১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, বুধবার ২৪ মে ২০১৭ , ৭:৪৮ অপরাহ্ণ

একুশে ফেব্রুয়ারি কি?


গো নিউজ২৪ | ফারজানা আক্তার   আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ মঙ্গলবার
একুশে ফেব্রুয়ারি কি?

একুশে ফেব্রুয়ারি কি? প্রশ্নটা একটু বোকা বোকা লাগছে, তাই না? উত্তরটা যদি এমন হয়- একুশে ফেব্রুয়ারি হচ্ছে ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখ। উত্তরটাও বোকা বোকা লাগছে। বোকার মত প্রশ্ন করলে, উত্তরও বোকার মত হবে এটাই স্বাভাবিক। 

তাহলে উত্তরটা এবার আপনি নিজেই দেন। কয়েকদিন আগে দেখলাম একজন একুশে ফেব্রুয়ারির রেসিপি দিয়েছে ওইদিন আপনি কেমন করে, কি দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করবেন? সেই বিশেষ ব্যক্তি আবার "অ", "ক " আকৃতির কেক কিভাবে বানাতে হবে তাও বলে দিয়েছেন। একুশে ফেব্রুয়ারি কি তাহলে উৎসবের দিন? ওইদিন সবাই সবার বাড়িতে ঘুরে ঘুরে কেক খাবে! নাকি ওইদিন সবার বাড়িতে একুশ পদের আইটেম করা হবে? ওইদিন যা যা করা হবে সব একুশ রকমের হবে! আমি ভাবতে পারছি না যখন আমার মাথায় এই কথাটা এসেছে - একুশ রকমের কনসার্ট যদি করা হয়!!!!

অনেক আজাইরা কথা বললাম। এখন আপনি সত্যি সত্যি বুকে হাত দিয়ে বলেন তো আমি একুশে ফেব্রুয়ারির সঠিক এবং সবটুকু ইতিহাস জানেন। আপনি আপনার বাচ্চাদের সবটুকু ইতিহাস জানিয়েছেন। তারা জানে আপনি জানেন একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জীবনে কি ! কয়েকজন চোখ বন্ধ করে বলে ফেলবে একুশে ফেব্রুয়ারি আবার কি? আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এখন আমার আরেকটি প্রশ্ন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কি? কেন একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বলা হয়? একুশে ফেব্রুয়ারির অন্য আরেকটি পরিচয়ও আছে সেটা কি জানেন?

তৎকালীন পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকাতে ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভাষা-বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে এ নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আন্দোলন হয় এবং ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে তার চরম প্রকাশ ঘটে। ওইদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে বেরিয়ে এলে পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়। এতে আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালামসহ কয়েকজন কয়েকজন ছাত্র নিহত হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ঢাকাবাসী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে সমবেত হয়। নানা নির্যাতন সত্ত্বেও ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাতে পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুনরায় রাজপথে নেমে আসে। তারা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের জন্য অনুষ্ঠিত গায়েবি জানাজায় অংশগ্রহণ করে।

ভাষাশহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি এক রাতের মধ্যে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যা সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি গুঁড়িয়ে দেয়। একুশে ফেব্রুয়ারির এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে ৯ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

তখন থেকে প্রতি বছর এ দিনটি জাতীয় ‘শোক দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। আমি আবার লিখছি আর আপনি আরেকবার কষ্ট করে পড়েন " প্রতি বছর এ দিনটি জাতীয় ‘শোক দিবস’ " হিসেবে পালন করা হয়। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনায় ২১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা এক মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রপতি এবং পরে একাধিক্রমে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষকবৃন্দ, ঢাকাস্থ বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তাবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন এবং সর্বস্তরের জনগণ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একুশে ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত হয়। এদিন শহীদ দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে রেডিও, টেলিভিশন এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। দেশের সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে।

কানাডার ভ্যানকুভার শহরে বসবাসরত দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম প্রাথমিক উদ্যোক্তা হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানিয়েছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে ১৯৯৮ সালে। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেসকোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্যদেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে ঘোষণা করা হয় এখন থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করবে জাতিসংঘ। এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস হয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাবটি সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে উত্থাপন করে বাংলাদেশ।

বছরের সবকয়টা দিন এক কিন্ত কিছু কিছু দিন আমরা ভিন্নভাবে কাটায়। আর এই ভিন্নভাবে কাটানোর কারণটাই হচ্ছে কোনো একটা উপলক্ষ। আমাদের জানতে হবে বুঝতে হবে কোন দিনটা উৎসব পালনের জন্য আর কোন দিনটা উৎসববিমুখ কাটানোর জন্য। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জন্য কোনো উৎসবের উপলক্ষ নয়। 

একুশে ফেব্রুয়ারি মানে এই না যে - আপনি মাথায় কতগুলো ফুল দিয়ে, হাত ভর্তি চুড়ি পরে, সুন্দর করে শাড়ি পরে প্রেমিকের হাত ধরে ঘুরে বেড়াবেন। একুশে ফেব্রুয়ারি মানে এই না যে - আপনি এখানে সেখানে কনসার্ট বসিয়ে ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো করে লাফালাফি করবেন। একুশে ফেব্রুয়ারি মানে এই না যে - আপনি "অ ", "আ " এর মত করে কেক বানিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করবেন। 

একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করতে কি এত কিছু লাগে?? সঠিকভাবে জানুন না কেন অন্য দিনগুলো থেকে এই দিনটা আলাদা। যে কারণে ওইদিন কিছু তরুণ নিজেদের জীবন বিলীন করে দিয়েছিলো, নিজেদের রক্তে ঢাকার রাস্তা রক্তাত করেছিল সেই উদ্দেশ্যটাকে আমরা সঠিক ভাবে মেনে চলি। তাহলেই তো একুশে ফেব্রুয়ারি সফল। শহীদদের আত্মাও শান্তি পাবে। আমি অবাক হয়ে ভাবি তারা যদি নিজের চোখে আজ দেখতে পেতো তাদের জীবন দিয়ে পাওয়া সেই বাংলা ভাষা ভুলে আজ আমরা মম, ব্রো, ইয়ো তে কথা বলি, সাথে আবার মিশিয়ে নেয় পাঁচমিশালি হিন্দি আর শহীদ দিবসকে আমরা আমাদের মতো করে উৎসব দিবস বানিয়ে পালন করছি , তাহলে তারা কি করতো??? আল্লাহ যা করে ভালোই করে, আমাদের এমন অধঃপতন সেই মহান মানুষদের নিজের চোখে দেখতে হয় নাই। 

সময় থাকতে আমরা বের হয়ে আসি, বের হয়ে আসি সেই অধঃপতন থেকে। একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে লেখা সেই গানটি আমাদের ভুলে গেলে চলবে না - "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি "। আবার লিখছি আপনি আবার কষ্ট করে একটু পড়েন - "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি " । মনের মধ্যে গেঁথে রাখবেন - রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। 

গো নিউজ ২৪/এইচজে

মতামত বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত