৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, বুধবার ২২ নভেম্বর ২০১৭ , ১০:২৩ অপরাহ্ণ

পাবনায় ২৫ কোটি টাকার শিম বিক্রির টার্গেট


গো নিউজ২৪ | আরিফ আহমেদ সিদ্দিকী, জেলা প্রতিনিধি আপডেট: ১১ নভেম্বর ২০১৭ শনিবার
পাবনায় ২৫ কোটি টাকার শিম বিক্রির টার্গেট

পাবনা: শিমের সাগর বলে খ্যাত পাবনা সদর, ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া উপজেলা।  অধিক লাভজনক হওয়ায় গতবারের চেয়ে এবার এখানে শিম চাষে বিপ্লব ঘটেছে। চলতি মৌসুমে ২৫ কোটি টাকার শিম বিক্রির সম্ভাবনা দেখছেন চাষিরা। 

জেলার ঈশ্বরদী, পাবনা সদর ও আটঘরিয়া উপজেলার ৪০টি গ্রামে প্রায় ৪ হাজার কৃষক শিম চাষ করে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। প্রতি মৌসুমে এই এলাকায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার শিম বিক্রি হয়। আটঘরিয়া উপজেলায় মাঠের পর মাঠ শুধু শিম আর শিম। তাই মানুষ এ এলাকার নাম রেখেছে শিম সমুদ্র। শিম চাষ করে এ এলাকার কৃষকরা এখন আয় করছে লাখ লাখ টাকা। 

কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের শাহ জামাল প্রথম যশোর থেকে ইপসা ও দেশি জাতের শিমের বীজ এনে ১ বিঘা জমিতে আবাদ শুরু করেন। প্রথম বছরেই শিম চাষ করে এলাকার কৃষকদের তাক লাগিয়ে দেন তিনি। মাচায় অভিনব কায়দায় শিম চাষ দেখে এলাকায় হৈ চৈ পড়ে যায়। ছুটে আসেন কৃষি বিভাগের বড় বড় কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। শাহ জামাল সে সময় ১ বিঘা জমিতে শিম চাষ করে খরচ বাদে লাভ করে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। পরবর্তী বছর অনেক কৃষক শিম চাষ শুরু করে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে পাবনা সদর, আটঘরিয়া ও ঈশ্বরদী উপজেলাতে সবচেয়ে বেশি সবজির আবাদ হয়। এ এলাকায় রয়েছে পেঁয়াজ ময়েজ, পেঁপেঁ বাদশা, গাজর জাহিদের মতো নানা খেতাব প্রাপ্ত আদর্শ কৃষক। এসব খেতাব প্রাপ্ত কৃষকদের অনুপ্রেরণায় এ এলাকার কৃষকরা সবজি চাষের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। এভাবেই তারা পর পর কয়েক বছর শিম চাষ করে বেশ লাভবান হয়েছে। 

শিম চাষে সময় ও খরচ খুবই কম এবং সার, বিষ তেমন না লাগায় এ অঞ্চলের কৃষকরা অন্য যে কোনো আবাদের চেয়ে শিম আবাদে বেশি আগ্রহী। চলতি বছর আটঘরিয়ায় ১ হাজার ৭৫০ একর জমিতে শিম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়। কিন্তু বেসরকারি এক সংস্থার হিসেব অনুযায়ী এ উপজেলায় এবার শিমের আবাদ হয়েছে প্রায় ৭ হাজার বিঘা জমিতে। 

এ বছর আটঘরিয়ার নছিরামপুর, রামেশ্বরপুর, কাঁকমারি, কচুয়ারামপুর, দূর্গাপুর, রোকনপুর, পারখিদিরপুর, নাদুড়িয়া, সড়াবাড়িয়া, কালামনগর, সোনাকান্দর, খিদিরপুর, চাঁদভা, সঞ্জয়পুর, বাচামারা, রতিপুর, হাপানিয়া, বেরুয়ান, কুমারেশ্বর, লক্ষণপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোর শতশত বিঘা জমিতে শিমের আবাদ হচ্ছে। যে দিকে তাকানো যায় শুধু শিমের আবাদ তাই এ এলাকার নাম দেয়া হয়েছে শিম সমুদ্র। 

শিমের আবাদ নিয়ে কথা বলতেই রামেশ্বরপুর গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল হোসেন জানান, এবছর তার নিজের সাড়ে ৩ বিঘা জমির পাশাপাশি তিনি অন্যের জমি চুক্তি নিয়ে মোট ৭ বিঘা জমিতে শিম আবাদ করেছেন। প্রতি বিঘা শিমের আবাদে তার খরচ হয়েছে মাত্র সাড়ে ৮ হাজার টাকা। 

তিনি আরও জানান, এ বছর আবহাওয়া বিরূপ থাকায় অসময়ে অতিমাত্রার বৃষ্টি শিম চাষে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। তারপর বাজারে শিমের দাম ভালো হওয়ায় ক্ষতি পুষিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে খরচ বাদে এবার একটু লাভের পরিমাণ বেশি হবে।

মুলাডুলির শিম চাষি নাছির উদ্দিন জানান, তিনি এ বছর ১০ বিঘা জমিতে শিমের আবাদ করেছেন।  আবাদে তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকার কাছাকাছি। শিম উঠা সবে শুরু করেছে। তাই তিনি প্রতি হাটে প্রায় ৮ থেকে ১০ মণ শিম পাইকারি দরে বিক্রি করছেন। বাজারে এখন শিম ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। 

একই গ্রামের শিম চাষি আব্দুস সামাদ, আজগর আলী, হেলাল উদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন, আয়েজ উদ্দিন জানান, মাত্র ৪ মাসের ফসলে এত বেশি লাভ আর কোনো ফসলে হয় না। তাই তারা শিমের আবাদ করেছেন। এ আবাদ করে এসব এলাকার মানুষ আয় করছে লাখ লাখ টাকা।

এদিকে প্রতিদিন সকালেই পাবনার মুলাডুলি, দাশুড়িয়া, পারখিদিরপুর, খিদিরপুর ও বড়ইচড়ায় বসে দেশের বৃহত্তম শিমের হাট। এসব হাট থেকে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ ট্রাক শিম বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীদের কাছে। রাজধানী ঢাকাসহ সিলেট, চট্টগ্রাম, চৌমোহনী, কুমিল্লা নিমসা, গাজিপুর, নারায়ণগঞ্জ, পঞ্চগড়, মাওয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শিমের ব্যাপারী এবং আড়ৎদাররা এখানে শিম কিনতে ছুটে আসেন।  

ঢাকার কারওয়ান বাজার থেকে আসা কাঁচামাল ব্যবসায়ী এবং আড়ৎদার রোস্তম আলী জানান, দেশের মধ্যে এখানেই সবচেয়ে বেশি এবং উন্নত জাতের শিম পাওয়া যায়। তবে এসব শিম ঢাকার বাজারে পৌঁছাতে পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা উৎসাহ হারাচ্ছে। এক ট্রাক শিম ঢাকায় নিতে খরচ পড়ে কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। এর সাথে অন্যান্য খরচও আছে।  

কৃষি কর্মকর্তা শাহিন হোসেন জানান, স্বল্প সময়ে অধিক লাভের কথা ভেবেই কৃষকদের আরও অধিকহারে শিম চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। 

এদিকে আটঘরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার সরকার জানান, এ উপজেলাতেই ১ হাজার ৭৫০ একর জমিতে শিম চাষ হচ্ছে। উৎপাদনের টার্গেট রয়েছে ৩১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। 
 
গোনিউজ২৪/এমবি