৩ মাঘ ১৪২৩, মঙ্গলবার ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ , ১:১৮ পূর্বাহ্ণ

বইঃ আমার কথা

কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছে প্রত্যাশা


গো নিউজ২৪ আপডেট: ০৬ জানুয়ারি ২০১৭ শুক্রবার
কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছে প্রত্যাশা

সৈয়দ আবুল হোসেন বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘আমার কথা’। এই বইয়ে তিনি নিজের চিন্তা, কর্মকাণ্ড, মূল্যবোধ, নানা অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখেছেন। এটি পড়লে তাকে যারা পুরোপুরি চিনেন না তাদের সুবিধা হবে। বইটি ‘gonews24.com’ ধারাবাহিকভাবে ছাপছে। বইটির আজকের পর্বে থাকছে- ‘কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছে প্রত্যাশা’

একজন ভালো কর্মকর্তার কাছে তার কাজ ও দেশ নিজের চেয়ে প্রিয় এবং যে অফিসার এ বোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করেন- তিনি আর অফিসার থাকেন না, বিলীন হয়ে যান অনিবার্য দেশপ্রেমের বিশাল পরিম-লে। আমার অফিসে যাঁরা আমার সঙ্গে কাজ করেন তাঁরা আমাকে জিজ্ঞেস করেন-  আমাদের কাছ থেকে আপনি কী প্রত্যাশা করেন?
 
আমার উত্তর : একটি অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ হচ্ছে ওই অফিসের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। তারা আমাদের সত্যিকারের সম্পদ। তারা কাজ করলেই উন্নয়ন হবে, কিন্তু কাজ না করলে প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখোমুখি হবে। তেমনি সরকারি কাজের বেলায়ও একই নিয়ম। সরকারি কাজের উন্নয়নে, আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য বাস্তবায়নে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মহান উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রয়োজন হয় একটি মহৎ দলের। মহৎ দল ছাড়া কোনো মহৎ কাজ সম্পন্ন হয় না।

সরকারি উন্নয়ন সম্ভব হয় তার কর্মীবাহিনীর উন্নয়নের মাধ্যমে। সৃজনশীল কর্মচারীদের লালন-পালন করলে, পুরো সরকারই সৃজনশীল হয়ে ওঠে। কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ প্রতিষ্ঠানের রক্তস্বরূপ। রক্ত যদি ভালো না হয়, তাহলে পুরো শরীর অকেজো হয়ে যায়। যখন নতুন নতুন প্রযুক্তি ও কলাকৌশল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মচারীরা দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হয়, তখন পুরো সরকার আধুনিক ও কার্যকর সরকারে পরিণত হয়। সরকারের প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে কর্মীবাহিনী। সরকার তাদের উন্নয়নে কাজ করে এবং তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে, যাতে তারা দক্ষ হয়ে ওঠে, সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠ অবদানটা রাখতে পারে। এককথায় বলা যায়, কর্মকর্তা-কর্মচারী যেই হোক না কেন, প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। প্রশিক্ষণ শারীরিক কসরতের মতো প্রতিষ্ঠানকে অধিক কর্মক্ষম করে তোলে।

মহান উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রয়োজন হয় একটি মহৎ দলের। মহৎ দল ছাড়া কোনো মহৎ কাজ সম্পন্ন হয় না।

আমার মনে হয়, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের কর্মকর্তাদের জন্য একটি লিডারশিপ প্রোগ্রাম আয়োজন করা দরকার। আমাদের সেরা কর্মচারীদের পুরস্কৃত করা দরকার। অনেক ক্ষেত্রে তা করা হয়। পুরস্কার প্রদান ও উদ্দীপনা দানের ক্ষেত্র আরও বাড়াতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে কর্মচারীদের সর্বোচ্চ দক্ষতা বের করে আনতে হবে। আমরা জ্যেষ্ঠতা এবং কর্মদক্ষতার ওপর ভিত্তি করে কর্মচারীদের পদোন্নতি ও নিয়োগ দিয়ে থাকি। তবে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতা ও কর্মসম্পাদনকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। চুল পাকলে অভিজ্ঞতা হবে, এমন ধারণা সবক্ষেত্রে ঠিক নয়।

সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে আমার কিছু পরামর্শ
 
প্রথমত দেশপ্রেমিক হিসাবে দেশের জন্য পূর্ণ মমতা রেখে কাজ করুন। প্রকৃত নেতৃত্ব কোনো এক স্থানে থেমে থাকে না। বরং নেতৃত্ব অবস্থান করে চিন্তায় ও কাজে। কারও নেতৃত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থাকে মহৎ। একজন সত্যিকার দেশপ্রেমিক মানুষের সেবায় জীবন বিলিয়ে দেন এবং মানুষকে সুখে ও শান্তিতে রাখতে আজীবন কাজ করে যান। একজন সত্যিকার দেশপ্রেমিকের সারাক্ষণ কাজে ডুবে থাকার প্রয়োজন নেই, সারাক্ষণ নতুন কিছু উদ্ভাবন এবং বাস্তবায়ন করার প্রয়োজন নেই। বরং সত্যিকার দেশপ্রেমিকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে- সব ক্ষেত্রে দেশকে প্রথম স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। তিনি সহকর্মীদের মধ্যে এ বোধ সৃষ্টি করে সহজে দেশকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারেন।

একজন সত্যিকার দেশপ্রেমিক ব্যক্তির শক্তি হচ্ছে নেতৃত্ব ধরে রাখা নয়, বরং তাঁর শক্তি হচ্ছে নৈতিকতা; তাঁর প্রতি জনগণের ভালবাসা, জ্ঞান, শিক্ষা এবং তাঁর কাজের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা। সত্যিকার দেশপ্রেমিকের অন্তরে এমন একটি চিন্তা থাকে যে, তিনি আসলে শুধু চালক নন, বরং জনগণই তাঁর চালক, তাই বিচক্ষণতার সঙ্গে জনগণকে অনুসরণ করাও তাঁর অন্যতম কাজ। অন্যদিকে জনগণ মনে করে, এ-ই আমাদের চালক এবং তাকে অনুসরণ করাতেই আমাদের কল্যাণ। পরস্পর এমন বোধ জাগ্রত হলেই কেবল নেতৃত্ব পূর্ণ বিকাশে বিকশিত হয়ে ওঠে। সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে বলতে চাই, দেশপ্রেমিকের মতো কাজ করুন। প্রকৃত নেতৃত্ব কোনো একটি শক্তি ও পদ নয়, বরং নেতৃত্ব অবস্থান করে চিন্তায় ও কাজে। কারও কারও নেতৃত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থাকে মহৎ। দেশপ্রেমিক সবাই হতে পারেন না। কিন্তু দেশপ্রেমিক হওয়ার চেষ্টাই এক একজনকে মহান ব্যক্তিতে পরিণত করতে পারে। আপনারা সবাই দেশপ্রেমিক, আপনাদের কাছে জনগণের যেসব প্রত্যাশা আছেÑ সেগুলো পূর্ণ করুন। দেখবেন জনগণ আপনাদের প্রতি কেমন উজাড় করে দেন তাঁদের সব আনুগত্য ও শ্রদ্ধা।

দ্বিতীয়ত, যদি আপনি বেসামরিক সেবাকে কেবল একটি চাকরি হিসাবে দেখেন, তাহলে আপনি কেবল একজন কর্মচারী। চাকরি নয়, কাজ করতে হবে। নিজেকে একজন চাকর হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করবেন না, বরং নিজেকে একজন কর্মী ভাবুন, একজন সেবক ভাবুন, যিনি তাঁর দেশকে ভালবাসেন। অপরদিকে, আপনি যদি একজন কর্মচারী না হয়ে দেশপ্রেমিক হন, তবে দেশের জন্য চাকরি থেকে অনেক বেশি অবদান রাখতে পারবেন। এটা একটা সুযোগ। এ সুযোগ ব্যবহার করে আপনি আপনার মেধা ও যোগ্যতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হবেন এবং আপনার সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। এ সুযোগ আপনার চারপাশের লোকজনকে উৎসাহিত এবং প্রভাবিত করবে। এমনকি, আপনার দেশের ইতিহাস সৃষ্টিতে এ সুযোগ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। সুতরাং নিজেকে শুধু একজন কর্মচারী ভাববেন না। বরং নিজেকে সেবক হিসাবে গড়ে তুলুন- যে দেশকে ভালবাসে। একজন কারুশিল্পীর আবেগ ও ভালবাসা হচ্ছে তার শিল্পকর্ম। একজন শিল্পী তার শিল্পকর্মের মাধ্যমে নিজেকে আলোকিত করে। ঠিক তেমনিভাবে আমরা আপনাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চটা আশা করি।

তৃতীয়ত, দক্ষতা বাড়ান, নিজের জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করুন, নয়া দিগন্ত উন্মোচন করুন এবং কখনও কাজকে অবহেলা করবেন না। মেধার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দৃঢ় অধ্যবসায়। আপনার যেকোনো অগ্রগতি, সেটা যেভাবেই হোক না কেন, তা অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ। সুতরাং আত্ম-উন্নয়ন কখনও ছেড়ে দেবেন না এবং পেছনে ফিরে তাকাবেন না। সবসময় সেরা হওয়ার চেষ্টা করবেন এবং দেশ ও সমাজের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করবেন। দেখবেন আপনি যা দিচ্ছেন তার চেয়ে অনেক বেশি পাচ্ছেন।