৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, সোমবার ২০ নভেম্বর ২০১৭ , ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ
‘আমার কথা’

‘উন্নয়ন ও অগ্রাধিকার’


গো নিউজ২৪ আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০১৭ বুধবার
‘উন্নয়ন ও অগ্রাধিকার’

সৈয়দ আবুল হোসেন বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘আমার কথা’। এই বইয়ে তিনি নিজের চিন্তা, কর্মকাণ্ড, মূল্যবোধ, নানা অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখেছেন। এটি পড়লে তাকে যারা পুরোপুরি চিনেন না তাদের সুবিধা হবে। বইটি Gonews24.com ধারাবাহিকভাবে ছাপছে। বইটির আজকের পর্বে থাকছে  ‘উন্নয়ন ও অগ্রাধিকার’

একটি সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়নের কোন কোন ক্ষেত্রকে প্রাধান্য দেয় সে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া জরুরি। এটা অনেকেই জানেন না। সরকার তিনটি বিষয়ের ওপর বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তা হলো : ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও দেশপ্রেম। এবার পর্যায়ক্রমে এগুলোর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যায়।

ক্ষমতায়ন 
কোনো সরকারের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য- গণতন্ত্রকে সুসংহত করে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। জনগণের প্রতি সরকারের এবং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস প্রয়োজন। উভয়ের সমন্বিত প্রয়াসে দেশ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ ত্বরান্বিত হয়, কার্যকর হয়। কিন্তু উভয়ের বিশ্বাসের মধ্যে যদি কোনো ফাঁক থাকে তাহলে রাষ্ট্র ও জনগণ উভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এ বিষয়টি উভয়ের জন্য আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। সুতরাং একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকার এবং জনগণ উভয়কে সর্বতোভাবে একে অন্যের পরিপূরক হয়ে কাজ করতে হবে।
 
ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র একটি মৌলিক বিষয়। অগণতান্ত্রিক বিষয়Ñ ক্ষমতায়নের একটি নেতিবাচক দিক। সুতরাং কোনো সরকার যদি অগণতান্ত্রিক পথে অগ্রসর হয় তাহলে সে সরকার কখনও স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে না। এখানেও জনগণের অংশগ্রহণ একটি প্রধান বিষয় হয়ে দেখা দেয়। জনগণ হচ্ছে গণতন্ত্রের মৌলিক বিষয়। গণতন্ত্র হলো সরকার ও জনগণের পারস্পরিক মর্যাদার এক তীর্থভূমি। যে দেশে গণতন্ত্র নেই, সেদেশে শাস্তি নেই, নিরাপত্তা নেই। গণতন্ত্র ব্যাহত হলে দেশের রাজনীতি থাকে না। মানুষের মৌলিক-মানবিক চাহিদাগুলোও পূরণ হয় না। সংকট দেখা দেয় সর্বত্র। সুতরাং গণতন্ত্রের প্লাটফর্ম তৈরি করতে সরকার ও জনগণ উভয়কে ভাবতে হবে। জনগণ ও সরকারের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে যে কোন পন্থায় অগণতান্ত্রিক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়। সঙ্গত কারণে এর পরিণাম হয় ভয়াবহ। রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যাহত হয়। তখন জনগণের মৌলিক অধিকার বলতে কিছুই থাকে না। সরকার জেল-জুলুমের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা স্থায়ী করতে মরিয়া হয়ে ওঠে, যা সংবিধানকে অকার্যকর করে দেয় নির্মম সহিংসতায়।

একটি সরকারকে মনে রাখতে হবে, মানবসম্পদ উন্নয়ন তার অন্যতম অগ্রাধিকার। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে তাদের প্রধান ও অন্যতম কাজ হচ্ছে জনগণের ক্ষমতায়ন। আমাদের দেশের নাগরিকরা এ ব্যাপারে যেমন দক্ষ তেমনি উপযুক্ত ও সচেতন। তাদের ওপর আমাদের গভীর আস্থা ও বিশ্বাস আছে। তারাই তাদের ভাগ্যের নিয়ন্তা। এ কারণে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন হতে হবে। অন্তত ভোটাধিকার প্রয়োগ করার বেলায় এটা তাদের দেখাতে হবে- আগে যেসব সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল তারা জনসাধারণের উন্নয়নের জন্য কতটুকু কী করেছে, দেখতে হবে স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কতটুকু তৎপর ছিল অথবা রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অনিয়ম বা দুর্নীতিতে তৎপর ছিল কিনা। এসব বিষয় ভোটাধিকার প্রয়োগের আগে বিশ্লেষণ করতে হবে। তাকে বুঝতে হবে এবং জানতে হবে তার ভোটের মূল্যটুকুই-বা কত। ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের বিকল্প কিছু নেই, গণতন্ত্রের ধারক-বাহকও হচ্ছে জনগণ। সুতরাং একটি সৎ, যোগ্য এবং জনকল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য যে ব্যক্তি বা দল নিয়ে ভবিষ্যতে সরকার গঠিত হবে তাকে তৈরিও কিন্তু জনগণকেই করতে হবে।


শিক্ষা
উন্নয়নের অগ্রাধিকার খাতের মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। বলা যায়, শিক্ষা জাতির অগ্রাধিকার খাতগুলোর শীর্ষে অবস্থানকারী একটি অনিবার্য খাত। আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার শিক্ষাখাতে অনেকগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এগুলো একটি চলমান প্রক্রিয়া। শিক্ষা বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যম। আর বিদ্যালয় শিক্ষা অর্জন ও চরিত্র গঠনের কারখানা। শিক্ষা প্রকৃত মানুষের জন্ম দেয়। শিক্ষা সুন্দর আলো, সুন্দর ভবিষ্যত এবং আত্মবিশ্বাস দেয়- যা মানুষকে মহিয়ান করে তোলে। সে কারণে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর মধ্যে সব সরকার শিক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসাবে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এ খাতের উন্নয়নের জন্য ও শিক্ষিত জাতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্যাপক সংখ্যক স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এমপিওভুক্তিকরণও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রয়োজনের সঙ্গে দেশের ক্রমবর্ধমান জনগণের জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবছর মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে বই বিতরণ করা হচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে নকল-প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে। গুণগত শিক্ষা ও পাসের হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এই শিক্ষিত মানুষরাই আগামীদিনে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। শিক্ষার হার বাড়লে দেশের উন্নয়নের হারও বাড়বে। তবে ভারসাম্য রক্ষার্থে সরকারকে চাকরি ও ব্যবসায়ের সুযোগ সৃষ্টি করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। 

পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে। এ অগ্রযাত্রার শামিল হতে হলে উচ্চশিক্ষার উন্নয়নে সরকারকে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ওয়েবসাইট নির্মাণ, রিসোর্স সেন্টার স্থাপন, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি, কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক প্রসার, প্রতিটি বিভাগীয় শহরে গার্লস টেকনিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠা, মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন আবশ্যক। ইংরেজি ও গণিত শিক্ষার মান বৃদ্ধিকল্পে শিক্ষকের মধ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের প্রবর্তন করতে হবে।

দেশপ্রেম ও সরকার
দেশের জন্য কষ্ট বা সুখ অনুভবের নামই দেশ প্রেম। দেশকেই অন্ধের মত ভালবাসা যায়। তাই দেশের জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। নিজেকে জনগণের কল্যাণে বিলিয়ে দিতে হবে। ব্যক্তি স্বার্থকে জাতির স্বার্থে পরিণত করতে হবে। জাতির উন্নয়ন ও কল্যাণই হবে ব্যক্তির কল্যাণ ও উন্নয়ন। তাই দেশপ্রেম সুনাগরিকের একটি অপরিহার্য বিষয়। যে জাতির দেশপ্রেম যত গভীর সে জাতি তত বেশি আত্মপ্রত্যয়ী এবং সংগ্রামী। বাঙালি জাতির মধ্যে গভীর দেশপ্রেম রয়েছে। এ দেশপ্রেমের কারণে এ জাতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়েছে, যার প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় লিখিত আছে। এক্ষেত্রে সরকারের মূল লক্ষ্য একটি এবং তা হচ্ছে- কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিকদের শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলা। তাই সরকার এবং স্থানীয় সরকার সবার কাছে এখনও কর্মক্ষেত্র তৈরি করা একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত। প্রতিটি সরকারের উচিত উপযুক্ত নাগরিককে যথার্থ কর্মক্ষেত্রে নিয়োগ দেওয়া। শুধু স্বদেশেই নয়, বহির্বিশ্বে জনশক্তি রপ্তানির বাজার সৃষ্টির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি প্রাইভেট সেক্টরের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের এক্ষেত্রে বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। সরকার এবং সব পর্যায়ের জনসাধারণের অংশগ্রহণেই কেবল সফল উন্নয়ন সম্ভব। মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন হঠাৎ ঘটে যায় না। লক্ষ্য স্থির করে নিজেদের মধ্যে, সরকার ও জনগণের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন দ্বারাই উন্নয়ন সম্ভব। 

আর একটি বিষয় হলো, সব ধরনের পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি চিন্তায় রাখতে হবে। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর ক্ষেত্রে একটি ‘ভিশন’ থাকবে যার নির্দেশনাও থাকবে ভিশন্ রিপোর্টে। সরকারের উদারনীতির মধ্যে দেশপ্রেমের অমিয়ধারা প্রতিফলিত হবে এবং সব শ্রেণির নাগরিক এর সুফল পাবে। বাংলাদেশের মানুষের সাহস, উদ্যম ও কর্মস্পৃহার ব্যাপারে দেশের প্রতিটি নাগরিকের ওপর সরকারের ও আমাদের প্রচ- আস্থা ও বিশ^াস আছে। তারা পারবে। কেননা তারাই তাদের ভাগ্যের নিয়ন্তা। তারা নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে নেবে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত মতে, বর্তমানে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মাথাপিছু গড় আয় ৫২৮ ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার গড় আয় ১ হাজার ১৭৬ ডলার। ২০১৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৪৬৬ ডলারে উন্নীত হয়েছে। সাফল্য আছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাসেও। বাংলাদেশে এখন এই হার মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ আর দক্ষিণ এশিয়ার গড় ১ দশমিক ৪ শতাংশ। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এ গড় অনেক বেশি, প্রায় ২.১ শতাংশ। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মানুষের গড়-আয়ু ছিল ৪৬ বছর, এখন তা ৬৯ বছর। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার গড়-আয়ু হচ্ছে ৬৫ বছর।১৮ নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এক হাজার নবজাতকের মধ্যে মারা যায় ৭০ জন, দক্ষিণ এশিয়ায় ৫২, আর বাংলাদেশে ৩৫ জন।১৯ দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মেয়ে স্কুলে যায় আমাদের দেশে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বাংলাদেশ অনেক বেশি অগ্রসরমাণ আর এটা সম্ভব হয়েছে জনগণের মধ্যে লালিত দেশপ্রেমের সুমহান প্রত্যয়ের কারণে।

আগামীকাল কাল থাকছে - ​‘বিজয়চিহ্ন 'V' প্রকাশে ভিন্নতা’

 

মতামত বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত