২ ভাদ্র ১৪২৪, বৃহস্পতিবার ১৭ আগস্ট ২০১৭ , ৯:৫৯ পূর্বাহ্ণ

অমুসলিমদের প্রতি ইসলামের মহানুভবতা


গো নিউজ২৪ | ইসলাম ডেস্ক আপডেট: ২৮ জুলাই ২০১৭ শুক্রবার
অমুসলিমদের প্রতি ইসলামের মহানুভবতা

মহানুভব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর প্রতিষ্ঠিত মদিনাকেন্দ্রীক সমাজব্যবস্থা ছিল একটি মৌলিক নাগরিক অধিকারপূর্ণ সাম্যের সমাজ। তার প্রদর্শিত জীবনব্যবস্থার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ‘পাশ্চাত্য যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত, প্রাচ্যের আকাশে তখন উদিত হলো এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং আর্ত পৃথিবীকে তা দিলো আলো এবং স্বস্তি। ইসলাম একটা মিথ্যা ধর্ম নয়। শ্রদ্ধার সঙ্গে হিন্দুরা তা অধ্যয়ন করুক, তাহলে আমার মতই তারা একে অপরকে ভালোবাসবে।’

মহানবী (স.) বলেছেন, ‘কোনো অমুসলিম নাগরিককে যে অত্যাচার করলো বা তার অধিকার ক্ষুণ্ন করলো বা তাকে সাধ্যাতীত পরিশ্রম করালো বা তার অমতে তার থেকে কিছু নিয়ে নিলো, কিয়ামতের দিন আমি হব তার বিপক্ষে অভিযোগ করবো।’ তিনি আরো বলেন, ‘যে কোনো অমুসলিম নাগরিককে কষ্ট দিলো আমি তার (অমুসলিমের) বাদী হব। আর আমি যার বিরুদ্ধে বাদী হবো, কিয়ামতের দিনে আমি হবো বিজয়ী।’ আরেক জায়গায় তিনি বলেন, ‘যে কোনো অমুসলিমকে উত্যক্ত করলো, সে আমাকেই উত্যক্ত করলো। আর যে আমাকে উত্যক্ত করলো আল্লাহকেই সে উত্যক্ত করলো।’ অমুসলিম নাগারিককে হত্যা করা সম্পর্কে রাসুল (স.) বলেন, ‘যে কোনো সংখ্যালঘুকে হত্যা করবে, সে বেহেশতের ঘ্রাণও উপভোগ করতে পারবেনা। অথচ বেহেশতের সুঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব হতেও অনুভব করা যাবে।’ (অমুসলিমের প্রতি ইসলামের উদারতা, ড. ইউসুফ আল-কারযাভী। অনুবাদক: মাহমুদুল হাসান। পৃ: ২১-২২)।

হযরত মুহাম্মদ (স.) সুস্পষ্ট ভাষায় অমুসলিমদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘তাদের রক্ত আমাদের রক্তের মত এবং তাদের ধন-সম্পদ আমাদের ধন সম্পদের মতো।’ একটি ইসলামি সমাজে অমুসলিমদের জানমাল মুসলিমদের নিজের জানমালের ন্যায় পবিত্র ও নিরাপত্তাযোগ্য। রাসুল (স.)-এর এই ঘোষণার পর যারা অমুসলিমদের ধন সম্পদ লুণ্ঠন করে, অর্পিত কিংবা ন্যস্ত সম্পত্তি জবরদস্তিমূলকভাবে দখল করে, তারা কি নিজেদেরকে মুসলিম পরিচয় দিতে পারে? এ ব্যাপারে স্পষ্ট ফতোয়া আসলে এদেশের বহু অমুসলিম ইসলামের সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হতো। এ প্রসঙ্গে রাসুল (স.) সাহাবিদের (রা.) জীবন থেকে আরো দুই-একটা উদ্ধৃতি দেয়া যায়।

মহানবী (স.) একদিন মসজিদে নববিতে কতিপয় সাহাবিকে নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এমন সময় একজন অমুসলিম বেদুইন এসে মসজিদের এক কোনে প্রস্রাব করছিলো। সাহাবিরা তাকে মারতে উদ্যত হলে মহানবী (স.) তাদের নিবৃত্ত করলেন। প্রস্রাব করা শেষ হলে তিনি ওই বেদুইনকে বুঝিয়ে বললেন, ‘এটা মুসলিমদের ইবাদতখানা, প্রস্রাবের স্থান নয়।’ এ কথা বলে তিনি তাকে বিদায় দিয়ে সাথীদের নিয়ে মসজিদের প্রস্রাব ধুয়ে দিলেন। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমার ধর্মের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করেনি, বসতি থেকে তোমাকে উচ্ছেদ করেনি, তাদের প্রতি তোমার দয়ালু হওয়া উচিৎ। আর তাদের সাথে ন্যায়ানুগ আচরণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায় ভালোবাসেন।’ (৬০: ৮)

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে যখন মিসরের শাসনকর্তা হিসেবে হযরত আমর ইবনুল আস (রা.) দায়িত্ব পালন করছিলেন, সে সময় একদিন আলেকজান্দ্রিয়ার খ্রীস্টান পল্লিতে হৈচৈ পড়ে গেলো। কেউ একজন যিশু খ্রিস্টের প্রস্তরনির্মিত মূর্তির নাক ভেঙ্গে ফেলছে। খ্রিস্টানরা ধরে নিল, এটা মুসলিমদের কাজ। তারা উত্তেজিত হয়ে উঠলো। খ্রিস্টান বিশপ অভিযোগ নিয়ে আসলেন আমর ইবনুল আস’র কাছে। আমর শুনে অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। তিনি ক্ষতিপূরণ স্বরূপ মূর্তিটি নতুনভাবে তৈরি করে দিতে চাইলেন। কিন্তু খ্রিস্টান নেতাদের প্রতিশোধ স্পৃহা ছিলো অন্যরকম। তারা চাইলো, মুহাম্মদ (সা.)-এর মূর্তি তৈরি করে অনুরূপভাবে নাক ভেঙ্গে দিতে। খ্রিস্টানদের এ মতামত ব্যক্ত করার মধ্যে দিয়ে যে ঔদ্ধত্য প্রকাশ পেয়েছে, তাতে তাদের কতটুকু ধর্মীয় স্বাধীনতা ছিলো তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

যে নবী (স.) আজীবন পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, সে নবীর মূর্তি তৈরিকে মুসলিমরা মেনে নিতে পারেনি। হযরত আমর কিছুক্ষণ নীরব থেকে খ্রিস্টান বিশপকে বললেন, ‘আমার অনুরোধ, এ প্রস্তাব ছাড়া অন্য যে কোনো প্রস্তাব করুন আমি রাজি আছি। আমাদের যে কোন একজনের নাক কেটে আমি আপনাদের দিতে প্রস্তুত, যার নাক আপনারা চান।’

খ্রিষ্টান নেতারা সবাই এ প্রস্তাবে সম্মত হলো। পরদিন খ্রিষ্টান ও মুসলিমরা বিরাট এক ময়দানে জমায়েত হলো। মিসরের শাসক সেনাপতি আমর (রা.) সবার সামনে হাজির হয়ে বিশপকে বললেন, ‘এদেশ শাসনের দায়িত্ব আমার। যে অপমান আজ আপনাদের, তাতে আমার শাসনের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। তাই তরবারী গ্রহণ করুন এবং আপনিই আমার নাক কেটে দিন।’ একথা বলেই তিনি বিশপকে একখানি ধারালো তরবারী হাতে দিলেন। জনতা স্তব্ধ দাঁড়িয়ে আছে, খ্রিস্টানরা স্থম্ভিত। চারদিকে থমথমে ভাব। সে নীরবতায় নিঃশ্বাসের শব্দ করতেও যেন ভয় হয়। সহসা সেই নীরবতা ভঙ্গ করে একজন মুসলিম সৈন্য এগিয়ে এলো। চিৎকার করে বললো, ‘আমিই দোষী, সিপাহসালারের কোন অপরাধ নেই। আমিই মূর্তির নাক ভেঙ্গেছি। এই যে, তা আমার হাতেই আছে। তবে মূর্তি ভাঙ্গার কোন ইচ্ছা আমার ছিলোনা। মূর্তির মাথায় বসা একটি পাখির দিকে তীর নিক্ষেপ করতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।’

সৈন্যটি এগিয়ে এসে বিশপের তরবারীর নীচে নিজের নাক পেতে দিলো। স্তম্ভিত বিশপ। নির্বাক সবাই। বিশপের অন্তরাত্মা রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলো। তরবারী ছুঁড়ে দিয়ে বিশপ বললেন, ‘ধন্য সেনাপতি, ধন্য এই বীর সৈনিক, আর ধন্য আপনাদের মুহাম্মদ (স.), যার মহান আদর্শে আপনাদের মতো মহৎ উদার নির্ভিক ও শক্তিমান মানুষ তৈরি হয়েছে। যিশু খ্রিস্টের প্রতিমূর্তির অসম্মান করা হয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু তার চাইতেও অন্যায় হবে যদি অঙ্গহানি করি। সেই মহান ও আদর্শ নবীকেও আমার সালাম জানাই।’ জলন্ত এই উদাহরণ আজো বিশ্ববাসীকে অবাক করে।

হযরত আলী (রা.) যখন মুসলিম জাহানের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, সে সময়ে একবার তার ঢাল চুরি হলো। চুরি করলো একজন ইহুদি। হযরত আলী (রা.) আদালতের শরণাপন্ন হলেন। কাজী (বিচারপতি) খলিফা হযরত আলী (রা.) এর কাছে সাক্ষী চাইলেন। সাক্ষী হিসেবে খলিফা হাজির করলেন তার এক ছেলে এবং চাকরকে। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে আপন সন্তান ও চাকরের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয় বিধায় কাজী খলিফার অভিযোগ নাকচ করে দিলেন। মুসলিম জাহানের অধিপতি হয়েও তিনি কোন বিশেষ বিবেচনা পেলেন না। ইসলামী আইনে শাসক-শাসিত, উঁচু-নীচু, শত্রু-মিত্র সকলেই সমান। ইহুদি বিচার দেখে অবাক বিস্ময়ে বলে উঠলো, ‘অপূর্ব এই বিচার, ধন্য সেই বিধান যা খলিফাকে পর্যন্ত খাতির করেনা আর ধন্য সেই নবী যার প্রেরণায় এরূপ মহৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ জীবনের সৃষ্টি হতে পারে। হে খলিফাতুল মুসলিমীন, ঢালাটি সত্যই আপনার। আমিই তো চুরি করেছিলাম। এই নিন আপনার ঢাল। শুধু ঢাল নয় তার সাথে আমার জান-মাল, আমার সবকিছু ইসলামের খেদমতে পেশ করলাম।” 

ইসলামি সমাজে অমুসলিমদের জীবনযাত্রা, ধন-প্রাণের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা মুসলিম নাগরিকদের সমতুল্য। এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নায়ক মহানবী (স.) এর মহানুভব অসাম্প্রদায়িক মতাদর্শের অনুসারীদের আরো কিছু ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো:

* হযরত আলী (রাঃ) খেলাফতকালে জনৈক মুসলিম কর্তৃক একজন ‘জিম্মি’ নিহত হয়। হযরত আলী আততায়ী মুসলমানের প্রাণদণ্ডের আদেশ দেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, ‘আমরা যাদের ‘জিম্মি’ বা দায়িত্ব নিয়েছি, তাদের রক্ত আমাদের রক্ততুল্য। তাদের রক্ততুল্য আমাদের রক্তমূল্য। 

* উমাইয়া বংশের খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের বিরুদ্ধে জনৈক খ্রিস্টান নাগরিক হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজের আদালতে অভিযোগ উখাপন করে। অভিযোগ সম্বন্ধে নিজের বক্তব্য পেশ করার জন্য নির্র্দিষ্ট সময়ে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য খলিফাকে নির্দেশ দেয়া হয়। একজন সাধারণ লোকের অভিযোগের উত্তরে সাধারণেরই মত আদালতে হাজির হতে, আরও পাঁচজনের মত আসামীর নির্দিষ্ট আসনে দাঁড়াতে ও জবাবদিহি করতে খলিফা সংকোচ করেন। তাই তিনি উকিল নিযুক্ত করতে চান। কিন্তু উমর তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘তোমার নিজের হাজির হতে হবে, নিজেকেই বলতে হবে নিজের কথা।’ অগত্যা তাকে আদালতে হাজির হতে হয়। বিচারে খলিফা হিশামের বিরুদ্ধে ডিক্রী প্রদান করা হয়।

* মুসলিম সেনাবাহিনী সিরিয়ায় জনৈক অমুসলিম চাষীর ফসল নষ্ট করেছে বলে সে খলিফা উমর (রা.)-কে জানায়। ক্ষতিপূরণ স্বরূপ খলিফা তাকে দশ সহস্র মুদ্রা প্রদান করেন। 

ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বহু অমুসলিম ইসলামকে জীবনাদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ধর্মান্তরিত না হয়েও বহু অমুসলিম ইসলামের কুরআনকে, মহানবী (স.)কে ভালোবাসেন। ইসলাম কোনো ধর্মীয় উন্মাদনা বিদ্বেষ, কিংবা পরমৎ অসহিষ্ণুতার নাম নয়। ইসলাম মানববতা মনুষ্যত্ব সাম্য ও শুভেচ্ছার নাম। ইসলামের আবেদন দেশ-কাল-বর্ণ- ভাষা কিংবা গোত্রের সীমানায় আবদ্ধ নয়। এর প্রীতি সর্বজনীন ও শাশ্বত। মানবতা যেখানে, বিধ্বস্ত, ইসলাম সেখানে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা নিয়ে হাজির হয়েছে। কুরআনের ভাষায়, ‘মানুষ আল্লাহ শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বা জীব।’

গো নিউজ২৪/ আরএস

ইসলাম বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত