৩০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, বৃহস্পতিবার ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭ , ৪:১১ অপরাহ্ণ

আলোচনার কেন্দ্রে ধর্ষণের শিকার ১০ বছর বয়সের সেই গর্ভবতী


গো নিউজ২৪ | আন্তর্জাতিক ডেস্ক আপডেট: ০৭ আগস্ট ২০১৭ সোমবার
আলোচনার কেন্দ্রে ধর্ষণের শিকার ১০ বছর বয়সের সেই গর্ভবতী

ধর্ষণের শিকার ১০ বছরের সেই গর্ভবতী মেয়েকে নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শিরোনাম হচ্ছে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে। শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরেও আলোচনার কেন্দ্রে সে। অথচ ছোট্ট এই মেয়ে জানেও না, তাকে নিয়ে কত তোলপাড় হচ্ছে! আর পাঁচটা মেয়ের মতোই সে খেলছে, হাসছে। এই বয়সের বাচ্চাদের যা স্বভাব- অনর্গল কথা বলছে। আবার মাঝে মাঝে একটু লাজুক হয়ে উঠছে।

ষষ্ঠ শ্রেণির এই মেয়েটির স্কুলে সবচেয়ে পছন্দের বিষয় ইংরেজি এবং গণিত। আঁকতে পছন্দ করে সে। এ কাজে বেশ পটু। টেলিভিশনে কার্টুন শো ‘ছোট্টি আনন্দি’ আর ‘শিন চিন’ দেখতে দেখতে সারা দিন কেটে যায়। খাবারের মধ্যে তার পছন্দ মুরগির মাংস ও মাছ। সঙ্গে আইসক্রিমটাও তো বাদ দেয়া যাবে না।

আত্মীয়ের হাতে ধর্ষণের শিকার এই ছোট্ট মেয়ের এই হচ্ছে প্রাথমিক পরিচয়। ধর্ষণকারীকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার নামে চলছে মামলা। কিন্তু ১০ বছরের মেয়েটির জীবন যে সংশয়ে পড়তে যাচ্ছে না, তা কে জোর দিয়ে বলতে পারে! ধর্ষণের কারণে ৩২ সপ্তাহ ধরে গর্ভবতী এই মেয়ের গর্ভপাতের জন্য আবেদন করা হয়েছিল ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে। গত ২৮ জুলাই তা খারিজ করে দেয় আদালত। অনেক দেরি হয়ে গেছে বলে মন্তব্য কোর্টের।

এ নিয়ে চিকিৎসকদের একটি প্যানেলও করা হয়েছিল। তারা আদালতে পরামর্শ দেয়, এই সময়ে মেয়েটির গর্ভপাত করা হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তার গর্ভের ভ্রুণটি এখনো বেঁচে আছে এবং ভালো আছে। এদিকে আদালতের রায় অবর্ণনীয় হতাশা নিয়ে এসেছে মেয়েটির পরিবারের জন্য। তারা প্রত্যাশা করেছিল, গর্ভপাতের অনুমোদন দেবে আদালত।

১০ বছরের মেয়ের এই মামলা তার নিজের এলাকা চণ্ডিগড়সহ পুরো ভারতকেই স্তব্ধ করে দিয়েছে। স্থানীয় আইনি প্রতিষ্ঠান চণ্ডিগড় স্টেট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটির সেক্রেটারি মহাবীর সিং বলেন, ‘১৪-১৫ বছরের মেয়ের গর্ভবতী হওয়ার অসংখ্য মামলা আমরা দেখেছি। কিন্তু ১০ বছরের মেয়ের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা এই প্রথম দেখলাম।’

ভারতের আইন অনুসারে, গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহ পরে মায়ের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ না হলে গর্ভপাত ঘটানো বেআইনি। এক্ষেত্রে শুধু চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক গর্ভপাত করাতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য দেশটির আদালত বেশ কিছু পিটিশন পেয়েছে, যেখানে ২০ সপ্তাহের পরও গর্ভপাতের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গর্ভধারণের ঘটনাটি ধরা পড়েছে অনেক দেরিতে। কারণ অল্প বয়সী মেয়েরা এ বিষয়ে সচেতন থাকে না।

১০ বছরের এই মেয়েটির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। মাত্র তিন সপ্তাহ আগে বোঝা গেছে যে সে গর্ভবতী। পেটে ব্যাথা অনুভবের পর মায়ের কাছে বলার পর মা তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায়। এরপরই ধরা পড়ে, সে গর্ভবতী। মেয়েটির সঙ্গে নিয়মিত যারা চলাফেরা করে, এমন একজন জানিয়েছে, সে খুবই নিরীহ এবং যা ঘটেছে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই তার।

মেয়েটির মা-বাবাও বুঝতে পারেনি কোনো লক্ষণ। কারণ তাদের বাচ্চা আগে থেকেই স্বাস্থ্যবান ছিল। এছাড়া এমন একটি দুঃস্বপ্নের ঘটনা ঘটে যেতে পারে, তা কল্পনায়ও আসেনি তাদের। মেয়েটিকে এখনো বলা হয়নি তার গর্ভধারণের কথা। না বলার জন্য সবাইকে বলে দেয়া হয়েছে। তাকে বলা হয়েছে, পেটে একটি পাথর হয়েছে তার। আর এ কারণেই এর আকৃতি বড় হয়েছে।

তবে সম্প্রতি বাড়িতে পুলিশ, সমাজকর্মী এবং কাউন্সেলর এবং গণমাধ্যমের যাতায়াত দেখে সে বিষয়টি বুঝে ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সে হয়তো বিষয়টি পুরোপুরি ধরতে পারছে না। এর প্রকৃত অবস্থাও বুঝছে না। তবে আমার ধারণা, সে এখন কিছু ধারণা পাচ্ছে।’ পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে মেয়েটির পরিবারও। দরিদ্র এই পরিবারটি বাস করে এক রুমের একটি ফ্ল্যাটে। তার বাবা সরকারি চাকরি করে, মা গৃহিনী।

মেয়েটির মামলা বর্তমানে তদন্ত করছে পুলিশ কর্মকর্তা প্রতিভা কুমারী। তিনি বলেন, ‘খুবই সুন্দর একটি পরিবার। খুবই সহজ-সরল। তারা ধারণাও করতে পারছে না, এই লোকটি তাদের মেয়ের সঙ্গে এমন কাজ করবে।’ তিনি জানান, মেয়েটির মা-বাবা একেবারে ভেঙে পড়েছে। প্রতিভার ভাষায়, ‘তার মা কান্না ছাড়া আর কথা বলতে পারে না। তারা বাবা বারবার বলছে, তার মনে হয়, তার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে।’

ভারতে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের হার

* প্রতি ১৫৫ মিনিটে ধর্ষণের শিকার হয় ১৬ বছরের কম বয়সী একটি মেয়ে। আর প্রতি ১৩ ঘণ্টায় ধর্ষণের শিকার হয় ১০ বছরের কম বয়সী একটি মেয়ে।

*২০১৫ সালে ১০ হাজারেরও বেশি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

* ভারতে বসবাসরত নারীদের মধ্যে ২৪ কোটি নারীর বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগে।

* সরকারি জরিপে অংশ নেয়া শিশুদের ৫৩ দশমিক ২২ শতাংশ জানায়, তারা কোনো না কোনোভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।

* নিপীড়নকারীদের ৫০ শতাংশই হচ্ছে পরিচিত, যাদের ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করা হয় বা যাদের তত্ত্বাবধানে শিশুরা থাকে।

সূত্র: ভারত সরকার, ইউনিসেফ

যে বিষয়টি ১০ বছরের ওই মেয়ের পরিবারের জন্য সবচেয়ে বাজে হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে তার ধর্ষণের সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর থেকে সাংবাদিকদের আনাগোনা। শিশু বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির প্রধান নেইল রবার্টস বলেন, ‘যখন মেয়েটির বাবা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে, তিনি জানান, তার সবচেয়ে বড় সমস্যা গণমাধ্যম। সাংবাদিকরা সব সময় বাড়ির বাইরে ভীড় করে থাকে। এতে তাদের গোপনীয়তা নষ্ট হচ্ছে।’

সম্ভবত মেয়েটি ঠিকমতো স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে কি না এবং সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে কি না- এসব বিষয় জানার জন্য সাংবাদিকরা যান। তবে এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রচারণা পরিবারটির জন্য বিরাট দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার বাবা কাজে গেলে অনেক সাংবাদিক বাড়িতে যায়। শিশুকর্মী পরিচয় দিয়ে তারা সেখানে প্রবেশ করে।

যেহেতু ধর্ষণকারী ব্যক্তি মেয়েটির মায়ের খালাতো ভাই, তাই অনেকেই জানতে চায়, তিনি (মা) বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন কি না। পরিবারটির জন্য এটা খুবই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি। মেয়েটির বাবা বলেন, ‘আমি চাই, তাকে ভয়াবহ শাস্তি দেয়া হোক। তার মৃত্যুদণ্ড হোক বা সারা জীবন কারাগারে রেখে দেয়া হোক তাকে। সে তার অপরাধ স্বীকার করেছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত একবারও ক্ষমা চায়নি।’ গণমাধ্যমের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা কেন আমার মেয়ের বিজ্ঞাপনের কাজ শুরু করেছেন। গণমাধ্যম এখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।’

তার এই ক্ষোভের কারণটাও যৌক্তিক। আইন অনুসারে, ধর্ষণের শিকার কোনো শিশু ভুক্তভোগীর নাম, পরিচয় প্রকাশ করতে পারে না গণমাধ্যম। কিন্তু ইতোমধ্যে সেই বিধান লঙ্ঘন করে ফেলেছে তারা। মেয়েটির পরিবারকে এখন চিনে গেছে সবাই- প্রতিবেশী, বন্ধু, সহকর্মী সবাই।

এরপর কী?

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে সন্তান জন্ম দেয়ার কথা রয়েছে মেয়েটির। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার ডেলিভারির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চিকিৎসকরা। তবে অন্য কোনো জটিলতা দেখা দিলে আগেই প্রসবের কাজ শেষ করা হতে পারে। মেয়েটির পরিবার আগেই জানিয়ে দিয়েছে, ওই শিশু তারা নেবেন না। এজন্য শিশুটিকে দত্তক দেয়ার আগ পর্যন্ত থাকবে চাইল্ড কেয়ারে।

গো নিউজ২৪/ আরএস