১১ শ্রাবণ ১৪২৪, বুধবার ২৬ জুলাই ২০১৭ , ৬:৪৪ পূর্বাহ্ণ

নড়াইলে জমে উঠেছে ডুঙ্গার হাট


গো নিউজ২৪ | শরিফুল ইসলাম, নড়াইল প্রতিনিধি আপডেট: ১৬ জুলাই ২০১৭ রবিবার
নড়াইলে জমে উঠেছে ডুঙ্গার হাট

বর্ষা মৌসুম তাই কর্মব্যস্ত নড়াইলের ডুঙ্গার কারিগররা। কেউ তালগাছ কিনতে ব্যস্ত, কেউ গাছ কাটতে ব্যস্ত, কেউ ব্যস্ত সেই গাছ দিয়ে ডুঙ্গা তৈরী করতে, কেউবা আবার ব্যস্ত সেই তৈরী করা ডুঙ্গা বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে। এই দৃশ্য দেখা যায় নড়াইলের ডুঙ্গা কারিগর ও শ্রমিকদের মধ্যে। এবছর বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই বর্ষা বেশি হওয়ায় বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে গেছে তাই এবছর ডুঙ্গার চাহিদাও বেড়েছে।

এদিকে জমে উঠেছে নড়াইলের কয়েকটি ডুঙ্গার হাট। জেলার সবচেয়ে বড় ডুঙ্গার হাট নড়াইলের সদরের তুলারামপুর হাট। এখানে ডুঙ্গা কেনাবেচা করতে আসে বিভিন্ন জেলার মানুষ। নড়াইলের ডুঙ্গা যাচ্ছে বিভিন্ন জেলায়। এবছর ডুঙ্গার চাহিদা বেশি থাকায় ডুঙ্গার দাম গতবারের থেকে বেশি। তাই ডুঙ্গার কারিগর ও ব্যবসায়ীরা বেশ খুশি।

জানাগেছে, জেলার  চাচুড়ী, তুলারামপুর, দিঘলিয়াসহ  বিভিন্ন হাটে ডুঙ্গা বিক্রি হয়। নড়াইল-যশোর সড়কে তুলারামপুরের হাট তেমনি একটি বড় ডুঙ্গার হাট। এটি জেলার মধ্যে বৃহত্তর ডুঙ্গার হাট। এখানে সপ্তাহের শুক্র আর সোমবারে  হাট বসে। বর্ষার শুরু থেকে অর্থাৎ জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪ মাস এই হাটে ডুঙ্গা কেনা-বেচা চলে। এখানকার প্রতিটি হাটে কয়েক শ ডুঙ্গা বেচাকেনা হয়। আর এই ডুঙ্গার সুনামও রয়েছে বেশ। তাই এ হাটে ডুঙ্গা কিনতে আসেন নড়াইলের বিভিন্ন উপজেলাসহ পার্শবর্তী মাগুরা, ফরিদপুর, যশোর, গোপালগঞ্জ, সাতক্ষিরা, বাগেরহাট, খুলনাসহ বিভিন্ন জেলার ব্যাবসায়ীরা।

কারিগররা জানান, বছরে তাদের ৪ থেকে ৫ মাস এই কাজ করতে হয় বাকি সময় অন্য কাজ করেন তারা। যার যত বেশি কাজ করে তার তত বেশি ইনকাম হয়। প্রতিদিন এক জন কারিগর ৭শ থেকে ১২শ টাকা পর্যন্ত ইনকাম করেন। আর এক জন শ্রমিক  ৫শ থেকে ৬শ কাটা ইনকাম করতে পারে।

আকার ভেদে একটি তাল গাছ ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। সাধারনত একটি তালগাছ থেকে দুটি  ডুঙ্গা  তৈরী হয়। ক্রেতার চাহিদা আর পরিমাপ বুঝে একেকটি ডুঙ্গা ২ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় । বর্ষার কারনে বিলে পানি বাড়লে তখন ডুঙ্গার চাহিদা বেড়ে যায়।

বিভিন্ন জেলা থেকে তুলারামপুর হাটে আসা ডুঙ্গার ক্রেতা রফিকুল ইসলাম, মলয় দাস, অঞ্জন দাসা, বিজয় ঘোষ  জানান, নড়াইলে কারিগরদের তৈরী ডুঙ্গার মান ভাল, এই ডুঙ্গা অনেক  দিন ব্যাবহার করা যায়। এখান থেকে ডুঙ্গা কিনে তারা বিভিন্ন জেলায় নিয়ে বিক্রয় করেন। তাদের লাভও ভাল হয়। হাটের পরিবেশ ভাল এখানে কোন প্রকার সমস্য নেই। রাস্তার পাশে হাট তাই এখান থেকে ডুঙ্গা কিনে সহজে ভ্যান, নসিমন, করিমন, মিনি ট্রাক, ট্রাকে পরিবহন করা যায়।

কারিগররা জানান, একটি ভালো তালগাছের গোড়া  মাটির ভিতর থেকে বের করে  শিকড় সহ গাছটি কাটা হয়। এরপর গোড়ার অংশটি সুচালো করে  ৯ হাত রেখে আলাদা করা হয়। গাছটির মাঝামাঝি অংশ দাগ  দিয়ে হাত করাত দিয়ে  ধীরে ধীরে এপাশ ওপাশ কেটে দুভাগ করে ফেলা হয়। ভিতরের নরম অংশ কুপিয়ে শাস পরিস্কার করে তৈরী হয় ডুঙ্গা। এরপর হাত বাশলে  দিয়ে ধীরে ধীরে ফিনিসিং করে সুন্দর আকারের ডুঙ্গা তৈরী করে বিক্রেতার কাছে  বিক্রি করা হয়।

ডুঙ্গার ব্যবসার সাথে জড়িত সদরের চর শালিখা গ্রামের সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আমি  নিজে ডুঙ্গা তৈরী করি। তিনি জানান, ৩ জন শ্রমিক ১ দিন কাজ করলে দুটি  ডুঙ্গা  তৈরী করা যায় এবং বাজারে নেয়া খরচ সহ বিক্রি হিসাবে অন্তত ৩ হাজার টাকা লাভ করা যায়।

সদরের ভবানীপুর গ্রামের ডুঙ্গা ক্রেতা আব্দুর রশিদ শেখ বলেন, এবছর বৃষ্টি বেশি হওয়ায় তার বাড়ির চারিপাশে পানিতে তলিয়ে গেছে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য ডুঙ্গার খুব দরকার। তাই তিনি ডুঙ্গা কিনতে এসেছেন। তার অভিযোগ গতবছর থেকে এবছর প্রতিটা ডুঙ্গার দাম ৫শ থেকে ১৫শ টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছেন বিক্রেতারা।

সাতক্ষীরা থেকে ডুঙ্গা কিনতে আসা ব্যবসায়ী বাসার বেগ জানান, তিনি প্রতি বছর নড়াইলে ডুঙ্গা কিনতে আসেন। তিনি এখান থেকে ডুঙ্গা কিনে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করেন। এতে তার লাভও ভাল হয়। গত বছর থেকে এবছর ডুঙ্গার দাম বেশি বলে তিনি জানান।

বিল আর খালে পরিপূর্ন নড়াইলের  বিভিন্ন এলাকায় এখন তাল গাছের তৈরী  ডুঙ্গা ’র  (যাকে কোষা নৌকা বলে) যত্রতত্র ব্যবহার চলছে। খাল আর বিল পাড়ের হাজারো মানুষের একমাত্র বাহন এই ডুঙ্গা। নদী থেকে খালে প্রবেশ করতে, খাল পাড়ি দিয়ে বাজার বা বিভিন্ন কাজ করা, বিল থেকে মাছ ধরা-শাপলা তোলা থেকে গ্রামীন জনপদের অতি প্রয়োজনীয় এই বাহন দেখে বোঝা যায় যে, এখন বর্ষাকাল চলছে। নৌকা চালনায় বেশী পানি লাগলে ও  কম পানিতেই ডুঙ্গা চলে। আকারে ছোট আর চালনায় সহজ বলে  ৫ বছরের  শিশু থেকে মহিলারা পর্যন্ত  এই বাহন ব্যবহার করে।


গো নিউজ২৪/এএইচ