১ পৌষ ১৪২৪, শনিবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ , ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ

এক নজরে দেখে নেন ছবিতে ছবিতে বানিশান্তা !


গো নিউজ২৪ | ফারজানা আক্তার আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সোমবার
এক নজরে দেখে নেন ছবিতে ছবিতে বানিশান্তা !
‘বাইরের কোনো স্মৃতি আমার মনে নেই। আমার যখন ৯ কি ১০ বছর, তখন প্রথম আমাকে যৌনতায় বাধ্য করা হয়। এখন অন্য কোথাও যাওয়ার রাস্তা নেই। মা-বাবার মুখটাও এখন আর মনে পড়ে না।’ কথাগুলো নার্গিস আক্তারের। যাকে ৮ বছর বয়সে ‘বানিশান্তায়’ বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল।
২০০৯ সালের সাইক্লোন আইলা আঘাত হানার পর বানিশান্তার সব শিশু স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। কারণ কোনো শিশুই জীবিত ছিল না। যে ক’জন বেঁচেছিলো তারা পানি আর খাবার জোগাড় করার কাজে পরিবারকে সাহায্য করছিলো।
কমলা, যিনি একসময় বানিশান্তায় যৌনকর্মীর কাজ করতেন। এখন অন্য যৌনকর্মীদের গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। এরা যখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়ে তখন অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না। একসময় বানিশান্তাতে যারা দাপটের সঙ্গে কাজ করতেন, বৃদ্ধ বয়সে তারাই সামান্য কাজও হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়ায়।
কিশোর বয়সের আগে সাথীর বাড়ি ছিল বানিশান্তায়। সাথী মাত্র ১৪০ টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়েছিলেন। আজ সাথীর সেই কদর নেই। বললেন, ‘আমি এখন বৃদ্ধ ও কুৎসিত। তাই তেমন গ্রাহক পাই না।
মানুষ প্রায়ই বলে কুকুর বড়ই অনুগত। আর আমার মতে এরা ভালো ক্রীতদাসও হয়। আপনি এমন দৃশ্য সাধারণত শহর ঘুরে ঘুরে দেখতে পাবেন না। এখন শহরে কুকুরের সংখ্যা কমে গেছে। পাখিরা উড়ে গেছে। আর বিড়াল প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে।
বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি ছোট্ট দ্বীপ বানিশান্তা। প্রতিদিন পানি বেড়েই চলেছে। যে কোনো মুহূর্তে চলে যেতে পারে পানির নিচে। প্রতি বছর জোয়ারের ঢেউয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাসিন্দারা। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলির একটি হচ্ছে বানিশান্তা।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্রতম দ্বীপ বানিশান্তা। এর বাসিন্দা নারী ও মেয়ে শিশু মিলে দেড়শ। যারা রাষ্ট্রীয় অনুমোদনপ্রাপ্ত এই যৌনপল্লীর বাসিন্দা। এদের একমাত্র পেশা যৌনতা বিক্রি। 
বানিশান্তা যৌনপল্লীর কিছু নারীর রয়েছে স্থায়ী স্বামী বা প্রেমিক। তারা সাধারণত সপ্তাহে একবার দেখা করতে আসে। গেল দুই বছর ধরে সম্পর্কে জড়িয়েছেন শাপলা আর মানিক। শাপলা স্বপ্ন দেখছেন খুব তাড়াতাড়ি মানিককে বিয়ে করে সুখের সংসার বাঁধবেন। মানিক বানীশান্তা বাজারে মাছ বিক্রি করেন।
কয়েক বছর আগেও বিশ্বের সব বড় বড় জাহাজ ভিড়তো দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্দর মংলায়। জাহাজের নাবিকরা বানিশান্তা যৌনপল্লীর সেরা কাস্টমার ছিলো। এখন এই নারীরা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। জলবায়ুর পরিবর্তন, সমাজের অবহেলা, প্রেমিক বা স্বামীর উপেক্ষায় অনেক নারীই হারিয়ে গেছে।
১৯৮৮ সালের বন্যার পর মমতাজ বানিশান্তায় আসেন। দেখেছেন জীবনের অনেক উত্থান-পতন। বললেন, ‘অনেক মানুষ আসে আবার চলে যায়। আমি এখানে একটা বিশ্বস্ত কুকুরের মতো পড়ে আছি। কারণ আমার যাওয়ার জায়গা নেই’।
রমিজার জন্ম বানিশান্তাতেই। বড় হয়েছেন এখানেই। রমিজার মা’ও একজন যৌনকর্মী ছিলেন। প্রায় তিন দশক ধরে এখানে কাজ করেছেন। মায়ের পথেই চলছেন রমিজা। রমিজার মা ছিলেন সর্দারনী (মাদাম)। বিক্রি করতেন ড্রাগ আর অ্যালকোহল। স্বামীর সঙ্গে ঝামেলা হওয়ার পর তার মুখে অ্যাসিড ছুঁড়েছিল।
রুনা (বামে) রমিজার পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম। তবে রুনা ছেড়ে গেছে বানিশান্তা দ্বীপ। গ্রামে গিয়ে তার মেয়ের (ডান) সঙ্গে বসবাস করছেন। রুনার মেয়ে পড়ছে অষ্টম শ্রেণিতে।
সোমা তার চারপাশের মানুষদের থেকে একটু আলাদা। তার রয়েছে অন্যরকম এক পারসোনালিটি। বললেন, ‘যৌনতায় আমি কোনো পাপ দেখি না। বরং এটি আমার জীপনযাপনের অন্য একটি মাধ্যম। তথাকথিত সমাজ থেকে পালিয়ে যাওয়া। প্রত্যেকেরই জীবনে সুখ ও দুঃখ রয়েছে। আমিও কষ্ট পাই যখন পিছনে ফিরে দেখি।  তবে চরম সত্যি তো এটাই যে আজ আমি এখানে রয়েছি।’
বানিশান্তায় আসেন বিভিন্ন রকমের খদ্দের। শহীদ মিয়াও একজন খদ্দের। তিনি একজন মুদি দোকানি। প্রায়ই আসেন বানিশান্তায়। মেয়েদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে চলে যান।
পাবলিক প্লেসে ধূমপান বাংলাদেশে নারীদের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। তবে যৌনকর্মীরা এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়াহীন। তারা নিজেদের সামাজিক বহিরাগত মনে করেন। বানিশান্তা দ্বীপের মেয়েদের মধ্যে তৈরি হয় গভীর সম্পর্ক। তারা দিন দিন একটি শক্তিশালী পরিবার হিসেবে গড়ে ওঠে।
বানিশান্তা দ্বীপে এটা খুবই সাধারণ দৃশ্য। আসলে এমন দৃশ্য যেকোনো দেশের যৌনপল্লীতে দেখা যায়।  যৌনকর্মীরা খুব বেশি মেকআপ নিয়ে থাকেন। এখানে রিনা মেকআপ নিচ্ছেন তার কাজের জন্য।
বয়ঃসন্ধিকালেই রিনা বানিশান্তাতে কাজ শুরু করেছিলেন। বারো বছর বয়সে রিনাকে বিক্রি করা হয়েছিল এক ম্যাডামের কাছে। প্রতিদিন মেকআপ করে খদ্দেরের জন্য অপেক্ষা করেন। প্রতিদিন তাকে ৪-৫ জন খদ্দেরকে সামলাতে হয়। রিনার ৮ বছরের একটি ছেলেও আছে। ছেলেটি অন্য গ্রামে তার নানা-নানীর সঙ্গে থাকে।
একজন পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে মেয়েরা মজা করছে। একজন যৌনকর্মীর সঙ্গে এই পুরুষবন্ধুটির সম্পর্ক রয়েছে। তার জন্য প্রায়ই বানিশান্তায় আসেন তিনি।
শিরিন চার বছর ধরে বানিশান্তায় কাজ করছেন। তার একটি সন্তানও রয়েছে। যে তার খালার কাছে থাকে। শিরিন তার বোনের কাছে প্রতি মাসে টাকা পাঠায় সন্তানের খাওয়া-দাওয়া আর পড়াশোনার জন্য। তবে শিরিনের সেই ছোট্ট সন্তান জানেই না তার মা কী কাজ করছে!
বানিশান্তার মেয়ে ও তাদের ক্লায়েন্টরা এক সঙ্গে নাচানাচি ও মদ পান করছেন। এখানে ক্লায়েন্টরা শুধু যৌনতার জন্যই আসেন না। তারা মাদক, ইয়াবার লোভেও আসেন। যৌনপল্লী এমন একটা জায়গা যেখানে সব ধরণের কাজই হয়ে থাকে।
এই ছবিটি যৌনপল্লীর বাস্তব চিত্র। এখানে রয়েছে ব্যবহৃত কনডম, তাস বা কার্ড এবং ওষুধের প্যাকেট।
ঝর্ণা বাড়ি যেতে চান না। অনেক অনীহা তার বাড়ি যেতে। বললেন, ‘পরিবারে আমার সবাই আছে। মা-বাবা, ভাই-বোন। খুব বড় একটা বাড়ি। যখন আমার বিয়ে ভেঙে গেলো সবাই আমার দোষ দিলো। তারা সবাই দাবি করছে সব দোষ শুধু আমার একার। ক্ষোভে আর অপমানে আমি এই পথে স্বাধীনভাবে চলার জন্য চলে এলাম। আমি আমার নিজেকে বিক্রি করে স্বাধীনতা কিনে নিলাম!
পল্লীর ম্যাডামের (সর্দারনী) সঙ্গে একটি মেয়ের ঝগড়া হয়। মেয়েটি বছর দুয়েক ধরে কাজ করছেন বানিশান্তাতে। মেয়েটি একদিনে খুব বেশি ক্লায়েন্ট নিতে পারছেন না। তবে ম্যাডাম চাচ্ছেন বেশি বেশি ক্লায়েন্ট নিতে। অবশেষে চাপ প্রয়োগ করতে ম্যাডাম মেয়েটিকে নির্যাতন করেন। এতে মেয়েটি রেগে গিয়ে নিজের হাত এলোমেলোভাবে কেটে নেন।
নার্গিস ছয় মাসের গর্ভবতী। তিনি জানেন না তার সন্তানের বাবা কে? কারণ তার অনেক ক্লায়েন্ট ছিলো। বললেন, ‘আমি গর্ভবতী হয়েছি। কেননা আমি এটা চেয়েছিলাম। আমি নিজের জন্য সেটা করেছি। আমার কোনো সন্তান নেই। কোনো ছেলেমেয়ে নেই। যদি আমি মারা যাই তবে মানুষ আমার টাকা খাবে।’
লিজার মা কাজ করেন বানিশান্তাতে। তিনি চান না তার মেয়ে লিজা এই অন্ধকার জগতে পা দিক। তিনি স্বপ্ন দেখেন লিজা একদিন অনেক বড় ডাক্তার হবে।

 

পাপিষ্ঠদের দুনিয়া বানিশান্তা!

ফটোগ্রাফার শাহাদাতের ‘বানিশান্তা’ এখন ইংল্যান্ডে!

শিল্প-সাহিত্য ও সংষ্কৃতি বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত