১০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, শুক্রবার ২৪ নভেম্বর ২০১৭ , ১:১৪ অপরাহ্ণ
সাংবাদিক শামছুর হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছর

আইনের মারপ্যাঁচে একযুগ আটকে আছে বিচার প্রক্রিয়া


গো নিউজ২৪ | স্টাফ করেসপন্ডেট, যশোর আপডেট: ১৬ জুলাই ২০১৭ রবিবার
আইনের মারপ্যাঁচে একযুগ আটকে আছে বিচার প্রক্রিয়া

যশোর: দৈনিক জনকণ্ঠের যশোরস্থ বিশেষ প্রতিনিধি সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবল হত্যা মামলার বিচার ১৭ বছরেও হয়নি। তাই এ বিচার কার্যক্রম দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেয়ার দাবি করেছেন সাংবাদিকরা। রোববার এ হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছর পূর্ণ হয়। এ উপলক্ষে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচিতে এই দাবি তোলা হয়।

অনুষ্ঠানে যশোরের সকল সাংবাদিকসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা কালো ব্যাজ ধারণ করেন। সকালে তারা শহরের কারবালা কবরস্থানে যান। সেখানে শামছুর রহমানের কবরে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়। 

শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, প্রেসক্লাব যশোর, যশোর সংবাদপত্র পরিষদ, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন জেইউজে, সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোর, যশোর জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। 

এদিকে, শহীদ সাংবাদিক শামছুর রহমান হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন জেইউজে।

স্মারকলিপি প্রদানের পর প্রেসক্লাব মিলনায়তনের জেইউজে’র আয়োজনে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। জেইউজে সভাপতি সাজেদ রহমানের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলনের পরিচালনায় স্মরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাড. পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্য।

বক্তব্য দেন- বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন বিএফইউজে সহসভাপতি মনোতোষ বসু, জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, প্রেসক্লাব সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন, যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি একরাম-উদ-দ্দৌলা, প্রেসক্লাব সম্পাদক তৌহিদুর রহমান, সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান তোতা, জেইউজে সাবেক সভাপতি আমিনুর রহমান মামুন ও সাজ্জাদ গণি খান রিমন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক জেলা সভাপতি হারুণ-অর-রশিদ, জেলা আওয়ামী লীগ দপ্তর সম্পাদক মাহমুদ হাসান বিপু, জেইউজে সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওহাবুজ্জামান ঝন্টু ও এইচআর তুহিন, সাংবাদিক শিকদার খালিদ প্রমুখ।

সভায় সাংবাদিক নেতারা শামছুর রহমানের হত্যা মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়ার ব্যবস্থা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

উল্লেখ্য, ২০০০ সালের ১৬ জুলাই যশোরে নিজ অফিসে কর্মরত অবস্থায় দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবল। হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছর পার হলেও এখনো এর বিচার সম্পন্ন হয়নি। বরং গত ১২ বছর ধরে আইনের মারপ্যাঁচে আটকে রয়েছে এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া। 

আদালত সূত্র জানায়, শামছুর রহমান খুন হবার পর ২০০১ সালে সিআইডি পুলিশ মামলায় ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেয়। সে সময় বিগত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর কয়েক আসামির আগ্রহে মামলার বর্ধিত তদন্ত করে সাংবাদিক নেতা ফারাজী আজমল হোসেনকে নতুন করে আসামি করা হয়। একইসাথে মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে বাদ দিয়ে সাক্ষী করা হয় আসামিদের ঘনিষ্ঠজনদের। এতে একদিকে মামলার বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়, অন্যদিকে দুর্বল হয়ে যায় চার্জশিট। 

এরপর বিতর্কিত ওই বর্ধিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর ২০০৫ সালের জুন মাসে যশোরের স্পেশাল জজ আদালতে এই মামলার চার্জ গঠন হয়। ওই বছরের জুলাই মাসে বাদীর মতামত ছাড়াই মামলাটি খুলনার দ্রুত বিচার আদালতে স্থানান্তর করা হয়। এ অবস্থায় মামলার বাদী শহীদ শামছুর রহমানের স্ত্রী সেলিনা আকতার লাকি বিচারিক আদালত পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টে আপিল করেন। 

আপিল আবেদনে তিনি বলেন, মামলার অন্যতম আসামি খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী হিরক পলাতক রয়েছে। হিরকসহ সংশ্লিষ্ট মামলার অন্য আসামিদের সাথে খুলনার সন্ত্রাসীদের সখ্যতা রয়েছে। ফলে তার (বাদীর) পক্ষে খুলনায় গিয়ে সাক্ষী দেয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বাদীর এই আপিল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মামলাটি কেন যশোরে ফিরিয়ে দেয়া হবে না তার জন্য সরকারের উপর রুল জারি করেন। এরপর মামলার আসামি ফারাজী আজমল হোসেন উচ্চ আদালতে একটি রিট করেন। সেই রিটের নিষ্পত্তি না হওয়ায় মামলার সমস্ত কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।

সাংবাদিক শামছুর রহমান

নিহতের ভাই সাজেদ রহমান জানান, একাধিকবার প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতে সাংবাদিক নেতাদের পক্ষ থেকে শামছুর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিটি গুরুত্বের সাথে তোলা হয়। এছাড়া তারা একই দাবিতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছেন। কিন্তু এ নিয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

যশোরের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম পিটু জানান, উচ্চ আদালতের নির্দেশের কারণে শামছুর রহমান হত্যা মামলার বিচার কাজ বন্ধ হয়ে আছে। তাদের প্রত্যাশা আপিলের দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে মামলার কার্যক্রম আবার শুরু হবে। এ ব্যাপারে পদক্ষেপের জন্য তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে যোগাযোগ করবেন বলেও জানান।

এ মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৬ জনের মধ্যে খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী মুশফিকুর রহমান হিরক পুলিশের খাতায় পলাতক রয়েছে। আরেক আসামি খুলনার ওয়ার্ড কমিশনার আসাদুজ্জামান লিটু র‌্যাবের ক্রসফায়ারে, কোটচাঁদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন কালু হার্টস্ট্রোকে এবং যশোর সদরের চুড়ামনকাটির আনারুল প্রতিপক্ষের হামলায় মারা গেছেন। বাকি আসামিরা জামিনে রয়েছেন। 

গো নিউজ২৪/এমবি