৩ মাঘ ১৪২৩, মঙ্গলবার ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ , ১:১৮ পূর্বাহ্ণ

বইঃ আমার কথা

জাতিগত ঐক্য : অপরিমেয় শক্তির আধার


গো নিউজ২৪ আপডেট: ০৬ জানুয়ারি ২০১৭ শুক্রবার
জাতিগত ঐক্য : অপরিমেয় শক্তির আধার

সৈয়দ আবুল হোসেন বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘আমার কথা’। এই বইয়ে তিনি নিজের চিন্তা, কর্মকাণ্ড, মূল্যবোধ, নানা অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখেছেন। এটি পড়লে তাকে যারা পুরোপুরি চিনেন না তাদের সুবিধা হবে। বইটি ‘gonews24.com’ ধারাবাহিকভাবে ছাপছে। বইটির আজকের পর্বে থাকছে- ‘জাতিগত ঐক্য : অপরিমেয় শক্তির আধার’

দেশ ও বিদেশের কিছু লোক বাংলাদেশের সরকার এবং প্রতিটি স্থানীয় সরকার সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করে। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের রাজনীতি ও নাগরিকদের প্রকৃতি ও সম্পর্ক নিয়েও তাদের ভুল ধারণা রয়েছে। স্বার্থের দ্বন্দ্ব অথবা অসুস্থকর প্রতিযোগিতা চলে আমাদের মাঝে, এমন ধারণা পোষণ করে কেউ কেউ এবং কতিপয় বিদেশি পত্রিকা আমাদের এমনভাবে তুলে ধরে, যেন এখানে ঠা-াযুদ্ধ বিরাজ করছে। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ সারাক্ষণ লড়াই করছে।

এটা কি আসলে ঠিক?

আসলে তারা বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী সম্পর্কে মিথ্যার মায়াজাল তৈরি করছে, যা স্পষ্টতই অজ্ঞতা, মূর্খতা এবং অনাকাক্সিক্ষত। আমাদের ইতিহাস, ভবিষ্যৎ-লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, নাগরিকদের চরিত্র এবং আমাদের নেতাদের নৈতিকতা সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, তারা যে স্পষ্টভাবে কিছুই জানে না, সেটাও তারা জানে না এবং বোঝে না। এটা সবার জানা দরকার আমাদের রাজনীতিক দলের মধ্যে যতই মতবিরোধ থাকুক না কেন, দেশপ্রেমের বেলায় আমরা এক হয়েই কাজ করি। জাতীয় স্বার্থগুলো সবাই অভিন্ন চেতনায় বিবেচনা করি। তবে এটা ঠিক যে, তন্মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা আছে। এমন অনেক দল আছে যারা স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গেও আঁতাত করে স্বাধীনতা রক্ষার অজুহাতে। এটি সাংঘর্ষিক।

বিদেশিরা মাঝে মাঝে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর চেষ্টা করে। তারা অনেক কথাও বলে। তাদের মত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে তাদের এটা মনে রাখতে হবে, আমাদের এক দেশ, এক সংবিধান, এক পতাকা এবং একটিই লক্ষ্য। সরকারের অর্জনে ও সফলতায় স্থানীয় সরকারগুলো গর্ববোধ করে, যা বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিককেও গর্বিত করে তোলে। আমরা বাঙালি, আমরা আমাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন।

আমরা শুধু বাঙালি নই। আমরা স্বাধীন, আমরা বাংলাদেশি। আমাদের সব নাগরিক তাদের স্বার্থ ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তাদের নেতা এবং সরকারের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়ে উপভোগ করে। উন্নয়ন, সহযোগিতা, সমৃদ্ধি এবং অগ্রগতির জন্য দেশ স্বাধীন করা হয়েছিল। আমাদের এক দেশ, কেননা আমরা মনে করি, আমাদের ঐক্য খুবই দৃঢ় এবং শক্তিশালী। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে কেবল কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করে আমরা পাকিস্তানকে পরাজিত করে স্বাধীনতা লাভ করিনি। এখনও আমাদের দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটি রক্ষার জন্য প্রত্যেক নাগরিক তার নিজের জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত।

আমাদের স্থানীয় প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হয় পরস্পরের সহযোগিতায়। সরকার দেশের উন্নয়নে সহযোগিতা করে, নিয়ম-নীতি ও আইনি কাঠামো প্রদান করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে উপস্থাপন করে। এতকিছুর পরও, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকি একটি সত্যিকার ও নিশ্চিত লক্ষ্যকে সামনে রেখে, আর তা হচ্ছে, এদেশের প্রতিটি ইঞ্চির জন্য প্রবল মমতা এবং পুরো দেশের প্রতিটি কণার জন্য মানবসম্পদের উন্নয়ন।

আমি চীনের বোয়াও ফোরামের সম্মেলনে যখন অংশ নিই, তখন শীর্ষ সম্মেলনে অনুপ্রাণিত হয়ে এই বইটি লেখার পরিকল্পনা করি। জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ঐক্যের মাধ্যমে বিশ্বের উন্নয়ন- বোয়াও ফোরামের লক্ষ্য। আর এই শক্তির সঠিক উদাহরণ হচ্ছে এটি। এটা বিভিন্ন দেশের সরকার ও সরকারের কর্মকর্তৃবৃন্দকে অভিন্ন ছাদের নিচে নিয়ে এসেছে, যার মাধ্যমে তথ্য, অভিজ্ঞতা এবং সফল অভিজ্ঞতা পরস্পরের মধ্যে আদান-প্রদান সম্ভব হয়েছে। এটাই আমরা চেয়েছিলাম। একই লক্ষ্য নিয়ে আপন শক্তিতে কাজ করে যাব। এ অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর বেড়াজাল থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। এটি খুব সহজে সম্ভব, আমরা বোয়াও ফোরামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছি- এশিয়ান অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক।

আমি আমার অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বলি, তাঁরা যেন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের কথা ভাবেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করেন। তাহলে প্রতিষ্ঠান দাঁড়াবেই। তেমনি সরকারের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর উদ্দেশে বলতে চাই, আপনারাই হচ্ছেন আমাদের দেশের অগ্রগতি এবং উন্নয়নের চালক। প্রক্রিয়ার অগ্রগতি, সেবার মান উন্নয়ন এবং যৌথনীতির মাধ্যমে আপনারা দেশের নাগরিকদের জীবনকে আরও আরামদায়ক, আরও শান্তিময় এবং আরও সুখী করে তুলতে পারেন। আমাদের এক দেশ, কেননা আমরা মনে করি, আমাদের ঐক্য খুবই দৃঢ় এবং শক্তিশালী। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে কেবল কিছু চুক্তিতে স্বাক্ষর করেই ঐক্যবদ্ধ হইনি। বরং আমরা স্বাধীন হওয়ার পরও নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেই এগিয়ে চলেছি। ভবিষ্যতেও চলব।

২০১১ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত আদমশুমারির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার ২.২ শতাংশ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলন অনুযায়ী জুন ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে জনসংখ্যা হয়েছে ১৫.৬৪ কোটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (ঈওঅ) প্রাক্কলন অনুযায়ী ১৫.৮৫ কোটি। এই হিসাবে বাংলাদেশ পৃথিবীর ৮ম জনবহুল দেশ। জনঘনত্ব প্রতি বর্গমাইল এলাকায় ২৪৯৭ জনের অধিক।

জাতিগতভাবে বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ অধিবাসী বাঙালি। বাকি ২ শতাংশ অধিবাসী বিহারি বংশোদ্ভূত এবং বিভিন্ন উপজাতি সদস্য। দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ১৩টি উপজাতি রয়েছে। এদের মধ্যে চাকমা সংখ্যাগরিষ্ঠ। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরের উপজাতিগুলোর মধ্যে গারো ও সাঁওতাল উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও, কক্সবাজার এলাকায় বার্মা থেকে বিতাড়িত স্বল্পসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে। দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা, যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা। সরকারি ও ব্যবসায়ী কাজকর্মে ইংরেজিও ব্যবহৃত হয়। তবে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে বৈদেশিক যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সরকারি কর্মকা-ে বাংলা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

আমাদের বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর প্রধান ধর্মবিশ্বাস ইসলাম (৮৯ শতাংশ); এরপরই রয়েছে হিন্দুধর্ম (৯ শতাংশ)। বাকি ১ শতাংশ বৌদ্ধ, খ্রিস্টান অথবা অগ্নি-উপাসক। মুসলমানদের মধ্যে অধিকাংশ সুন্নি মতাবলম্বী। মোট জনগোষ্ঠীর ২১.৪ শতাংশ শহরে বাস করে; বাকি ৭৮.৬ শতাংশ গ্রামাঞ্চলের অধিবাসী।

আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, প্রতিটি নাগরিক যেন সরকারি লেনদেন (কেন্দ্রীয় ও স্থানীয়) এবং প্রত্যেক সরকারি কর্তৃপক্ষের (কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় ) কাছে সকল কাজ সহজে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। এ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আমাদের রয়েছে অসাধারণ সম্ভাবনা, আধুনিক পদ্ধতি, সৃজনশীল মনমানসিকতা, দক্ষ লোক এবং শক্তিশালী রাজনীতিক অবস্থান।

আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম জাতিতে পরিণত হওয়া, কারণ, বাংলাদেশের জনগণ সেরাদের সেরা হওয়া ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করে না। তাদের সে যোগ্যতা রয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা এর প্রমাণ দেখিয়েছি। আমাদের নেতৃবৃন্দ এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থানকে আরও সুসংহত করতে সক্ষম হয়েছেন।

আমরা বাঙালি, বাংলাদেশি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই এক। আমরা একজাতি, একভ্রাতার মতো অভিন্ন জ্ঞাতি- এ বোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বাংলাদেশ ও বাঙালি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হবে। কেউ আমাদের লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে পারবে না। কারণ আমরা আমাদের লক্ষ্যকে ঐক্যের অপরিমেয় শক্তির পতাকা করে রাখতে সক্ষম।