৭ আশ্বিন ১৪২৪, শুক্রবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ , ৩:৪৬ অপরাহ্ণ

কাজের খোঁজে ভারতে গিয়ে যৌনদাসী হচ্ছে বাংলাদেশি মেয়েরা


গো নিউজ২৪ | আন্তর্জাতিক ডেস্ক আপডেট: ১৭ জুলাই ২০১৭ সোমবার
কাজের খোঁজে ভারতে গিয়ে যৌনদাসী হচ্ছে বাংলাদেশি মেয়েরা

কোনও এক মেঘলা বিকেলে নৌকায় করে মাছ ধরার জালে লুকিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তবর্তী নদী পাড়ি দেয় ১৬ বছরের তরুণী আদৃতা (ছদ্মনাম)। চোখে একরাশ স্বপ্ন ছিল, কোনোভাবে ভারতের মাটিতে পা রাখতে পারলেই মিলবে নৃত্যশিক্ষকের চাকরি। আদৃতাকে এমন স্বপ্ন দেখিয়েছিল দালাল।

কিন্তু কয়েকদিন পরেই স্বপ্নভঙ্গ ঘটে তার। জন্মভূমি থেকে ২ হাজার কিলোমিটার দূরে ভারতের মহারাষ্ট্রের পুনেতে একটি ‘নিষিদ্ধ পল্লীতে’ বিক্রি করে দেয়া হয় এই বাংলাদেশি মেয়েটিকে। প্রতিনিয়ত সেখানে তাকে সহ্য করতে হয়েছে নানা নির্যাতন আর নিপীড়ন। আদৃতা জানায়, তালাবদ্ধ একটি কক্ষে আটকে রেখে তাকে বাধ্য করা হতো যৌনকর্মে। প্রতিদিন অনেক খদ্দেরের মনোরঞ্জন করতে হতো তাকে।

নয় মাসেরও বেশি সময় আগে আদৃতাকে উদ্ধার করে পুনের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়া হয়। কেউ তাকে বাড়ি ফিরতে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে বলে ভাবতে পারেনি মেয়েটি। সম্প্রতি রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভারতের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা অনেক বাংলাদেশি মেয়ের দুঃসহ জীবনের কথা।

আদৃতার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন সেখান থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের কনস্যুলার বিভাগের প্রধান মোশাররফ হোসেন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন দালালের খপ্পরে পড়ে ভারতে যাওয়া বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর কাজে।

২০১৫ সালের মার্চে হাইকমিশনে যোগ দেন মোশাররফ হোসেন। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘আমি অনেক বাংলাদেশি মেয়ে ও ছেলেকে পেয়েছি, যারা অনেক কষ্ট সয়েছেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন।’ উদ্ধারকৃতদের দেশে ফিরতে বিলম্ব হওয়ার কারণ হিসেবে পাচারের ঘটনাগুলো তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার কথা জানান তিনি।

গত দুই বছর ধরে এই বিভাগে কাজ করছেন মোশাররফ। বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে আসা যেসব নারী ভারতে নিষিদ্ধ পল্লীগুলোতে কাজ করছেন, তাদের উদ্ধার করে দ্রুত দেশে পাঠানোই তার লক্ষ্য। বাংলাদেশি এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি (কর্মস্থলে যোগ দেয়ার পর) দ্রুত কাজে নেমে পড়ি এবং উদ্ধার হওয়া অনেক বাংলাদেশি নারীর খোঁজ পেতে থাকি। কেরালায় আমি কয়েকটি মেয়েকে পাই, যারা দেশে ফেরার অপেক্ষায় একটি আশ্রয়কেন্দ্রে সাত বছর ধরে অবস্থান করছেন।’

গত বছর পুনের আশ্রয়কেন্দ্রসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন তিনি। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান রেসকিউ ফাউন্ডেশন পরিচালিত পুনের আশ্রয় কেন্দ্রে তিনি আদৃতার দেখা পান দুই সপ্তাহ আগে। গত সপ্তাহেই তার দেশে ফেরার কাগজপত্র প্রস্তুত হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে আদৃতা দেশে ফিরতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগী এই মেয়ে বলে, ‘আমার দেশে ফেরার কথা শুনে মা কেঁদেছে। মাকে বলেছি, কয়েক মাস আগেও আমার অবস্থা খারাপ ছিল, এখন অনেক ভালো আছি। পতিতাপল্লী থেকে নয়, আশ্রয়কেন্দ্র থেকে দেশে ফিরতে পারছি। আমি খুশি।’

মোশাররফ হোসেন গত ছয় মাসে ৪৩৮ জন নারীকে বাংলাদেশে পাঠাতে সক্ষম হয়েছেন, যাদের অর্ধেকই মহারাষ্ট্র থেকে উদ্ধার হয়েছিলেন। বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া নারীদের অন্যতম গন্তব্য এই প্রদেশ। আদৃতাসহ আরও ১৭ নারী বাংলাদেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে।

মানব পাচারবিরোধী ভারতের বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা জানান, পাচারকারীরা মূলত বাংলাদেশের দরিদ্র নারী ও শিশুদের টার্গেট করে। ভারতে ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের হয় নিষিদ্ধ পল্লীতে বিক্রি করে দেয়া হয়, নয়ত গৃহকর্মী হিসেবে কাজে লাগানো হয়। পাচার হওয়া নারী ও শিশুদের অধিকাংশকেই উদ্ধার করা সম্ভব হলেও তাদের দেশে ফিরতে অপেক্ষায় থাকতে হয় দীর্ঘ সময়।

কারণ হিসেবে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি টাস্ক ফোর্স গঠনের বিষয়টি এক দশক ধরে ঝুলে থাকার কথা বলেন তারা। সেভ দ্য চিলড্রেন ভারতের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জ্যোতি নাল বলেন, ‘হাইকমিশনের কর্মকর্তারা বিষয়টিকে (দেশে পাঠানো) গুরুত্ব দেয়ায় কাজটি এখন আগের চেয়ে সহজ হয়েছে।’

মহারাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে মিলে পাচার হওয়া নারীদের দেশে পাঠানোর কাজে যুক্ত রয়েছেন জ্যোতি। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা নারীরা দেশে ফিরতে কতটা মরিয়া থাকে, তার একটি চিত্র উঠে এসেছে পুনের রেসকিউ ফাউন্ডেশনের আশ্রয় কেন্দ্রের সুপার শাইনি পাডিয়ারার বক্তব্যে।

তিনি বলেন, ‘আগে ট্রাভেল পারমিট হাতে পেতে মেয়েদের সাধারণত দুই থেকে তিন বছর অপেক্ষায় থাকতে হতো। মাঝে মাঝেই তারা ক্ষেপে যেতো। ২০১৫ সালে কিছু মেয়ে কেন্দ্রে ভাংচুর চালায়। কয়েকজন পালিয়েও যায়।’

চলতি বছরের মে মাসে এই কেন্দ্র থেকে ২২ জন নারী বাংলাদেশে ফিরে গেছেন জানিয়ে শাইনি বলেন, এখন সেখানে থাকা ১৯ জন নারীর মধ্যে ১৮ জনেরই দেশে ফেরার কাগজপত্র পৌঁছেছে। আশ্রয় কেন্দ্রে অপেক্ষার সময়টা এখন চার-পাঁচ মাস থেকে কমে দুই সপ্তাহে এসে দাঁড়িয়েছে বলেও জানান তিনি।

হাই কমিশনের কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন এখন প্রতিটি পাচারের ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের কর্মকর্তা এবং পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করেন। পাশাপাশি তিনি সীমান্তের দুই পাশে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পাচার হওয়াদের ঠিকানা নিশ্চিত হন। উদ্ধারকৃতদের সঙ্গে তাদের অভিভাবকদের ফোনে যোগাযোগও করিয়ে দেন তিনি। সব মিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ।

মোশাররফ বলেন, ‘আমাদের অসহায় ছেলেমেয়েগুলোর দেখভাল এবং তাদের নিরাপদে দেশে পাঠানো নিশ্চিত করাটা আমাদের দায়িত্ব।’

গো নিউজ২৪/ আরএস