোট ২৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিয়েছে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৩ দশমিক ২ শতাংশ।১০০

বাংলাদেশে রেমিটেন্স আসে বিদেশ থেকে। এ বিষয়ে গর্ব করা আমাদের প্রথা ও নীতির বিরোধী, তবুও আমি এই অগ্রগতির অগ্রসর-ধারা ও পরিমাণ বর্ণনা করার প্রয়োজন অনুভব করছি। আমদের রেমিটেন্সের অগ্রগতি বিভিন্ন দেশ এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সামনে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশের নাগরিকরা জৌলুশপূর্ণ, বিলাসী ও আনন্দময় জীবনযাপন করে। তারা সারাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবনযাপন করেন না। অন্যভাবে বললে, আমরা সংবেদনশীল মানুষ। অন্যের দুঃখ-কষ্ট ও ব্যথা-বেদনা আমাদের স্পর্শ করে। আমরা তাদের ব্যথা দূর করতে ইতিবাচক অবদান রাখার চেষ্টা করি, তাদের সাহায্যের প্রয়োজনে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিই। এই পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং অসুস্থতা দূর করতে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছি। শান্তি প্রতিষ্ঠায় ও দেশের উন্নয়নে কাজ করে চলেছি।

আমরা কোনো প্রকার সংশয় ও দ্বিধা ছাড়া কোনো দেশকে সাহায্য করি ও দান করি। বিশ্বের যেকোনো দেশে নানা দুর্যোগে দুর্গত এলাকায় সাহায্য-সহযোগিতায় বাংলাদেশ তার সাধ্যমতো সহায়তা করে উদার হস্তে। নেপালসহ বিভিন্ন দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশ এগিয়ে গিয়েছে উদার মনোভাব নিয়ে। আমাদের বিশ্বাস, দানের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। আমরা যতটুকু সহায়তা দিই তা আর্থনীতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় কোনো প্রভাব ফেলতে না পারলেওÑ আমরা তাদের পাশে আছি এটাই বড় পাওয়া। কারণ আমাদের সামর্থ্য কম। তবে বাড়ছে দিনে দিনে। আর এই কারণে আগামী দিনেও তা বাড়বে।

আমরা কোনো প্রকার শর্ত ছাড়াই দান করে থাকি। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য মানবসেবা। আমাদের মানবসেবা করার পেছনে কোনো রাজনীতিক উদ্দেশ্য থাকে না এবং থাকে না কোনো ভৌগোলিক সীমা, জাতিগত দৃষ্টিভঙ্গি, সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মীয় ভেদাভেদ। সবার জন্যই কাজ করতে চাই আমরা- এটাই আমাদের পররাষ্ট্র নীতির মূল উদ্দেশ্য।

নিঃস্ব এবং অভাবগ্রস্ত ভাই ও বোনদের জন্য আমাদের সাহায্যের হাত বাড়ানোই থাকবে। আর তাঁরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন। আমাদের এই সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের জন্য। তাঁরা সবাই হয়তো নিজের সামর্থ্য বিবেচনা করেই কাজটি করবেন।