১০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, শুক্রবার ২৪ নভেম্বর ২০১৭ , ৭:০৪ অপরাহ্ণ

ঢাকার পাশেই গরীবের ‘কক্সবাজার‍‍’ মৈনট ঘাট


গো নিউজ২৪ | অনলাইন ডেস্ক আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ রবিবার
ঢাকার পাশেই গরীবের ‘কক্সবাজার‍‍’ মৈনট ঘাট

ঢাকা: ০২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬, এন মল্লিক পরিবহনে করে আমরা ৩ যাত্রী (সদস্য) রওনা করলাম নবাবগঞ্জেরর কলাকোপার উদ্দেশ্যে। যদিও ট্রিপের আগে আমরা ছিলাম ৬/৭ জন, বেলা শেষে তা তিনে গিয়ে ঠেকল! আমাদের ট্যুর প্ল্যানটা ছিল এমন- শুরুতে কলাকোপার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ঘুরে বেড়ানো। এরপর বান্দুরার গায়েবি মসজিদে জুমা পড়ে বান্দুরার সুপ্রসিদ্ধ সহদেব সাহার মিষ্টির দোকানে ঢুঁ মারা। তারপর সম্প্রতি আলোচিত মিনি কক্সবাজার খ্যাত মৈনটঘাট, সেখানে পদ্মায় ঝাপাঝাপি, ইলিশ দিয়ে পদ্মার পাড়ের হোটেলে দুপুরের আহার আর শেষ বিকেলে নৌ ভ্রমণ।

তো, বাস যথা সময়েই ছেড়ে দিল। ব্যাস্ত শহর থেকে বাসটা যখন বেরিয়ে এল পথের দু'পাশে তখন সবুজের একনায়তন্ত্র! অফিসিয়ালি বর্ষা বিদায় নিলেও বাংলার বর্ষা আরো একটা মাস থেকে যায়। বাসের জানালা দিয়ে বর্ষার গ্রামীণ রূপ গিলতে গিলতে আমরা এগুচ্ছি। পথের পাশের নিম্ম ভূমিগুলো সব জলমগ্ন, বিশাল বিশাল ঝিল যেন এক একটা। আর সে ঝিলের সর্বত্র শাপলা ফুটে আছে। শুভ্র শাপলা আর অবধারিত সবুজের সম্মোহনী আহবান উপেক্ষা করে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমার গায়ে হালকা জ্বর। সকালে নাপা খেতে ভুলে গেছি। তবে প্রকৃতির প্রতি বিশ্বাস আছে, সে আমার জন্য কিছু একটা করবে! মনে আছে Anne Frank কি বলেছিল?

"And I firmly believe that
nature brings solace in all
troubles."

বাই দ্য ওয়ে, ১১ টার দিকে আমরা নবাবগঞ্জের কলাকোপায় নামলাম। আশে পাশের স্থাপনাগুলো দেখলে যে কেউই বলবে, নাহ, আমরা আসলেই নবাবগঞ্জে আছি। পথের দু'ধারে নবাবী স্থাপনাগুলোর গাম্ভীর্যপূর্ণ অবস্থানই মনে করিয়ে দিবে আপনি এখন নবাবগঞ্জের কলাকোপায়!

বাস থেকে নেমে রাস্তা পেরিয়ে আমরা প্রথমেই ঢুঁ মারলাম 'উকিল বাড়ি'। উকিল বাড়ির পাশেই আবার 'জজ বাড়ি'। দুটো বাড়ির স্ট্রাকচার একই। এ ব্যাপারটা খুব মজার। উকিল বাড়ির সামনে বিশাল একটা পুকুর একে দিয়েছে জজ বাড়ি থেকে বাড়তি রূপ। যদিও জজ বাড়িটা ধবধবে সাদা আর উকিল বাড়িটা সে তুলনায় ম্লান। উকিল বাড়ির গেট খোলা ছিল। অনুমতি নিয়ে বাড়িটার আশপাশ ঘুরা যায়। পুকুর ঘাটে বাড়ির মালিকের দেখাও পেয়ে গেলাম। অপর দিকে জজ বাড়ি পুরোটাই সংরক্ষিত। গেইট থেকে উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে দেখে নিতে হয়।

মৈনট ঘাট
উকিল বাড়ির পাশেই কোকিলপ্যারি জমিদার বাড়ি। মূলত জজ বাড়ি, উকিল বাড়ি আর কোকিলপ্যারি বাড়ি তিনটে পাশাপাশি একই লাইনে অবস্থিত হলেও এ স্থাপনাটি মহাকালের গর্ভে বিলুপ্তির অপেক্ষায়! সংস্কারে কারো বিন্দু মাত্র আগ্রহ বাড়িটির কোথাও ফুটে উঠেনি। বর্তমানে কোকিলপ্যারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবাসন হিসেবে ভবনটি ব্যবহৃত। ভবনটির সামনেই ছোট্ট একটি মন্দির যাতে বুদ্ধের মাথাহীন একটি মূর্তি আছে! বলা হয়ে থাকে, ১৯৭১ সালে পাক বাহিনী এই মুর্তিটি ভেঙে দিয়ে যায়।

কোকিলপ্যারি জমিদার বাড়ির পাশের রাস্তাটি চলে গেছে আনসার ও ভিডিপি ক্যাম্পের দিকে। এখানে যে বাড়িতে আনসার ব্যাটালিয়নের বসবাস, তা 'তেলিবাড়ি' নামে খ্যাত। অনেকে একে 'মঠবাড়ি'ও বলে। শোনা যায়, বাড়ির মালিক বাবু লোকনাথ তেল বিক্রি করে ধনী হয়েছিলেন। তাই বাড়ির এমন নাম হয়েছে। রাস্তায় দাঁড়িয়েই এ বাড়িটিকেও দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমি ঠিক জানি না আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য কে কেন এভাবে নষ্ট করা হচ্ছে?

তেলি বাড়ির সামনেই ইছামতি নদী। নদীর পাড়ে বসার জন্য সুন্দর ব্যবস্থাও আছে। বসে একটু জিরিয়ে নিলাম সবাই। আমাদের দেশের নদীগুলোর নাম এত্তো সুন্দর হয় কেন বুঝি না! নামের মধ্যে মায়াকারা একটা ভাব। সে যাইহোক, নদী তীরবর্তী গড়ে ওঠা এই সব বিশাল বিশাল স্থাপনাই জানান দিচ্ছে এক সময় কতটা প্রভাবশালী ছিল এ নদীটি। কারন নদী পাড় ধরে হাঁটলে আরো তিন-চারটে বাড়ির দেখা মিলে। তেলিবাড়ি থেকে ইছামতীর তীর ধরে একটু সামনে এগোতেই যে ইমারতগুলো চোখে পড়ে, তার প্রথমটি 'পাইন্নাবাড়ি'। এই বাড়ির তিন মালিকের অন্যতম মধু বাবু পান বিক্রি করে ধনী হওয়ার জন্যই বাড়িটির এমন নামকরণ।

আরেকটু সামনে যেতেই রোমান স্থাপত্যশৈলীর আরেক নিদর্শন রাধানাথ সাহার বাড়ি। বাড়িটির বয়স প্রায় ২০০ বছর। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বাড়িতে লুটপাট চলে, বাড়িটিও ভাঙচুর হয়। এ বাড়িটির দোতলার বারান্দাটা খুব সুন্দর, বাড়াবাড়ি রকমের সুন্দর। তবে সবচে অসুন্দর ব্যাপারটা হল এটাও রাস্তা থেকেই দেখে নিবে হবে! আফসোস!

এর থেকে একটু সামনে হাঁটলেই মিলে খেলারামের সেই বিখ্যাত বিগ্রহ মন্দিরটি। চারদিক থেকে দেখতে একই রকম এ মন্দিরটির ভিতরে যাওয়া যায় না। ২০১৩ তে যখন গিয়েছিলাম তখন ভিতরে ঢুঁকি, জরাজীর্ণ সিড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে আসি। মন্দিরটির ভিতরের কিছু কিছু জায়গায় বেশ অন্ধকার, গা ছমছমে পরিবেশ ছিল। এখন তো সংস্কার করে সব কিছু তালা বদ্ধ। মন্দিরটির পাশেই বিশাল পুকুর। প্রচলিত আছে, মাকে বাঁচাতে খেলারাম দাতা এই পুকুরে নেমেছিলেন। আর উঠে আসেননি। এলাকাবাসীর এখনো বিশ্বাস, খেলারাম একদিন ঠিকই ফিরে আসবেন, সঙ্গে নিয়ে আসবেন গঙ্গা নদীকে। তো এই ভদ্রলোকের ফেরার অপেক্ষায় না থেকে আমরা ছুটলাম বান্দুরার ভাঙ্গা মসজিদের খুঁজে। এ মসজিদ নিয়েও চমৎকার একটা মিথ আছে!

আমরা যখন বান্দুরার ভাঙ্গা মসজিদের গেইটে পৌছাই তখন প্রায় নামাজের সময় হয়ে গেছে। মসজিদের কাছে আসতেই দেখি এলাহী কান্ড! সাধারনত মাজারকে কেন্দ্র করে এমন আয়োজন হয়, মসজিদকে নয়। চারপাশে অনেক নারী-পুরুষ। খেলনা-পাতি, একপাশে দেখলাম ভাজা-পোড়ার দোকানও আছে। সবচে মজার ব্যাপার হল এ মসজিদে মহিলাদেরও নামাজ পড়ার জায়গা আছে। এবং এই প্রথম এমনটা ব্যতিক্রমী একটা পরিবেশে নামাজ পড়লাম। তবে আমরা তৈরি হতে হতে জুমার নামাষ শেষ!! দুঃখ!

গ্রাম্য একটা মসজিদে এমন সব আয়োজনের মূল করানটা এবার বলি। কথিত আছে, এই মসজিদটি এক রাতে গায়েবী ভাবে সৃষ্টি হয়েছিল। যে রাতে এটি সৃষ্টি হয়েছিল সেদিন ভোরে কোন এক লোক এই মসজিদটি প্রথম আবিষ্কার করেন। কিন্তু তখনও পর্যন্ত এটি সম্পূর্ণ সৃষ্টি হতে পারেনি। কিন্তু মানুষের চোখে পড়ে যাওয়ায় এটি সেরকম অসম্পূর্ণই থেকে যায়। এর একটি অংশ ভাঙা থাকার কারনে এটি ভাঙা মসজিদ নামেই পরিচিত। মসজিদটি দেখতে দারুন। অনেকে এখানে এসে নিজের মনবাসনা মহান সৃষ্টিকর্তাকে জানান। কেউ কেউ তাদের মনবাসনা পূরণ হয়েছে বলেও জানান।

নামাজ শেষে সিন্নির ব্যবস্থা ছিল। বালতি বালতি করে জিলাপী বিতরন করা হচ্ছে। আমরাও সিন্নি অন্বেষণের কাতারে দাঁড়ালাম।

বান্দুরায় সহদেবের মিষ্টি সুপ্রসিদ্ধ। একজন মিষ্টিপ্রেমীর জন্য এতটুকু তথ্যই যথেষ্ট! আর আমরা তিন জনই ছিলাম বাড়াবাড়ি রকমের মিষ্টি প্রেমী। ভর দুপুরে একে-তাকে জিজ্ঞেসস করে মিষ্টির দোকান খুঁজে খেয়ে নিলাম দই-মিষ্টি। বিশেষ করে 'মালাইচপ' টা ছিল অসাধারণ। খাওয়ার পাশাপাশি দেখে নিলাম মিষ্টি বানানোর মহাযজ্ঞ। আমাদের এই ট্রিপে মিষ্টির স্পন্সর ছিল শ্রদ্ধেয় বড় ভাই জাবির ভাই। ভাই নিজেও একজন ভয়াবহ রকমের মিষ্টিপ্রেমী।

বান্দুরা থেকে সোজা চলে গেলাম সময়ের আলোচিত মিনি কক্সবাজার- 'মৈনট ঘাট'। দোহারে অবস্থিত মৈনট ঘাটটি আসলে 'গরীবের কক্সবাজার'। কূল-কিনারাহীন পদ্মার রূপ এখানে আসলেই সমুদ্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। পদ্মার উত্তাল ঢেউ আর ভেজাবালুর দীর্ঘ তীর কক্সবাজারের স্বাদ ফিরিয়ে দিতে পারে। আর পারে বলেই সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল।

মৈনটে দুটো হোটেল আছে। একটাতে বসে পড়লাম। ইলিশ ভাজা দিয়ে শুরু হল দুপুরের আহার। হোটেলের সুবিশাল টানা লম্বাটে জানালা দিয়ে পদ্মার সবুজ চারন ভূমি চোখে পড়ে। তারপরই দিগন্ত বিস্তৃত পদ্মা। মুখ দিয়ে যখন খাবার গিলছি, চোখ দিয়ে তখন সৌন্দর্য...

খাওয়ার পর্ব শেষ হতেই ডুবাডুবির পর্ব। পদ্মার দিকে মুখ করে হাতের বাম পাশে সবুজে মুড়ানো বিশাল এক চারণ ভূমি। অনেক গরুই দেখলাম আপন মনে ঘাস খাচ্ছে। এখানটায় ফুটবল বা ক্রিকেট খেলতে পারলে জোস হত। অনেকেই সাথে ফুটবল এনে ফুটবল নিয়ে মেতে উঠেছিল। আর আমরা পানিতে নেমে ডুবাডুবি। এতই ডুবিয়ে ছিলাম যে সন্ধ্যায় পুরোপুরি জ্বর চলে আসে। ডুবাডুবি শেষে ছোট্ট একটা হাঁটু পানির খাল পেরিয়ে পাশের একটা চরে গেলাম।

আমাদের মৈনট ঘাট ট্রিপের শেষ অধ্যায়টাও ছিল চমকপ্রদ। ছোট্ট একটা নৌকা নিয়ে আমরা পদ্মায় ঘুরতে শুরু করি। নৌকার একদম মাথায় গিয়ে আমি পাটাতনে শুয়ে পড়ি। মৃদু ঢেউয়ে নৌকা যখন দুলে তখন মনে হয় আকাশটাও দুলছে। নদীর দিকে তাকালে মনে হয় নদীর বুকেই বুঝি শুয়ে আছি। নৌকার অগ্রভাগে ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দটাকে মনে হয় অন্যকোন জগত থেকে আসা। ঠিক এই অনুভূতিটা একটা মানুষকে দিতে চাই। কিন্তু হায়, সে তো হারিয়ে গেছে কবেই!

পদ্মার ঢেউরে...
মোর শুন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা যারে
এই পদ্মে ছিলোরে যার রাঙা পা
আমি হারায়েছি তারে...

মৈনট ঘাটে নৌকা

বিকেল ৬ টার দিকে মৈনট থেকে ঢাকা ফেরার শেষ বাসে আমরা ফিরে আসি। গায়ে জ্বর বাড়ছে। তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরার দরকার। বিদায় মৈনট...

সূত্র: ট্যুর অন বাজেট

গোনিউজ২৪/পিআর

পর্যটন বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত