৬ ভাদ্র ১৪২৪, সোমবার ২১ আগস্ট ২০১৭ , ১১:৫২ অপরাহ্ণ

খুব সহজে চিনে ফেলুন মিথ্যাবাদীকে


গো নিউজ২৪ | ফারজানা আক্তার আপডেট: ১১ মার্চ ২০১৭ শনিবার
খুব সহজে চিনে ফেলুন মিথ্যাবাদীকে

বর্তমান সময়ে আমাদের সবার জীবনযাপনে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। সব বিষয়গুলোকে একপাশে রেখে দিয়ে, আজ শুধু একটি বিষয় নিয়ে কথা বলবো। সেটা হলো-মিথ্যা বলা। আজকাল আমরা খুব বেশি মিথ্যা বলি কারণে অকারণে। সব সময় নিজেকে অন্যের কাছে মনি-ঋষি টাইপের প্রমাণ করার চেষ্টা করি। এই জন্য প্রতিনিয়ত আমাদের বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা বলতে হয়। আমাদের আসে পাশে এমন কিছু মানুষ আছে যাদের কথাবার্তা শুনে অনেকটাই মিথ্যা মনে হয় কিন্ত আমরা এই বিষয়ে একেবারে নিশ্চিত হতে পারি না। 

একজন মানুষ সত্যি বলছে কি মিথ্যা বলছে সেটা একটু মনোযোগ দিলেই আমরা খুব সহজে বুঝতে পারবো। আজ এই বিষয়টা সম্পর্কে জানবো।  

মাইক্রো এক্সপ্রেশন হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষের বিভিন্ন অভিব্যক্তি থেকে তার মনোভাব সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়। মাইক্রোএক্সপ্রেশন হচ্ছে সাইকোলজির অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায়। একজন মিথ্যাবাদীকে সহজে চেনার জন্য এর কোনো জুড়ি নেই। অপরাধীর কাছ থেকে সত্য কথা বের করার জন্যে মাইক্রোএক্সপ্রেশন হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম প্রক্রিয়া। 

একজন মানুষ মিথ্যা বলছে নাকি সত্যি বলছে তা বের করার প্রদ্ধতিকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। 

১. বডি ল্যাংগুয়েজ: 

(ক) যে মানুষটি মিথ্যা বলছে, সে সাধারণভাবে চোখে চোখ রেখে কথা বলবে না, অর্থাৎ আই কন্ট্যাক্ট করবে না । যদি আই কন্ট্যাক্ট করেও তাহলে মিথ্যার মূল অংশটুকুতে সে চোখ ফিরিয়ে নিবে কিংবা ওই মুহূর্তে চোখের পলক ফেলবে। 

(খ) ফিজিক্যাল এক্সপ্রেশন লক্ষ্যণীয় হবে, শরীরের কোনো অঙ্গ খুব বেশি নড়াচড়া করবে না। হাত-পা ছড়ানো অবস্থায় থাকলে সেগুলো কাছাকাছি টেনে নেবে। ঘন ঘন চুলে হাত দেয়ার অভ্যাস না থাকলে এবং কোন বিশেষ কথা বলার সময় সেটা করলে সেটা মিথ্যা হবার সম্ভাবনা বেশি।

(গ) কারও যদি হাত ভাঁজ করার অভ্যাস না থাকে, তাহলে বিশেষ কোনো কথা বলার সময় হাত ভাঁজ করলে মোটামুটি আশি ভাগ সম্ভাবনা সে কথাটা মিথ্যা।

(ঘ) সহজ ভঙ্গিতে উত্তর দিতে চাইবে, ব্যাপারটাকে তুচ্ছ করার চেষ্টা করবে অথবা হাত নেড়ে পাত্তা না দেয়ার ভঙ্গি করবে।

২. ইমোশনাল স্টেটের পরিবর্তন:  

(ক) এক্সপ্রেশন ও কথার মধ্যে সময়ের অসামঞ্জস্যতা থাকবে, সাধারণভাবে কথা বলার পর সেটার অভিব্যক্তি ফুটে উঠবে। যেমন- ‘আমার কিন্তু এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না ’ একটু বিরতি, তারপর রাগের চিহ্ন ফুটে ওঠা, এর মানে কথাটা মিথ্যা হবার সম্ভাবনা বেশি। এই অভিব্যক্তি বেশিক্ষণ থাকবে না।

(খ) চট করে এক্সট্রিম ধরনের এক্সপ্রেশনের পরিবর্তন হবে। যেমন- হঠাৎ খুব রেগে যেতে যেতে কেঁদে ফেলা, কিংবা হাসতে হাসতে হঠাৎ বিষম খাওয়া, কাঁদতে কাঁদতে রেগে যাওয়া। উল্লেখ্য, এক্সপ্রেশনের পরিবর্তন না হলে কিংবা কোনো নির্দিষ্ট একটা এক্সপ্রেশন মোটামুটি কিছু সময় ধরে স্থায়ী হলে নব্বই ভাগ সম্ভাবনা অভিযুক্ত নির্দোষ অর্থাৎ সে সত্য বলছে।

(গ) শুরুতে নির্লিপ্ত থাকলেও পরবর্তীতে অধিক রেগে যাবে কিংবা অনবরত নির্লিপ্ত থাকবে। তবে রাগ থেকে হঠাৎ নির্লিপ্ত হয়ে গেলে অভিযুক্ত নির্দোষ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যে নির্দোষ সে কখনোই অভিযোগের ফলে নির্লিপ্ত বা সহজ ভঙ্গিতে থাকবে না, রেগে যাওয়ার সম্ভাবনা অন্তত নব্বই ভাগ।

৩. বাচনভঙ্গি:  

(ক) মিথ্যাবাদী প্রশ্নকর্তার কথাকেই উত্তর দেয়ার সময় পুনরাবৃত্তি করবে। যেমন- ‘তুমি কি এই কথাটা বলেছো ?’ ‘না, আমি এই কথাটা বলি নাই ’। এই রিপিটশনের ব্যাপারটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা মিথ্যা হয়ে থাকে। তবে শুধু ‘না’ বলা মানেই যে সত্যি, সেটাও নিশ্চিত করে বলা যায় না।

(খ) ‘আমি এ ব্যাপারে আর কোনো কথা বলতে চাই না,’ কিংবা ‘আমি আর এ ব্যাপারে তর্ক করতে চাই না,’ ‘তুমি আমাকে এ ব্যাপারে আর কোনো কথা বললে আমি খুব কষ্ট পাব,’ এই ধরনের সমাপ্তিমূলক কথার কারণ মূলত হয়ে থাকে অভিযুক্তের দোদুল্যমান মনে অবস্থা। এক্ষেত্রে কথাগুলো মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

(গ) সাধারণত অন্যের মাধ্যমের নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় যেসব ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রশ্নকর্তা ছাড়া অন্য কারও মাধ্যম সেটা করলে কথাটা মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা অন্তত আশি ভাগ। যেমন -“রফিক, করিমকে জিজ্ঞেস করে দেখো আমি কেমন মানুষ। এ ধরনের কথা মোটামুটি নিশ্চিত মিথ্যা।”

(ঘ) মিথ্যাবাদী সাধারণতভাবে প্রশ্নকর্তার চুপ করে থাকা সহ্য করে থাকতে পারে না যতোক্ষণ না সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হচ্ছে, সে বিভিন্নভাবে অভিযোগ সম্বন্ধে প্রশ্নকর্তা কতোটুকু জানে জানার চেষ্টা করে কিংবা নিজে থেকেই অভিযোগ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দিতে থাকে। এই তথ্য দেয়ার সময় সে কখনো আই কন্ট্যাক্ট করে না, শরীরের নড়াচড়া খুব সীমিত হয়। কোনো কারণে চুপ করে থাকলেও তার মধ্যে অস্থিরতা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।
(ঙ) ‘আমাকে তুমি বিশ্বাস কর না?’ ‘আমি কি তোমার সাথে মিথ্যা বলতে পারি?’ ‘সত্যি করে বলছি...’ ‘আমি তোমার কাছ থেকে এভাবে আশা করিনি,’ ইত্যাদি ধরনের বাক্য ব্যবহার করলে সে কথা মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

(চ) ‘কোথা থেকে শুনেছ?’ ‘কে বলল?’ ধরনের প্রশ্ন করতে থাকলে এবং এ ধরনের প্রশ্ন রিপিট করা হলে নব্বইভাগ সম্ভাবনা অভিযুক্ত মিথ্যা বলছে। 


৪. পারস্পরিক ইন্টারেকশান: 

(ক) মিথ্যাবাদী নিজে প্রশ্নের জবাব দিতে পারুক বা না পারুক, একই ব্যাপারে প্রশ্নকর্তাকে প্রশ্ন করার অধিকার থাকলেও সে তা করবে না এবং এনকাউন্টার ধরনের কিছু করতে যাবে না। 

(খ) মিথ্যাবাদী সাধারণত নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে এমন কোনো ঘটনার কথা বলে, যার চরিত্রদের প্রশ্নকর্তা জানে না। একই ধরনের অভিযোগে ওই চরিত্রদের কাউকে অভিযুক্ত করে। 


৫. সাইকোলজিক্যাল প্রোফাইল: 

(ক) অভিযুক্তের দেয়া বিভিন্ন তথ্য, সংখ্যার মধ্যে কোন না কোনো ধরনের মিল থাকবে। এই মিল ভেবে বের করার জন্যে অভিযুক্ত কিছু সময়ও ব্যয় করবে।

(খ) অভিযুক্তের সামনে গ্লাস, চায়ের কাপ, বালিশ ও বই ইত্যাদি থাকলে সেসব খুব গুরুত্বপূর্ণ। এসবের সাথে তার ইন্টারেকশান সাবধানে লক্ষ্য করতে হবে। মিথ্যা কথা বলার সময় তার হাতে এগুলোর কোনটা থাকলে সে সেটা দুজনের মাঝখানে রেখে দিবে, চায়ের কাপ হাতে থাকলে চুমুক না দিয়েই টেবিলে রেখে দিবে। একটু পরই যদি আবার চায়ের চাপ হাতে নেয় চা খাওয়ার জন্যে এবং খাওয়া শুরু করে, তাহলে তার মিথ্যাবাদী হওয়ার সম্ভাবনা আশি ভাগ। অথবা কাপ কিংবা গ্লাসে দু-এক কাপ চুমুক দিয়ে রেখে দেয়া মানে কথাগুলো মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি কিন্তু অভিযুক্ত যদি কাপ/গ্লাস নামিয়ে না রাখে বা পুরোটা খেয়ে নেয়, তাহলে সে নিশ্চিত সত্য বলছে। তবে এক্ষেত্রে একটা খুব সহজ কাজ করা যায়, কোন পানীয় খাবার সময় অকস্মাৎ অভিযোগ করলে প্রকৃত দোষীর বিষম খাওয়ার, কিংবা তৎক্ষণাৎ কাপ/গ্লাস নামিয়ে রাখার সম্ভাবনা শতভাগ। পৃথিবীর মোটামুটি সব ইন্টারোগেশনেই তাই প্রশ্নকর্তা ও অভিযুক্তের মধ্যে চা ও সিগারেট ইত্যাদি থাকে। ক্রিমিনাল সাইকোলজির জন্যে এটা খুব গুরুত্ব্পূর্ণ। হাওয়ার্ড টেটেন নামক এক বিখ্যাত ইন্টারোগেটর অভিযুক্তের খাওয়ার ধরন দেখেই দোষ বিচার করতেন।

(গ) অভিযুক্তের দৃষ্টিভঙ্গি খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি সে তার কথার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী থাকে, তাহলে প্রশ্নকর্তাকে বোঝানোর চাইতে নিজের প্রেজেন্টেশন নিয়ে বেশি মনযোগী থাকবে। যদি সে মিথ্যা কথা বলে, তবে প্রশ্নকর্তাকে বোঝানোই হবে তার ধ্যান-জ্ঞান।
(ঘ) অভিযুক্তের কোনো একটা কথা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হলে মোটামুটি নিশ্চিত সে আরও অনেকগুলো মিথ্যা কথা বলেছে এবং তার প্রতিটা কথাই মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

উপরের শ্রেণিবিন্যাসটা মূলত করেছেন ডেভিড জ. লিবারম্যান, আর ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনের অন্যতম দিকপাল বলা হয় পল একম্যান কে। এখানে কিছু প্রাথমিক পদ্ধতি দিলাম মিথ্যা সনাক্তকরণের। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার শুধু মাইক্রোএক্সপ্রেশন পর্যবেক্ষণ করাই না; সেগুলো কে খাপে খাপে বসিয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসা। এই কাজটুকুই সবচেয়ে কঠিন। এখন কেউ বললো, ‘সত্যি করে বলছি আমি ওই জায়গায় যায় নাই।’ তার মানে এটা নয় যে সে মিথ্যাবাদী। এই কথার অর্থ হলো-তার অপরাধী হবার সম্ভবনা বেড়ে গেল। 

পজেটিভ-নেগেটিভ মিলিয়ে, অনেক হিসাব-নিকাশ করে তবেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত। তবে এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট চর্চা থাকা উচিত। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় অভিযুক্ত একই সাথে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে, যার ফলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যায়। একজন নির্দোষ মানুষকে সাইকোলজির প্যাঁচ কষে দোষী বানিয়ে ফেলা খুবই খারাপ ধরনের অপরাধ। ঠিকমতো চর্চা করলে ভুল হবার সম্ভাবনা বেশ কমে যায়।

লেখক: ফারজানা আক্তার, ওয়েব ডেভলপার।

গোনিউজ২৪/এম