১ পৌষ ১৪২৪, শনিবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ , ৯:১৮ পূর্বাহ্ণ

কোঠায় চাকরি পেয়ে বাবাকেই ভুলে গেলেন ২ পুলিশ ছেলে!


গো নিউজ২৪ | নাটোর প্রতিনিধি  আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০১৭ বৃহস্পতিবার
কোঠায় চাকরি পেয়ে বাবাকেই ভুলে গেলেন ২ পুলিশ ছেলে!

নাটোর: বাবা বীরমুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা কোঠায় পুলিশে চাকরি হয়েছে তার দুই ছেলের। পুলিশে চাকুরি করে দেশের সেবা করলেও জন্মদাতা বাবার সেবা করেছেন না তার দুই ছেলে। এক সময় দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, এখনও যুদ্ধ করছেন, তবে বেঁচে থাকার যুদ্ধ।

অযত্ন আর অবহেলায় দীর্ঘ আট বছর ধরে অসুস্থতার কারণে শয্যাশায়ী এখন তিনি। বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সিংড়াতে দীর্ঘ ২০ দিন যাবত চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মৃত্যুর প্রহর গুনছেন প্রতিনিয়ত। মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মো. আব্দুল আওয়াল (শিফা হাজি)। দুই ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে তিনি বসবাস করেন সিংড়া উপজেলার বলিয়াবাড়ি গ্রামে।

বর্তমানে ছেলেমেয়ে সবাই বিবাহিত। এলাকায় তিনি শিফা হাজি নামে পরিচিত। এলাকার একজন সমাজসেবক ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত। যিনি ৭ নং সেক্টরে স্বাধীনতার সময় যুদ্ধ করেন। যার এফএফ নং ৩৪৯৬, গেজেট ৯৭৩ যা ১৪/০৪/২০০৫ সালে প্রকাশিত। 

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আওয়াল এর স্ত্রী রহিমা বেগম দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোঠায় পুলিশে চাকুরি হয়েছে দুই ছেলের। বড় ছেলে সাজ্জাদ হোসেন মামুন বগুড়া অস্ত্রাগারে কনস্টেবল হিসেবে আট বছর ধরে কর্মরত আর ছোট ছেলে সাদ্দাম হোসেন মাসুদ এয়ারপোর্ট ঢাকাতে প্রায় দেড় বছর ধরে ডিউটি করছে। মুক্তিযোদ্ধা এই কোঠায় হয়ত চাকরি হয়েছে কিন্তু বাবার পাশে থাকার সময় এখনও হয়নি ছেলেদের। ছুটি নেই অজুহাতে বাড়ি আসে না তারা। অসুস্থ বাবার খোঁজ খবর নেয়ার সময় ছেলেদের নেই। উপজেলার অনেক মুক্তিযোদ্ধা তার শরীরের খবর নিয়ে গেছেন। ছেলেদের বউরাও আসে তবে থাকে না।

তিনি আরো জানান, প্রায় ৮ বছর আগে তার স্বামীর হঠাৎ প্যারালাইজ হয়। সেসময় ঢাকার পিজি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে বাড়িতে আনা হয়। তারপর থেকে দীর্ঘ ৮ বছর শয্যাশায়ী। শুয়ে থেকে থেকে তার মাজা এবং পিঠে ঘা হয়ে গেছে। বর্তমানে তিনি আরো অসুস্থ। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাওয়ায় সে টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা হয়। মূলত মুক্তিযোদ্ধা ভাতাতেই তার চিকিৎসা চলে বলে জানান।

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আওয়াল এর মেয়ে ফেরদৌসি বেগম বলেন, বাবা চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ১৯৮৭ সালে তিনি বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনিই জমিদাতা। ১৮ দিন থেকে তিনি অসুস্থ বাবার পাশে রয়েছেন। তিনি বিবাহিত, কলমে তার শ্বশুরবাড়ি হওয়ায় তিনি প্রায়ই বাবার জন্য খাবার নিয়ে আসেন। অন্য দু’বোন দূরে থাকায় তারা আসতে পারেন না।

তিনি আরো বলেন, তার বাবা এলাকার একজন সমাজসেবক, মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। আট বছর আগে বাবা অসুস্থ হওয়ার বাবার পরিবর্তে বড় ভাইয়ের বউ রেখা কে সেখানে সহকারি শিক্ষক হিসেবে চাকুরি দেয়া হয়েছে। তাদের নামে বাড়ির ৮ বিঘা জমি লিখে নেয় দু ভাই। কিন্তু বাবার চিকিৎসার খরচ দেন না। 

সরেজমিনে মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মো. আব্দুল আওয়াল এর চিকিৎসার খোঁজখবর নিতে গেলে, এসময় তিনি অস্পষ্ট ভাবে কথা বলতে বলতে অঝোড়ে তাঁর চোখে পানি বেড়িয়ে আসে। 

পুলিশে চাকুরিরত সাজ্জাদ হোসেন মামুন ও সাদ্দাম হোসেন মাসুদের সাথে কথা বললে তারা জানায়, দীর্ঘ ৮-১০ আগে বাবা অসুস্থ হয়। তারপর আমাদের সাধ্যমত উনার চিকিৎসা সেবা করছি। পুলিশের চাকুরি বেশি ছুটি পাই না। তবে মোবাইলে প্রায় সময়ই উনার অসুস্থতার খবর রাখি। 

প্রতিবেশি মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন থেকে তিনি অসুস্থ। তার উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। 

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল ওদুদ দুদু বলেন, আমি ও সহকর্মীদের নিয়ে কয়েকবার তার খোঁজ খবর নিয়েছি। অসুস্থ থাকাবস্থায় তাকে দেখতে বাড়িতে ও গিয়েছিলাম। শুনেছি তার দু ছেলে বাবাকে দেখভাল করে না। 

গোনিউজ২৪/পিআর