১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, বুধবার ২৪ মে ২০১৭ , ৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ

চাচা আমাকে পানি খাওয়াও, খুনের আগে ভাতিজার আকুতি


গো নিউজ২৪ আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০১৭ শুক্রবার
চাচা আমাকে পানি খাওয়াও, খুনের আগে ভাতিজার আকুতি

‘চাচা আমাকে পানি খাওয়াও, না হলে গোসল করাও। আমি আর হাঁটতে পারছি না।’ কিন্তু ৯ বছরের নিঃষ্পাপ শিশুটির এই আকুতিতে মন গলেনি চাচা সুজনের। সুজন তখন খুনের নেশায় মত্ত। যেন আপন ভাতিজা মাহিনকে খুন করতে পারলেই তার সকল ক্ষোভ মিটে যাবে। হাতে আসবে লাখ লাখ টাকা।

ঠাণ্ডা মাথার খুনি সুজন ভাতিজাকে খুন করেই তার সন্তানহারা ভাই-ভাবী ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় মাহিনকে খুঁজতে গেছে। নৃশংস এই ঘটনা ঘটানোর পরও বিন্দু পরিমাণ ভীত-সন্ত্রস্ত মনে হয়নি তাকে। বরং মাহিনদের বাড়িতেই খেয়েছেন নিয়মিত। এসব কথা জানিয়েছে, নিহত মাহিনের আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা।

গত ১২ই মার্চ দক্ষিণ মিরপুর পাইকপাড়া এলাকার আলো পথ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মাহিন বিদ্যালয় থেকে বাসায় ফেরার সময় অপহৃত হয় চাচা সুজনের হাতে। এরপর সে ও তার আরো দুই বন্ধু মিলে নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ চাপা দিয়ে রাখে। পরে তারা মুক্তিপণ দাবি করে মাহিনের রিকশাচালক পিতা মহিউদ্দিনের কাছে।

গত ২২ দিন ধরে পরিবারের লোকজন নাওয়া-খাওয়া ভুলে মাহিনকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। একই সময়ে পুলিশও ঘটনার অনুসন্ধান করতে থাকে। তারা জানতে পারেন মাহিনের চাচা সুজন এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। পরে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অপহরণের কথা স্বীকার করে। বর্ণনা দেয় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের। তার স্বীকারোক্তি মোতাবেক গত মঙ্গলবার রাতে পুলিশ সাভারের হেমায়েতপুর এলাকার চামড়া শিল্প নগরীর পাশ থেকে শিশুটির কঙ্কাল উদ্ধার করে। এদিকে একমাত্র সন্তানের এই করুণ পরিণতিতে শয্যাশায়ী মা লুবনা ও পিতা মহিউদ্দিন।

গতকাল মিরপুর দক্ষিণ পাইকপাড়ার আল আমিন রোডে অবস্থিত মাহিনদের টিনশেড ভাড়া বাসায় গিয়ে এই দৃশ্য চোখে পড়ে। মহিউদ্দিন বিলাপ করতে করতে বলেন, আমার রক্তই, আমার রক্ত ধ্বংস করেছে। তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। আত্মীয়-স্বজনরা জানান, পুত্রশোকে বুধবার রাতেই একবার স্ট্রোকও করেন মহিউদ্দিন।

শিশু মাহিনের আত্মীয়-স্বজন, পিতা-মাতা ও প্রতিবেশীরা জানান, মাহিনের চাচারা ৪ ভাই। এদের মধ্যে মাহিনের পিতা মহিউদ্দিন সবার বড়। তিনি পেশায় রিকশা চালক। তারা মেজো চাচা মনা পাশাপাশি আরেকটি টিনশেড বাসায় ভাড়া থাকেন। পেশায় তিনিও রিকশাচালক। ছোট চাচা সুমন গ্রামের বাড়ি ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার হরিগঞ্জ গ্রামে ব্যবসা করেন। আর সেজো চাচা সুজন (২০)। সেও তার বড় ভাইয়ের বাসাতেই ছিল। আগে কাজ করতো। কিন্তু বছর তিন আগে এলাকার বখাটেদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে সে। মাদকের নেশায় জড়িয়ে যায়। তখন থেকে কাজও বন্ধ করে দেয়। গভীর রাতে বাসায় ফেরে। এলাকার নানা জনের কথাও শুনতে হয় বড় ভাই মহিউদ্দিনকে। এ নিয়েই বড় ভাই মহিউদ্দিনের সঙ্গে সুজনের মনোমালিন্য হয়। তখন সে মেজো ভাই মনার বাসায় ওঠে। মাদক সেবন নিয়ে মেজো ভাইয়ের সঙ্গেও মনোমালিন্য হয়। এরপর গত ৫-৬ মাস আগে সে এলাকার একটি মেসে ওঠে। কিন্তু মনোমালিন্য হলেও সে প্রায়ই ভাইদের বাসায়ই খাওয়া-দাওয়া করতো। নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল।  

নিহত মাহিনের মা লুবনা জানান, তার ছেলের স্কুল ছুটি হয় সাড়ে ১১টার দিকে। ১২ই মার্চ তার ছেলেকে স্কুল থেকে নিয়ে আসার জন্য তার যেতে দেরি হয়। পরে তিনি বাড়ি ফেরার সময় স্থানীয় নূর মসজিদের সামনে দেখা হয় দেবর সুজনের সঙ্গে। তাকে জিজ্ঞেস করলে জানায়, মাহিন বাড়ি চলে গেছে। তার হাতে সে ১০টি টাকাও দিয়েছে। কিন্তু বাড়ি ফিরে ছেলেকে না পেয়ে ভেবেছিলেন আশেপাশের আত্মীয়-স্বজনের বাসায় গেছে। তখন তিনি বিভিন্ন স্বজনের বাসায় খুঁজতে যান। পরে তাকে না পেয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পরে ওইদিন বিকাল তিনটা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এলাকায় মাইকিং করা হয়।

স্কুলের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা জানায়, মাহিন এক ব্যক্তির হাত ধরে চলে গেছে। স্থানীয় বউ বাজারের সামনে থেকে আরেক ছাত্রীও তাদের দেখেছে। কিন্তু কোথাও ছেলের খোঁজ না পেয়ে রাতেই মিরপুর থানায় একটি জিডি করেন। জিডি করতে সুজনও সঙ্গে যায়। পরদিন ১৩ই মার্চ বিকাল ৪টার দিকে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে মাহিনের পিতা মহিউদ্দিনের নম্বরে ফোন আসে। মাহিনের মুক্তিপণ বাবদ ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। গরিব মানুষ এতো টাকা কিভাবে দেবো জানালে, ফোনের ওপাশ থেকে গালিগালাজও করা হয়। বিষয়টি মিরপুর থানায় জানানো হয়। র‌্যাব-২ অফিসেও একটি অভিযোগ দেয়া হয় বলে স্বজনরা জানান। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করতে থাকে পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনরা। বিভিন্ন জায়গায় খুঁজতে চাচা সুজনও যায়। মাহিনের মা কান্নাকাটি করলে সুজন তাকে সান্ত্বনা দেয়। দৃঢ়তার সঙ্গে বলে, ভাতিজাকে খুঁজে বের করবেই।

লুবনা জানান, ছেলে হারানোর পরও প্রতিদিন সুজন তার বাসায় এসে খেয়ে যেতো। তার চালচলনে কখনো মনে হয়নি সে মাহিনকে হত্যা করতে পারে। বরং সেও নানা জায়গায় খুঁজতে যেতো। তাদের সঙ্গে সুজনের কোনো শত্রুতা ছিল কিনা জানতে চাইলে লুবনা বলেন, সে গাঁজা, মদ খেতো। নিষেধ করায় তার ভাইয়ের সঙ্গে মনোমালিন্য ছিল। ভাইয়ের সঙ্গে কথাও বন্ধ ছিল। কিন্তু বাড়িতে এসে ঠিকই খাওয়া-দাওয়া করতো। ছেলের সঙ্গে ও আমার সঙ্গে কথা বলতো। কখনো মনে হয়নি সে মাহিনকে হত্যা করতে পারে। মাহিনের মা বলেন, তার শাশুড়ি পাগল ছিল। গত ৫ বছর আগে মারা গেছে। তিনিই দেবরগুলোকে মায়ের স্নেহে বড় করেছেন। সুজনকেও তিনি ছেলের মতোই আদর করতেন।

শয্যাশায়ী মাহিনের পিতা মহিউদ্দিন জানান, ছেলের নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তিনি হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়িয়েছেন। সাতক্ষীরাসহ নানা জায়গায় গেছেন। তিনি বলেন, মাহিন তাদের বংশের একমাত্র ছেলে সন্তান। কোনো ভাইয়েরই ছেলে নেই। তাই সে খুব আদরের ছিল। প্রতিবেশীরাও তাকে খুব আদর করতো। তার ঘাতক ভাই সুজন এমন কাজ করতে পারে কেউ-ই ভাবেনি। তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার রক্তই আমার রক্ত ধ্বংস করেছে। তিনি আরো বলেন, সুজন জানতো আমার এতো টাকা নেই, তাও কেনো হত্যা করলো বুঝতে পারলাম না। সে নেশা করায় তাকে বকাঝকা করেছি। এছাড়া আর কোনো ঘটনা ঘটেনি।
  
এদিকে ফোন কলের সূত্র ধরে পুলিশ ওই এলাকার দুই বখাটে সাব্বিরকে আটক করে। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারে সুজনও এই ঘটনায় জড়িত। সুজনকে থানায় যেতে বললে থানায় যায়। তখনো সুজনের আচার-আচরণে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয়নি। পরে পুলিশ তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অপহরণের পর হত্যার কথা স্বীকার করে। তদন্ত কর্মকর্তা মিরপুর থানার এসআই মতিউর রহমান বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুজন হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তার অপর দুই সহযোগী সাব্বির ও শহিদুলও মাদকাসক্ত। টাকার জন্যই তারা তিনজন মিলে হত্যা করে মুক্তিপণ চেয়েছিল।

তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে সুজন হত্যার বর্ণনা দিয়ে জানিয়েছে, স্কুল ছুটির পর সে মাহিনকে নিয়ে যায়। এরপর শ্যামলী হয়ে সাভারের হেমায়েতপুরে নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে হেঁটে ওই এলাকার চামড়া শিল্পনগরীর দেয়াল ঘেঁষা নদীর তীরে নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। পথিমধ্যে মাহিন সুজনকে বলেছে, চাচা আমাকে পানি খাওয়াও, নাহলে গোসল করাও। আমি আর হাঁটতে পারছি না। বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথাও বলে সে। কিন্তু তাতে তার মন গলেনি। এরপর ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে সুজন প্রথমে গেঞ্জি দিয়ে মাহিনের মুখ ঢেকে ফেলে। সুজনের সহযোগী অপর ঘাতক শহিদুল শিশুটির মুখ চেপে ধরে। আর অপর ঘাতক সাব্বির গার্মেন্টের ফিতা গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

ঘটনাস্থলেই একটি গর্তে রেখে সেখানে থাকা নদীর বাঁধ দেয়া স্লাব দিয়ে গর্তের মুখ বন্ধ করে দেয়। ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরো জানান, শহিদুল মাহিনের পিতার নম্বরে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করেছিলো। রাজু নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে সে পুরাতন নম্বরের এই সিম কার্ডটি নিয়েছিলো। সে মোট ৫ বার ফোন করেছে। ৫ লাখ টাকা দাবি করলেও তাদের টার্গেট ছিল ৩ লাখ টাকা।

এসআই মতিউর রহমান বলেন, নেশার টাকার জন্যই তারা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটায়। আটক সাব্বির ও সুজন হত্যার কথা স্বীকার করেছে। শহীদুল এখনো পলাতক রয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, শুধুমাত্র টাকার জন্যই তারা অপহরণ করেছে। অপহরণের দিনই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এর পরদিন তারা মুক্তিপণ দাবি করে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। মাহিনের পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবি করেন।