১৬ চৈত্র ১৪২৩, বৃহস্পতিবার ৩০ মার্চ ২০১৭ , ১০:৪৪ অপরাহ্ণ

বইঃ আমার কথা

‘সুখ ও শান্তি : আমাদের করণীয়’


গো নিউজ২৪ আপডেট: ০৬ জানুয়ারি ২০১৭ শুক্রবার
‘সুখ ও শান্তি : আমাদের করণীয়’

সৈয়দ আবুল হোসেন বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘আমার কথা’। এই বইয়ে তিনি নিজের চিন্তা, কর্মকাণ্ড, মূল্যবোধ, নানা অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখেছেন। এটি পড়লে তাকে যারা পুরোপুরি চিনেন না তাদের সুবিধা হবে। বইটি ‘gonews24.com’ ধারাবাহিকভাবে ছাপছে। আজকের পর্বে থাকছে ‘সুখ ও শান্তি : আমাদের করণীয়’।

আমি ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পর নিজে মনে মনে ভেবেছি- বিভিন্ন দেশের মানুষ কতটা বিভিন্নভাবে তাদের ভাবনা ভাবে, প্রকাশ করে। দেশভেদে মানুষের চিন্তা, আশা আর দর্শনের পার্থক্য আছে। কিন্তু যে যাই ভাবুক না কেন, স্থান ও ব্যক্তি নির্বিশেষে দেশপ্রেমিকদের ভাবনা সর্বত্র অভিন্ন ধারায় পরিচালিত এক সর্বজনীন চিন্তা। এ কারণে দেশপ্রেমিকদের চিন্তা-চেতনায় অনেক মিল লক্ষ্য করা যায়; হোক সেটি উন্নত বা অনুন্নত দেশ।

ওই শীর্ষ সম্মেলনে নিজের মনের কাছে নিজেই প্রশ্ন রেখেছিলাম : আমরা এখানে কেন?
 
এ ধরনের সভা ও সম্মেলনের উদ্দেশ্যই বা কী?

তখন উত্তর পাই, আসলে আমি যে অবস্থায় যখন যেখানেই থাকি না কেন, আমি দেশের উন্নয়ন চাই। দেশের উন্নয়ন মানে আমার উন্নয়ন, কারণ আমি দেশের একজন সাধারণ নাগরিক। সে চিন্তা আমাকে সুদূর চীনের বোয়াও ফোরামেও করতে হবে। আমি যদি এখান থেকে দেশের জন্য সামান্য কিছু হলেও নিয়ে যেতে পারি, সেটাই হবে আমার সার্থকতা, দেশের কল্যাণ আর মাতৃভূমির প্রতি আমার কর্তব্য পালন। আমাদের দেশের সরকারি সেবার মান আরও উন্নত করার জন্য, মানুষকে সুখ-শান্তিতে রাখার উপায় খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। আমি চাই প্রত্যেকে যেন সরকারের কাজকে বৃহত্তর পরিসরে দেখে এবং সরকারও যেন জনগণকে তার কাজে অংশীদার করার সুযোগ রাখে।

সরকারের ভুল থাকলে যেমন ধরিয়ে দিতে হবে, তেমনি সরকারকে সহযোগিতাও করতে হবে। সরকার ভালো কাজ করলে তার প্রশংসা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের প্রতিটি নাগরিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পরিমাত্রায় সরকারের এক-একটি অংশ। তাই কোনো নাগরিক তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না।

তাহলে সরকারের মূল কাজটা কী? 

জনগণ যখন দেখবে তারা সরকারের কাজের অংশীদার,  তখন প্রকৃতপক্ষে আমাদের সবার চিন্তা আরও অনেক বেশি প্রসারিত হবে। সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের জন্য চিন্তা করলে দেশের উন্নতি হবে। সবাই একসঙ্গে নিজের ও নিজ-পরিবারের এবং প্রতিবেশীর উন্নয়ন করলে দেশের উন্নয়ন হবে। দেশ এগিয়ে যাবে সমৃদ্ধির পথে। আমাদের কেবল নিজেকে নিয়ে ভাবলে হবে না। সবাইকে নিয়েই ভাবতে হবে। একজন মানুষ যখন কেবল নিজেকে নিয়ে ভাবে তখন অহংবোধ বেড়ে যায়। এ অবস্থায় নিজের একার ওপরে ওঠার ইচ্ছেটাই প্রবল হয়ে ওঠে। সে তখন একা হয়ে যায়, সামষ্টিক উন্নয়নের চিন্তা করতে পারে না। সেটা না করলে দেশের ও দশের উপকার হবে না। উন্নয়নও হবে না। নিজেও একাকীত্বের যাতনায় নিষ্পেষিত হবে। আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে ততকাল পিছিয়ে থাকব, যতকাল আমরা নিজের উন্নয়নের সঙ্গে সামষ্টিক উন্নয়নকে একীভূত করে জাতির কল্যাণে নিবেদিত হতে না-পারি। আমাদের সবাইকে চিন্তা করতে হবে- একটি উন্নত দেশ হিসাবে বিশ্বের মানচিত্রে নাম লেখাবার। সেটা লেখাতে হবে এবং এর অন্যতম উপায় হচ্ছে একতা, সংহতি আর সহমর্মিতা।

অনেকে মনে করেন, নিজের উন্নয়ন কি দেশের উন্নয়ন নয়?

সংকীর্ণ অর্থে তা ঠিক, কিন্তু প্রকৃত বিশ্লেষণে তা নয়। কারণ নিজের উন্নয়ন করতে গিয়ে অনেকে দেশ ও দশের স্বার্থকে ব্যাহত করে। কেবল তখনই নিজের উন্নয়ন দেশের উন্নয়নে রূপান্তরিত হবে, যখন ব্যক্তিস্বার্থ সামষ্টিক কল্যাণের লক্ষ্যে পরিচালিত হবে। আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই : আমরা সবাই একযোগে কাজ করলে দেশের উন্নতি হবে। সরকারের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাওয়া এবং তা সরকারকে যেকোনো মূল্যে করতে হবে। তবে সেটা যেন এমন না হয়- সব কাজ সরকার একাই করবে। শুধু সরকারকে দোষ দিলে হবে না। আবার শুধু সমালোচনার জন্য কিংবা বিরোধিতার জন্য শুধু কথা বললে, কটূক্তি করলে হবে না। সরকারের ভুল থাকলে যেমন ধরিয়ে দিতে হবে, তেমনি সরকারকে সহযোগিতাও করতে হবে। সরকার ভালো কাজ করলে তার প্রশংসা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের প্রতিটি নাগরিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পরিমাত্রায় সরকারের এক-একটি অংশ। তাই কোনো নাগরিক তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না।

কেউ যদি আমার কাছে জানতে চান- সরকারের প্রধান ও মৌলিক কাজ কী? 

আমার কাছে এ প্রশ্নের একটাই উত্তর। আমি সহজ-সরল নিরাভরণ ভাষায় দ্বিধাহীনচিত্তে বলব : সরকারের প্রধান ও মৌলিক কাজ হচ্ছে- জনগণের সুখ ও শান্তি অর্জনের লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে যাওয়া। মনে রাখতে হবে, দেশের ভার আল্লাহ তায়ালার নিকট থেকে আমানত। তাই সরকারের উচিত আমানতের খেয়ানত না করা। সুশাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা তাদের একমাত্র কাম্য হওয়া উচত। সরকারের যত কাজ সব জনগণের সুখ-শান্তির জন্য নিবেদিত হতে হবে। মূলত, সরকারের নিত্যদিনের কাজই হচ্ছে জাতির সার্বিক কল্যাণে নিবেদিত থাকা। সরকারের আর একটি কাজ হচ্ছে সমতার ভিত্তিতে সম্পদের যথাসম্ভব সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা- যা সামাজিক স্থিতিশীলতাকে একটা সাবলীল স্থায়ী রূপ দিতে পারে।

সরকার যখন মানুষের জীবনকে আরও সহজ এবং আরামদায়ক করার জন্য সরকারি সেবার মান বৃদ্ধিতে নিরলসভাবে কাজ করে যায়, মানুষের স্বস্তি ও সুখ বাড়াতে অবদান রাখে এবং মানুষের জন্য অবারিত সুযোগ ও কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারে, তখন সেটাই হবে সরকারের সুখ ও প্রাপ্তি। বেকারদের কর্মসংস্থান করতে পারলেই সরকারের আনন্দ। সরকার যখন সবচেয়ে ভালো শিক্ষাব্যবস্থাটা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয় এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে টেকসইভাবে বিনির্মাণ করার জন্য কাজ করে যায়, তখন সেটাই তাদের বড় অর্জন ও সফলতা। কারণ একটি শিক্ষিত জাতিই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে আগামীদিনের সোনালি প্রত্যাশার মহাসড়কে। ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে শিক্ষিত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

শিক্ষা ছাড়া উন্নতি সম্ভব হবে না। তবে কেবল পুঁথিগত শিক্ষাই বড় কথা নয়। পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষাও প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর জন্য নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধ মানুষকে সত্যের পথ দেখায়। সুনাগরিক ও সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। তাহলেই তারা আগামীদিনের সুনাগরিক হিসাবে গড়ে উঠবে। সেটা করা সম্ভব হলে প্রত্যেকে নিজের সঙ্গে সঙ্গে দেশের কল্যাণেও আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হবে- যা দেশের উন্নতিতে অবদান রাখবে। কিন্তু নৈতিকতা যদি না থাকে তাহলে কেবল উচ্চশিক্ষিত হলে হবে না। নৈতিকতাহীন ব্যক্তি পশুর মতো শুধু আত্মচিন্তায় মগ্ন থাকে। আত্মচিন্তায় মগ্ন ব্যক্তি কখনও অন্যের কল্যাণ করতে পারে না। যারা অন্যের কল্যাণ করতে পারে না, তারা কীভাবে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে?

আরও বলে রাখি, যখন সরকার একটি চমৎকার ও সর্বাধুনিক স্বাস্থ্যসেবার পরিবেশ তৈরি করে, সবসময় তা প্রত্যেক রোগীর জন্য প্রত্যাশিত সফলতার আনন্দ না-ও নিয়ে আসতে পারে। তবে সে যে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে এটাই তার প্রশান্তি এবং এ প্রশান্তিই সরকারের সাফল্য। এ মুহূর্তে সবার জন্য শিক্ষা পুরোপুরি নিশ্চিত করা তেমন সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামীদিনে যাতে হয় সে ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। এখন থেকে সে লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে। সরকারকেও আরও অধিক পরিমাণ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। আর একটি কথা, যখন সরকার ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়নে কাজ করে তখন দেশের উন্নতি হবেই। কারণ এটি মানুষের ভ্রমণ-সময় কমিয়ে দেয়। দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব হয়। কাজও বেশি করতে পারে। সেসঙ্গে অর্থবাণিজ্যের চাকাও দ্রুত ঘোরে এবং বিস্তৃত হয় সর্বস্তরে- যতটা সম্ভব। বাংলাদেশের মতো জনবহুল উন্নয়নশীল দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন খুব বেশি প্রয়োজন। অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিঃসন্দেহে জনগণের সুখ ও আরামকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা সতত দৃশ্যমান হয় এবং মানুষ গর্বের সঙ্গে বলতে পারে, দেখতে পারে এবং দেখাতে পারে।

আমি মনে করি, মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। যখন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন পুরো জাতি সন্তুষ্ট ও নিশ্চিন্ত থাকে। নিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই। ন্যায়বিচার না থাকলে কিংবা বিচারহীনতায় লাঞ্ছিত হওয়ার মতো কোনো শঙ্কা থাকলে মানুষের মধ্যে একটা অনাস্থার ক্ষেত্র তৈরি হয়। এমন অনাস্থা সরকারের জন্য কোনোভাবে সুখকর হয় না। এ কারণেই সরকারকে সবসময় এটা মনে রাখতে হবে, যেন দেশের আপামর জনসাধারণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। যেখানে এবং যে ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা দূর করা প্রয়োজন। সেবাখাতগুলোকে আরও জনকল্যাণমুখী করতে হবে। সবকিছুর পেছনে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে জরুরি। আমি সবসময় মনে করি- সরকার যে কাজই করুক না কেনÑ তা যেন মানুষের অন্তরে আনন্দ দেয়, মানুষ যেন বুঝতে পারে সরকার জনগণের জন্য কাজ করছে, সরকারের লোকজন জনকল্যাণে নিবেদিত। এমনটি দিতে পারা এবং করতে পারাই হচ্ছেÑ সরকারের সবচেয়ে বড় সফলতা এবং এটাই আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। 

সবচেয়ে উত্তম, কার্যকর ও সুন্দর সরকার খুঁজে বের করার জন্য কয়েক বছর পর পর সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে সম্মেলনের আয়োজন করা দরকার। তাহলে এর মাধ্যমে জনগণের কথাও শোনার সুযোগ হবে। সরকার তাদের মতামত নিতে পারবে। সরকারকে সবসময় এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে যে, সরকারের কাজ নিজের জন্য নয়, জনগণ ও দেশের জন্য- যা প্রকৃতপক্ষে নিজের চেয়েও অধিক। কারণ আমরা প্রত্যেকে সরকারের এবং দেশের অংশ। আমরা সুখী ও সমৃদ্ধ জনগণ চাই এবং আমরা আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের ভালো কাজে সহায়তা করেন।

এটাও আমি মনে করি যে, কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ কাজ-কর্মে, চিন্তা-চেতনায়, ধ্যান-ধারণায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে, কাজের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে, এমনকি মানুষের সঙ্গে আচার-আচরণের বেলায় নিজের মনমানসিকতাকে সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করে জনগণের সেবার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসবে। আমি মনে করি, কেবল তখনই সরকার তার সাফল্যকে আরও চমৎকারভাবে প্রয়োগ করতে পারবে। যখন সে উপলব্ধি করবে, হাজার হাজার মানুষের কল্যাণের জন্য, আনন্দের জন্য কাজ করে যাচ্ছে, তখন তার আত্মতুষ্টি ও নিজ কাজের গতি বহুগুণ বেড়ে যাবে। মানুষ তার প্রশংসা করবে, উদ্বেলিত করবে জয়গানে। যখন তারা জনগণের জন্য কাজ করে আনন্দ পাবে তখনই আসল উন্নতি হবে। এখন অনেকের মধ্যে কাজ করার ব্যাপারে ঢিলেঢালা ভাব রয়েছে। আবার অনেকের রয়েছে হতাশা, বঞ্চনার অভিযোগ। কেউ কেউ যথাযোগ্য বিবেচনাবোধ হতে বঞ্চিত এমনও মনে করেন। এসবও কাটানো দরকার। তারা জনগণের জন্য কাজ করবে অথচ তাদের সুবিধার বিষয়গুলো দেখা হবে না- এটা ঠিক হবে না। তারা সুস্থ থাকলে ও ভালো থাকলে অন্যের জন্য কাজ করতে পারবে। তারাই যদি সমস্যায় থাকে তাহলে সে সমস্যার বাইরে চিন্তাও করতে পারবে না। তার কাজও ভালো হবে না। 

যে নদী নিজেই গতিহীন সে নদী কীভাবে অন্যের তৃষ্ণা মেটাবে!

একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, বিভিন্ন বিষয় অহেতুক অগ্রাধিকার দেওয়া বা শাসকদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বহু প্রতিষ্ঠিত দেশ বা জাতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আমরা পরাধীনতার নাগপাশ থেকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি লাভের পর জনগণের সম্মিলিত প্রয়াসে তিল তিল করে অনেক এগিয়েছি। অবিরাম ভালো নেতৃত্ব পেলে দেশ আরও বহুগুণ এগিয়ে যেতে পারত। 

গণতন্ত্রকে আমাদের আরও সুদৃঢ় করতে হবে। আমরা তা পারব, আমাদের রয়েছে প্রায় ষোলো কোটি দেশপ্রেমিক জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তি আর হৃদয় উজাড় করা সমর্থন।

তবে একটা কথা না বললে নয়; তা হলো জনগণের কিসে কল্যাণ এবং কিসে শান্তি আসে- সেটাই একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল আমাদের নেতৃবৃন্দের। এ উদ্দেশ্য সফল করতে গিয়ে যাঁরা নিজেদের নিবেদিত করেছেন তাঁরা সফল। এ কারণেই জনগণ আমাদের নেতৃবৃন্দকে ভালবাসেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কারও কারও এবং কোনো কোনো নেতার নেতিবাচক ভূমিকার কারণে মাঝে মাঝে সরকার সমালোচিত হয়েছে। এমনটি স্বাভাবিক, বৃহৎ কোনো লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হলে পথে কিছু ভুলভ্রান্তি হবে, এ ভুলভ্রান্তিই এগিয়ে যাবার প্রমাণ এবং সংশোধিত হওয়ার শিক্ষা। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের আবার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়েছে। আবার যথার্থ ট্রেনে ঠিকই উঠে গেছে। আমাদের দেশে বারবার সামরিক শাসন এসেছে, নানা অপকৌশলে তা স্থায়ী করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তারা ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু তাদের লোভ-লালসা ও ক্ষমতায় যাওয়ার এবং ক্ষমতায় গিয়ে থেকে যাওয়ার অভিলাষ বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বারবার ব্যাহত করেছে। সামরিক শাসকদের কারণে দেশ পিছিয়েও গিয়েছে। তবু জনগণ এবং জনগণের ব্যাপক সমর্থনে বলীয়ান নেতৃবৃন্দ থেমে থাকেননি। প্রবল উদ্যমে আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। 

এটাও প্রমাণ হয়েছে, এদেশে সামরিক বাহিনী অনেকে ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতায় আসতে পারলেও টিকতে পারেনি। ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। আর নাহলে জীবন দিতে হয়েছে। যাই হোক এতকিছুর মধ্যেও বাংলাদেশের গণতন্ত্র ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে। সামরিক বাহিনীর মধ্যে নতুন নেতৃত্ব ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উন্মেষ ঘটেছে। এই গণতন্ত্রকে আমাদের আরও সুদৃঢ় করতে হবে। আমরা তা পারব, আমাদের রয়েছে প্রায় ষোলো কোটি দেশপ্রেমিক জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তি আর হৃদয় উজাড় করা সমর্থন।

আজকে যাঁরা নেতা আছেন এবং আগামীদিনে যাঁরা নেতা হবেন- তাঁদের সবাইকে মনে রাখতে হবে আমাদের কাজের প্রথম স্থানেই রয়েছে জনগণ। বারবার জনগণের কথা আসে। সবকিছুতে তারাই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। এজন্য আমাদের দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকারি সকল কাজ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। জনগণের সমৃদ্ধি, স্বস্তি এবং সন্তুষ্টির জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে যেতে হবে। সকল বাধাবিঘœ তুচ্ছ করে পরম সাহসিকতায় এগিয়ে যেতে হবে এক লক্ষ্যে। সে লক্ষ্য আর কিছু নয়, কেবল জনকল্যাণ, জাতির কল্যাণ, বাংলাদেশের কল্যাণ। 

একটি সরকার যখন জনগণের উন্নয়নের কথা চিন্তা করে তখন সে দেশ আর পিছিয়ে থাকে না, পিছিয়ে থাকে না সে সরকার, থাকতে পারে না। এ কারণে আমাদের উচিত সুখ ও শান্তির চিন্তা করা, যার ওপর ভিত্তি করে নীতি ও চিন্তাধারা কার্যে পরিণত হবে। তবে সবকিছুর ভিত্তি হবে জনগণ, দেশ ও মাটি। এজন্য জনগণকেও সরকারকে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। কারণ সরকার ও জনগণ পরস্পর সম্পূরক।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে প্রতিযোগিতা যেমন বেড়েছে তেমনি অবারিত হয়েছে সুযোগ এবং বহুমুখী হয়েছে ক্ষেত্র। বস্তুত জ্ঞান-বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান মানুষের ইতিবাচক উত্তরণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এ সহযোগিতা তারা বাংলাদেশের জন্য আরও বাড়াতে চায়। সে সহযোগিতা নিতে হবে। চীন, ভারত, জাপানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের গভীর সুসম্পর্ক। আমাদের পররাষ্ট্র নীতির মূল কথা হচ্ছেÑ সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। এ নীতির কার্যকর প্রতিফলন ঘটিয়ে আমরা আমাদের দেশের অনুকূলে বৈশ্বিক সহায়তা আরও বাড়াতে পারি। এজন্য আমাদের কুশলী কূটনীতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। চীন, জাপান, ভারত প্রভৃতি দেশের সঙ্গে আমাদের দেশের আর্থনীতিক সম্পর্ক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য সরকারকে আরও অধিকসংখ্যক দেশের সঙ্গে এরূপ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা আবশ্যক। এ ধরনের বন্ধু হলে দেশের উন্নতি হবে। তাদের সহযোগিতাও আমাদেরকে উন্নয়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

আমি সরকারকে জাতি বা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে দেখি; কখনও বিচ্ছিন্ন, স্বতন্ত্র বা আলাদা কোনো অংশ হিসাবে নয়। সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে এটি আর সরকার থাকে না, ছারখার হয়ে যায়। অন্যদিকে জনগণেরও উচিত- তাদের কল্যাণে যে সরকার নিবেদিত সে সরকারকে রক্ষায়, বিস্তারে আর প্রসারে পূর্ণ সহযোগিতা করা। বিষয়টি সরকার ও জনগণ উভয়কে বিচক্ষণভাবে মনে রাখতে হবে এবং সেই বিচক্ষণ হিসাবের ভিত্তিতে পরস্পর সম্মান, সহযোগিতা ও প্রাপ্তির মূল্যবোধের ঔজ্জ্বল্যে এগোতেও হবে। যে সরকার জনগণের জন্য কাজ করবে, জনগণের উচিত সে সরকারের সার্বিক সহায়তা প্রদান করা। জনগণের সহায়তা সরকারকে শক্তিশালী করে, উৎসাহিত করে কর্মে। সরকার জনকল্যাণে অসংখ্য কর্মকা- গ্রহণ করে থাকে। জনগোষ্ঠীর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আরও বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়। আর এসব কাজের সফলতা তখনই আসে, যখন জনগণ সরকারের কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। কারণ সরকার হচ্ছে একটি কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের একমাত্র কাজ হচ্ছে জনগণের সেবায় কাজ করে যাওয়া। এর ব্যত্যয় হলে সরকারকে জনগণের রোষানলে পড়তে হয়।

সরকারকে মনে রাখতে হবে, জনগণের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা নয়, সরকারের একমাত্র উদ্দেশ্য জনগণের সন্তুষ্টি অর্জন এবং জাতির অনাগত ভবিষ্যতের জন্য টেকসই উন্নয়ন সাধন। এটি করতে পারলে জাতি হিসাবে আমাদের শ্রীবৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে উঠবে।

আগামীকাল কাল থাকছে - ​‘মাতৃভাষার প্রতি মমতা’

মতামত বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত