৪ কার্তিক ১৪২৪, বৃহস্পতিবার ১৯ অক্টোবর ২০১৭ , ১১:২৮ পূর্বাহ্ণ

চিকিৎসা বিজ্ঞানে ঢাবির সায়েবার বিস্ময়কর আবিষ্কার


গো নিউজ২৪ | ফারজানা আক্তার আপডেট: ১০ আগস্ট ২০১৭ বৃহস্পতিবার
চিকিৎসা বিজ্ঞানে ঢাবির সায়েবার বিস্ময়কর আবিষ্কার

ঢাকা: একটা সময় ছিলো যখন মাতৃমৃত্যর হার ছিলো খুব বেশি। সে সময়টা খুব কাছেও নয়, আবার খুব দূরেও নয়। এইতো ৩০-৪০ বছর আগের কথা, মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল প্রসব পরবর্তী রক্তপাত। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় পোস্ট পারটাম হেমোরেজ বা পিপিএইচ। পিপিএইচের চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল বেশ ব্যয়বহুল। অনুন্নত দেশের জনগণের জন্য যা বহন করা সম্ভব না।

বেশিরভাগই মায়েরাই সন্তান জন্মদানের সময় মারা যেতেন। কারণ তারা এই চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারতেন না। মৃত মায়ের সন্তানেরাও বেশিদিন বাঁচতো না। কখনো কখনো মাকে বাঁচাতে তার জরায়ু কেটে ফেলে দিতে হতো। তাতে করে তিনি আর কখনো মা হতেন পারতেন না।

ভয়াবহ এই সমস্যাটি খুব ভাবাচ্ছিলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্স বিভাগের অধ্যাপক ডা. সায়েবা আকতারকে। সময়টা ২০০০ সাল। ডা. সায়েবা পিপিএইচের জন্য স্বল্প খরচে বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি খুঁজছিলেন। রক্তপাত বন্ধের প্রধান উপায় হলো প্রেশার বা চাপ দেয়া। কোনোভাবে যদি জরায়ুর ভেতরে কোনোকিছু দিয়ে চাপ দেয়া যেতো তাহলো রক্তপাত বন্ধ হতো। কিন্ত মানুষের শরীরে তো যা ইচ্ছে তাই ঢুকিয়ে চাপ দেয়া যায় না। এখানে আছে মেডিকেল এথিক্স, সঙ্গে আরো অনেক ব্যাপার-স্যাপার।

ডা. সায়েবার হঠাৎ মনে হলো বাচ্চারা তো ফ্রি কনডম দিয়ে বেলুন বানিয়ে খেলে। কনডম একটা এফডিএ অনুমোদিত মেডিকেল ডিভাইস। তিনি ভাবতে থাকেন যদি কনডম জরায়ুর ভিতরে ঢুকিয়ে পানি দেয়া যায়, তাহলে এটা একসময় জরায়ুর দেয়ালে চাপ দেবে। ফলে, রক্তপাত বন্ধ হবে। তিনি কনডমের ভিতরে পানি ঢুকিয়ে এর স্থিতিস্থাপকতা পরীক্ষা করলেন।

পরদিন ডা. সায়েবা অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে দেখেন একজন নারীকে টোটাল হিস্টেরেকটমির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। তার জরায়ু কেটে ফেলে দেয়া হবে। তার প্রসব পরবর্তী রক্তপাত বন্ধ হচ্ছিলো না। ম্যাডাম তখন প্রথমবারের মতো কনডম টেম্পোনেড ব্যবহার করলেন। আশ্চর্যজনকভাবে ১৫ মিনিটের মধ্যেই রক্তপাত বন্ধ হলো। রোগিটি তার জরায়ুসহ সুস্থভাবে বাড়ি ফিরেছিলেন। 

এরপর ২০০১ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত অধ্যাপক ডা. সায়েবা আকতারের নেতৃত্বে ২৩ জন রোগীকে এই চিকিৎসা দেয়া হয়। তারা প্রত্যেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।

২০০৩ সালে ডা. সায়েবার এই আবিষ্কার ও গবেষণা কর্মটি মেডস্কেপ মেডিকেল জার্নালে “Use of condom in the control of massive postpartum hemorrhage. Medscape General Medicine 2003; 5(3): 38.” শিরোনামে প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি মূল গবেষণা নিবন্ধ হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব গাইনি অ্যান্ড অবসেও প্রকাশিত হয়। এরপর রিভিউ আর্টিকেল হিসেবে প্রকাশিত হয় ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালেও। বিশ্বজুড়ে এই পদ্ধতি সায়েবাস মেথড হিসেবে পরিচিতি পায়।

আন্তর্জাতিক জার্নালে তার এ আবিষ্কারের খবর প্রকাশ হওয়ার পর বিভিন্ন দেশের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা ডা. সায়েবাকে আমন্ত্রণ জানান তাদের নিজ নিজ দেশে। সেসব দেশে গিয়ে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষিত করতে থাকেন তিনি।

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ডা. সায়েবার এই চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে এফসিপিএস ডিজার্টেশন, এমএস থিসিস, পিএইচডি থিসিস হয়েছে। ডা. সায়েবাকে রয়্যাল কলেজ অব অবস অ্যান্ড গাইনোকলজিস্ট থেকে অনারারি ফেলোশিপও দেয়া হয়েছে।

গেল ২ আগস্ট আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি একটি ডকুমেন্টারি প্রকাশ করে। এটা ছিল অ্যানি মুঞ্জেলা নামে কেনিয়ার একজন প্রসূতির। সায়েবাস মেথড অনুযায়ী প্রসব পরবর্তী রক্তপাত বন্ধ করা হয়েছিল। একইভাবে ছয়জন মায়ের জীবন বেঁচে গিয়েছিল। সূত্র: সংগ্রহ।

গোনিউজ/এন 

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত