১ পৌষ ১৪২৪, শুক্রবার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ , ১১:৪৯ অপরাহ্ণ
শোকের মাস আগস্ট

এত মিথ্যাচারেও নত নন জাতির পিতা


গো নিউজ২৪ | অমি রহমান পিয়াল   আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০১৭ বুধবার
এত মিথ্যাচারেও নত নন জাতির পিতা

...মধুমতির উপর দিয়ে খোলা নৌকায় বাসন্তিবালার বাবা মেজো মামাকে ধরে আছে। বড়ো আশায় বারবার বলছে, কথা ক। কথা ক, অ কপিল। এই সময় একটি লঞ্চ দূর থেকে ভটভট করে আসতে দেখা গেল। দোতলার রেলিংয়ে কিছু লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। একটা শালু কাপড়ে লেখা- জাগো বাঙালি, জাগো। বড় মামা বিরক্ত হল। ঢেউ দুলিয়ে দিচ্ছে ছোট নৌকাটাকে। তাল সামলানো মুশকিল। ঢেউয়ের আড়াআড়ি নৌকাটা তুলে দিল। বলল, কাগু কপিলরে ধইরা রাইখো ঠিক কইরা। হঠাৎ মেজো মামা লাফিয়ে উঠল। দাঁড়ালো সোজাসুজি। মাথা খাড়া করে দুহাত ছড়িয়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে বলল, মুজিব ভাইইই! লঞ্চের বাইরে সাদা পাঞ্জাবি দীর্ঘদেহ চশমা পরা পাইপ হাতে কে একজন জলদ গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন- জয় বাংলা... (পরীকথা : কুলদা রায়)

আলী আহমদ গানের বই বিক্রি করেন। সিনেমার গান। বইয়ের মলাটে নায়ক-নায়িকাদের ছবি থাকে। মোহাম্মদ আলী-জেবা। উল্টোদিকের বাড়িতে দুই বাঁধা কাস্টমার আছে তার। অল্পবয়সী দুই কিশোর কিশোরী। হাসিনা ও কামাল। টাকা না থাকলে বাকিতে বই নিয়ে যায়। ঠিক অনিচ্ছেতে নয়, ভয়েই দিয়ে দেন আলী। দোতলা বাড়ির ওই ভাড়াটিয়াকে নিয়ে তার মধ্যে একটা তীব্র আতঙ্কবোধ কাজ করে। 

কিছুদিন পরপর এ বাড়িতে পুলিশ আসে। কিছুদিন পর পর গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় ওই ভাড়াটিয়াকে। তার মানে কত বড় ডাকাত ওই লোক! ঈদের দিন আলী অবাক হন বাড়ির সামনে গাড়ির ভিড় দেখে। বিখ্যাত সব লোক, শিক্ষিত সব লোক, নামী সব লোক! এরা এই ডাকাতের বাড়িতে কী করে!

আলী যান সেই বাড়িতে। পাওনা টাকা চাইতে এসেছে ভেবে হাসিনা ও কামাল মাকে খবর দেন, বসতে দেন অতিথিকে। তিনি আসেন, আলীকে নাশতা-পানি দেন। আর বলেন, ‘সবসময় তো হাতে টাকা থাকে না, ওদের বাবা প্রায়ই দূরে থাকেন। তারপরও ওরা যা চায় দিয়ে দিবেন, আমি টাকা দিয়ে দিব।’ আলী বলেন, ‘আমি তো পাওনা চাইতে আসি নাই আম্মা। আসলে ফুটফুইটা দুই ছেলে মেয়ে আপনার, বাড়িঘর দেইখা বুঝা যায় বংশ ভালো। সাহেবরে বলেন আজেবাজে কাজ ছাইড়া ভালো হইয়া যাইতে। দুইদিন পরপর পুলিশ আইসা তারে বাইন্ধা নিয়া যায়, এইটা কি ভালো কিছু?’ উত্তরে আলী যা শোনেন তাতে তার চোখ ছানাবড়া। কোনো ডাকাত নন, ওই ভাড়াটিয়ার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তান সামরিক জান্তার সার্বক্ষণিক এক মাথাব্যথা, যাকে যে কোনো ইস্যুতে চৌদ্দশিকের আড়ালে না রেখে স্বস্তি পায় না তারা।

আলী সেই প্রথম জানলেন শুধু ডাকাত নয়, দেশের মানুষের রাজনীতি করলেও পুলিশ ধরে। তিনি আগ্রহী হন। পল্টন মাঠে বৃষ্টিতে ভিজে শোনেন ছয় দফার গান। সিনেমার বই লাটে ওঠে, এই লোকের কথা মানুষের কাছে পৌঁছানোর পণ করেন আলী। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবের তখন পর্যন্ত করা বক্তৃতা সংকলন ৩৬ হাজার কপি বিক্রি হয় তার। 

আলী আহমদ একটি বিচ্ছিন্ন উদাহরণ মাত্র। দীর্ঘদিন একটি ভুল ধারণা বয়ে বেড়াবার পর যখন চোখ খুলে গেলো অসংখ্য মুজিবপ্রেমীর একজন হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এদের কেউ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর থেকে আর জুতো পায়ে দেননি। কেউ এখনও এই বৃদ্ধ বয়সে দেশজুড়ে সাইকেল রিকশা চালিয়ে মাইকে শুনিয়ে বেড়ান সেই মহামানবের বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বর। কেউ নিঃস্ব অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার সময়ও হাত দেননি শেষ সহায় একখণ্ড জমিতে, যে জমি মুজিবের এতিম কন্যা শেখ হাসিনার নামে কেনা! এদের কারো স্মৃতিতে এখনও জ্বলজ্বল আবেগী এক আলিঙ্গনের স্মৃতি, তার আগে সেই কথাগুলো, ‘পিছনে বইসা আছো কেন মেন্তু মিয়া, সামনে আসো। চলো সরিষা তেলে মাখা মুড়ি খাই।’ (চলবে..দ্বিতীয় পর্ব দেখুন)

অমি রহমান পিয়াল: লেখক, সাংবাদিক। (লেখাটি মাসিক বলাকার আগস্ট ২০১৬ বঙ্গবন্ধু সংখ্যা থেকে নেয়া।)

গোনিউজ/এন