৭ ভাদ্র ১৪২৪, মঙ্গলবার ২২ আগস্ট ২০১৭ , ৭:৫৪ পূর্বাহ্ণ

পোল্ট্রি শিল্পকে বাঁচাবে কে? লোকসানের মুখে খামারীরা


গো নিউজ২৪ | মো: ছারোয়ার হোসাইন সুমন, নওগাঁ প্রতিনিধি আপডেট: ১৬ মে ২০১৭ মঙ্গলবার
পোল্ট্রি শিল্পকে বাঁচাবে কে? লোকসানের মুখে খামারীরা

গরু ছাগলের সাংসের দাম অনেকের হাতের নাগালে না হওয়াই বর্তমানে জনপ্রিয় খাবার হয়ে উঠেছে মুরগীর মাংস। মেহমানদারী, আত্মীয়তা, মিলাদ মাহফিলসহ সর্বধরনের ছোট অনুষ্ঠানে মুরগীর মাংসের কদর বেড়ে গেছে। বর্তমানে সুস্বাস্থ্য রক্ষায় পুষ্টি পুরনে পোল্ট্রি শিল্পের অবদান অপরিসীম।

অথচ এই শিল্প আজ হুমকির মুখে। বিপুল পরিমান ঋণের বোঝা নিয়ে খামারীরা সর্বশান্ত হয়ে পড়েছে। না পারছেন তারা এ ব্যবসা ছাড়তে না পারছেন ধরে রাখতে। খাদ্য ও ঔষুধ সরবরাহকারী ডিলাররা মোটা অংকের টাকা পাওনা আছে খামারীদের কাছ হতে। এব্যবসা ছেড়ে দিলে ডিলারদের পাওনা মোটা অংকের টাকা কোথাও হতে আসবে। এই নিয়ে সংকিত তারা।

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার সোনালী মুরগীর মাংসও ডিম উৎপাদনের লাভের আশায় সর্বশান্ত হয়ে পরেছে খামারীরা। নিম্নমানের অনিবন্ধীত কোম্পানীর ঔষুধ, মুরগী খাদ্যের ক্রমাগত উচ্চ মূল্য এর জন্য দায়ী বলে জানান এই ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট খামারী ও খাদ্য ডিলাররা। 

উপজেলার প্রাণী সম্পদ অফিস সুত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় নিবন্ধিত ৬০২টি অনিবন্ধিত ৮৭৫টি খামার সহ ১৫ শতাধিক খামার আছে। যাতে মুরগী চাষ হচ্ছে ২৫ লক্ষ প্রায়। যা হতে মাংসের উৎপাদন হয় ১৮৪০ মেঃ টন। এই উপজেলায় খাদ্য ও ঔষুধ সরবরাহকারী ডিলার আছেন ৪২ জন। এখানে গড়ে উঠেছে মা গোল্ড ফিড নামে একটি ফিড মিল অথচ এই খামারীদের লোকসানের ভারি বোঝায় ১৫০০ পরিবারের অধিকাংশই জীবন যাপন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। 

তথ্য সংগ্রহকালে কথা হয়, তাজপুর গ্রামের আবুল কালাম আজাদের সাথে রাজশাহী কলেজ হতে সমাজবিজ্ঞানে মাষ্টার্স শেষ করে চাকুরী অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার আশায় বাড়ির ধারে পরিত্যক্ত জায়গায় চারহাজার মুরগীর খামার করে। প্রথম বারই চারহাজার মুরগীতে তার লাভ হয় ৩ লক্ষাধিক টাকা। পরে অনুপ্রাণিত হয়ে আরো চার হাজার মুরগীর খামার করে সে, প্রথমবার লাভে মুখ দেখলে ও ক্রমশ তার লোকসানের পরিমান দাড়িয়েছে ৮ লক্ষাধিক টাকা। 

এখন সে নির্বিকার ঋনের বোঝা নিয়ে ব্যবসা ছাড়তে ও পারছেনা। ডিলারের কাছে মোটা অংকের দেনা আছে। আর তাছাড়া দাম বাড়ালে ক্ষতি পুশিয়ে যাবে বলে আশা তার। আবুল কালাম আজাদ অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানায় বর্তমান এশিল্প দাস প্রথার মতো হয়ে উঠেছে। উৎপাদন করি আমরা, যারা উৎপাদনের উপকরন সরবরাহ করে তারা আমাদের কে জিম্মি করে রেখেছে। 

আবুল কালাম আজাদের মতোই এই উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন বদলগাছী সদর, মিঠাপুর, পাহাড়পুর, বিলাসবাড়ী, আধাইপুর, কোলা, বালুভরা ও মথুরাপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ খামারীদের একই অবস্থা। আবুল কালাম আজাদের মতো এই এলাকার শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত বেকার এই পেশার উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠলেও দিনের পর দিন তারা হতাশ হয়ে পরছে। 

দারিশন গ্রামের বেলাল হোসেনের ৯০ হাজার, পাচ ঘরিয়া গ্রামের মুকুলের ৫ লক্ষ ৪৫ হাজার, সুমনের ৩ লক্ষ টাকা, কানুপুর গ্রামের আজিজারের ২ লক্ষ টাকা সহ অনেকেরি এভারি ঋনের বোঝা।

বর্তমান খামারীদের যখন এ বেহাল দশা এবং তখন সুযোগ নিচ্ছেন কিন্তু অসাধু ঔষুধ কোম্পানী। অনিবন্ধিত মানসম্পন্নহীন ঔষধ উচ্চ মূল্যে বিক্রয় হচ্ছে। এত বাড়ছে এসব কোম্পানীর প্রতিনিধিদের দৌরাত্ত। ডিলারদের অধিক সুবিধা দিয়ে ও টাকার বিনিময়ে ডাক্তারদের দ্বারা পিসক্রিপশন করে নিয়ে এই ঔষধ বিক্রি করছেন বলে এই অভিযোগ আছে। এক্ষেত্রে অনেক টাকার ঔষুধ খাইয়ে ও মুরগীর রোগ ভাল হয় না বলে খামারীরা অভিযোগ করেন। আর তাছাড়া খাদ্যের দাম দিনের পর দিন বেড়ে যাচ্ছে। 

বর্তমান বিক্রয় যোগ্য মুরগীর বাজার ১৫০-১৫৫ টাকা। এতে প্রতি হাজারে ৩০-৪০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। সুত্রমতে, গত দুই মাস আগে সোনালী বাচ্চার দাম ছিল ৩০ টাকা। প্রতি হাজার মুরগীর  সোনালী বাচ্চার দাম ৩০ হাজার, খাদ্য ৪০ বস্তা দাম ৭৫ হাজার,  ভ্যাকসিন, ঔষুধ ও তুষ সহ অন্যান্ন সামগ্রীসহ লাগে ২০ হাজার টাকা খরচ হবে।

মোট প্রতি হাজারে খরচ হবে ১,৩০,০০০/- টাকা যা হবে বর্তমান বাজারে বিক্রয় মূল্য অনুযায়ী লোকসান হচ্ছে ৩০-৩৫ হাজার টাকা। অনেক খামারীই ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার মুরগী পালন করে তাদের লোকসান দাড়াবে দেড় থেকে দুই লক্ষ টাকা। এসব খামারীর অনেকেরী পূর্বের প্রতি হাজার মুরগীতে ৭০-৮০ হাজার টাকা লোকসান হয়ে আছে। 

এসব খামারীরা এখন এব্যবসা হতে দূরে যাচ্ছে। কিন্তু ডিলারর পাওনা মোটা অংকের টাকা কোথা হতে এ চিন্তায় ছাড়াতে পারছেনা। লোকসানের টাকা উঠানোর জন্য ডিলারাও পায়তারা চালাচ্ছেন। তাদের পাওনা টাকা আদায়ের জন্য পরিচয় গোপন করে তথ্য সংগ্রহকালে ভোরেন্ডি বাজারের ফাহিম পোল্ট্রি ফার্মেসী মালিক নয়ন জানায় খামারীদের মোটা অংকের লোকসান আছে। খামারী খাদ্য বিক্রি করায় কারনে তাদের এলোকসান বলে অভিযোগ তার।

দিনে দিনে এই ব্যবসা ক্রমগত ধস নামার কারণে ভাল নেই হ্যাচারীর মালিকারও। গত কয়েকদিনে দফায় দফায় সোনালী বাচ্চাদের দাম কমে এসেছে ১১ টাকা। এতে লোকসান গুনতে হচ্ছে হ্যাচারী মালিকদের। খামারীরা লোকসানের মুখে আর বাচ্চা নিচ্ছে না বলে বাচ্চার দামের এবস্থা। অপরদিকে ডিমের দাম কমেছে। বদলগাছীতে লোকসানের মুখোমুখী খামারীরা সোনালী মুরগীর ব্যবসা বিপর্যয়ের পথে প্রায়। অথচ একজন খামারীকে দীর্ঘ দুই মাস পরিশ্রম করে এই লাভের আশা করেন তারা। 

নওগাঁ জেলার ফিড এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মিথুন প্রতিনিধিকে জানায় এ ব্যবসা দিন দিন বিপর্যয়ের পথে। বাজারে অনিবন্ধিত কিছু কোম্পানীর ঔষধ আছে, যে গুলো চিকিৎসকরা পিসিক্রিপশন করে বলে আমাদেরকে রাখতে হয়। 

এবিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এই বিষয়টি উপজেলা প্রাণি সম্পদ অফিসার ভাল বলতে পারবেন। উপজেলা প্রাণি সম্পদ অফিসার জানান, বাকীতে ব্যবসা করার জন্য এই লোকসান হয়েছে। এই বিষয়ে কথা বলার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসার হোসাইন শওকত-এর মোবাইলে ফোন করলে তিনি ফোন ধরেননি। 

মানুষের পুষ্টির অন্যতম উপাদান এপোল্ট্রি শিল্পকে টিকে রাখতে ঔষধ ও ফিডের বাজার মূল্য, বাচ্চার বাজার মূল্য এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল উপকরনের বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রন ও উপর মহলের হস্তেক্ষেপে এ শিল্পকে বাচানো সম্ভব বলে মনে করেন তারা। উক্ত সমস্যা সমাধানের জন্য এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই উর্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করেন। 


গো নিউজ২৪/এএইচ