১ পৌষ ১৪২৪, শনিবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ , ১:৫৭ পূর্বাহ্ণ

তুমি আমার মধুময়তার প্রেম


গো নিউজ২৪ | সমুদ্র হক আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০১৭ শনিবার
তুমি আমার মধুময়তার প্রেম

ওগো মধুমিতা
তুমি যে স্মৃতিতে অম্লান।
তুমি আমার মধুময়তার প্রেম।
“মধুমিতা গো তুমি আসবে কবে হাসবে মোর বাতায়নে.....”। 

৫০ বছর আগের কথা- আজকের পত্রিকাগুলোতে চোখ বুলাতেই দৃষ্টিতে এলো সেই চেনা ঘর। ফ্লাশব্যাকে ছায়াছবির ফ্রেমের মতো ভেসে এলো একের পর এক স্মৃতির সেলুলয়েডের ফিতা। হৃদয়ের প্রজেক্টরে মুভির রিলের মতোই ঘুরতে লাগলো।

তখন ১৯৬৭ সাল। এসএসসি পাস করে বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের ইন্টারমিডিয়েট বিজ্ঞানে ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। তখন বলা হতো ফার্স্ট ইয়ার ড্যাম কেয়ার। কিশোর বেলা থেকে যৌবনের অভিষেকের পালা। কত কিই না ভাবনা। স্কুল জীবন থেকেই সিনেমা দেখার পোকা আমরা ক’বন্ধু। চিত্রালী সাপ্তাহিক সিনে পত্রিকা পড়া। দেশ বিদেশের সিনেমার খবর রাখা। সুন্দরী নায়িকার ছবি দেখলেই হার্টথ্রব। প্রিয় নায়ক নায়িকাদের হাড়ির খবর স্ক্যান্ডেল জানার কৌতুহল। সিনেমার বিষয় তো কমন।

রেডিওর গান নাটক শোনাও ছিলো অভ্যাস। কলেজের কমন রুমের রেডিওতে কমার্শিয়াল সার্ভিসে বিজ্ঞাপন কানে এলো “মতিঝিলে মধুমিতা সিনেমা হল উদ্বোধন হচ্ছে ১ ডিসেম্বর (১৯৬৭)। প্রথম ছবি ক্লিওপেট্রা।

কি উচ্ছাস- যে ভাবেই হোক মধুমিতায় ছবিটি দেখতেই হবে। আমি ও সহপাঠী বন্ধু খোকন প্লান করছি। কী করা যায়। মাসে ২০ টাকা স্টাইপেন্ডের জমানো ৫০ টাকা সম্বল। মা বাবার কাছে ঢাকা গিয়ে সিনেমা দেখার টাকা চাওয়া তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমি ৫০ টাকার গোপন তহবিলে হাত দেয়ার প্রস্তাব করতেই খোকনও তাই করলো।

শুরু হলো মধুমিতায় ক্লিওপেট্রা অভিযান। বাড়িতে মিথ্যে বলা। কলেজের এস্কারশনে যাওয়ার কথা। তারিখটি মনে আছে। ৫ ডিসম্বর ১৯৬৭। তখন বিকেল চার টায় বগুড়া থেকে ঢাকা মেলট্রেন ছাড়তো। ফুলছড়িঘাট ওপারে বাহাদুরাবাদ ঘাটে স্টিমারে পার হয়ে ফের ট্রেন। ঢাকা পোঁছানোর সময় পরদিন সকাল ন’টা। আমি ও খোকন তৃতীয় শ্রেণির প্রতিটি ১০ টাকা করে টিকিট কেটে ট্রেনে চাপলাম। দু’জনের তহবিল মোট একশ’ টাকা। টিকেটের পর রইলো বাকি ৮০। ঘাটে সস্তায় ভাত খাওয়া হলো। মাছ ডালসহ ৩ টাকা করে প্লেট।

ঢাকায় পৌঁছলাম সময়মতো। তখনও রেল স্টেশন গুলিস্তানে আছে। কমলাপুর যাই যাই করছে। ঢাকায় নেমে রিকশা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা হলে (বর্তমানে শহীদুল্লাহ হল) গেলাম। নিচ তলায় ১০৪ নম্বর রুমে থাকতেন আমার চাচাত ভাই। সে তখন সয়েল সায়েন্স অনার্স পড়ে। ভাইজান আমাদের দেখেই প্রথম কথা- পালিয়ে এসেছিস নাকি। আত্মসমর্পন করে আমাদের অভিযানের কথা বললাম। ভাইজান কিছুটা বিস্ময়ে সব শুনলেন। মা বাবাকে বারন করতে বললাম। ঘুষ হিসাবে প্রস্তাব দিলাম ভাইজান আপনাকেও সিনেমা দেখাই। আমাদের সঙ্গে হোটেলে খাবেন। অপরিপক্ক মস্তিষ্কের বুদ্ধি যা হয়। ভাইজানের কড়া ধমকে সব গুলে ফেললাম। মনে হলো এসে কি না ভুল করেছি। কিছুই তো গোপন থাকবে না।

ভাইজান আমাদের দু’জনকে হলের ডায়নিংয়ে খাওয়ালেন। বেলা দু’টোর দিকে তিনি মধুমিতায় নিয়ে গেলেন। প্রবেশেই কাঁচের জানালার কাউন্টার। ড্রেস সার্কেলের (ডিসি) টিকেট নেই। ২ টাকা ৩০ পয়সা করে রিয়ার স্টলের ৩ টা টিকেট ভাইজান কাটলেন। তিনি খরচ করছেন মনে আনন্দ না হয়ে ভয়। গোপন তো থাকবে না।

মধুমিতা হলের ভিতরে প্রবেশের পর স্পিকারে ভেসে এলো মিষ্টি গান। ফেরদৌসী রহমানের কণ্ঠে “মধুমিতা গো তুমি আসবে কবে হাসবে মোর বাতায়নে.....”। ম্যাটিনি শো তিন টায় শুরু। এর আগে হলটি ঘুরে দেখলাম। দেয়ালে টেরাকোটার মতো সুন্দর কারুকাজ। প্রেক্ষাগৃহের ভিতরে আসন গ্রহণের পর কি মিষ্টি গন্ধ নাকে এলো। ভাইজান বললেন পারফিউম স্প্রে করা। আলো নিভে যাওয়ার পর লাল পর্দা সরে গেল। প্রথম স্লাইড মধুমিতা ফর মুভিজ ম্যাগনিফিসেন্ট।

শুরু হলো ৭০ মিলিমিটারের ছবি। আমাদের কি পুলকিত অবস্থা। ক্লিওপেট্রা গল্প জানা। এলিজাবেথ টেলর ক্লিওপেট্রার ভূমিকায়। রিচার্ড বার্টন মার্ক এন্টনির ভূমিকায়। জুলিয়াস সিজারের ভূমিকায় রেক্স হ্যারিসন। অক্টাভিয়ানের ভূমিকায় রড্ডি ম্যাকডয়েল।

ছবি দেখার পর দুই সহপাঠি মিলে কত যে কথা। সঙ্গে ভয় বাড়িতে গেলে কী হবে! রাত ১১ টায় নর্থ বেঙ্গল এক্সপ্রেসে আমাদের দু’জনকে ভাইজান তুলে দিলেন।

পরদিন বিকেলে বগুড়া পৌঁছে বাড়িতে ঢুকতেই আম্মার অগ্নিমূর্তি দেখে বুঝতে বাকি রইল না পরবর্তী এপিসোড কী হতে পারে। ঘর থেকে অবসরপ্রাপ্ত জাদরেল পুলিশ অফিসার বের হয়ে আম্মাকে থেমে দিয়ে বললেন- ওয়েলকাম ব্যাক। তা মিথ্যা এস্কারশনের মধুমিতায় ক্লিওপেট্রা ছবি কেমন লাগলো! তারপর সন্ধ্যায় ডেকে পিটুনির বদলে স্নেহের সুরে মধুর ধমক আর উপদেশ। শাস্তি হিসাবে ক্লিওপেট্রা ছবির গল্পটি ইংরেজিতে লেখা এবং কী ভাবে যুক্তি করে ঢাকায় যাওয়া তার বর্ণনা ইংরেজিতে লেখা। সন্তোষজনক না হলে ঈদে নতুন পোশাক বাতিল। সাত দিন রাতে শুধু রুটি।

শেষ পর্যন্ত এই শাস্তি পেতে হয়েছে। তবে ঢাকায় গিয়ে ক্লিওপেট্রা ছবি দেখার জন্য নয়। মিথ্যা বলার জন্য। মধুমিতা- ৫০ বছর পূর্তিতে তুমি স্মৃতিতে অম্লান।

লেখক: সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক জনকণ্ঠ, বগুড়া।

শিল্প-সাহিত্য ও সংষ্কৃতি বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত